জ্বালানি নিরাপত্তার হৃৎপিণ্ড নিষ্প্রাণ

কক্সবাজার সংবাদদাতা

জাতীয়

দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে অস্থিরতা, কোথাও কোথাও লাইনে দাঁড়িয়ে ভোগান্তি- এর মাঝেই মহেশখালীতে খালি পড়ে আছে প্রায় দুই লাখ

2026-04-25T02:25:43+00:00
2026-04-25T02:25:43+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্প
জ্বালানি নিরাপত্তার হৃৎপিণ্ড নিষ্প্রাণ
কক্সবাজার সংবাদদাতা
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ২:২৫ এএম 
মহেশখালীতে নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট ম্যুরিং (এসপিএম) প্রকল্প। সংগৃহীত ছবি
দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে অস্থিরতা, কোথাও কোথাও লাইনে দাঁড়িয়ে ভোগান্তি- এর মাঝেই মহেশখালীতে খালি পড়ে আছে প্রায় দুই লাখ টন তেল মজুদের সক্ষমতা। আট হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট ম্যুরিং (এসপিএম) প্রকল্পের সব অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও শুধু অপারেটর নিয়োগ না হওয়ায় এটি এখনও চালু হয়নি। ফলে গভীর সমুদ্র থেকে দ্রুত তেল খালাস ও পরিবহনের আধুনিক এই ব্যবস্থার সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ, বাড়ছে সময় ও খরচ, কমছে সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা। অথচ প্রকল্পটি চালু হলে বছরে সরকারের সাশ্রয় হতো কমপক্ষে ৮০০ কোটি টাকা। ফলে দুই বছর ধরে পরে থাকায় হাতছাড়া হয়েছে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

এসপিএম প্রকল্প কী : তেল আমদানির পর গভীর সমুদ্র থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে সঞ্চালন ও মজুদ করার আধুনিক ব্যবস্থাপনা হিসেবে নেওয়া হয় এসপিএম বা সিঙ্গেল পয়েন্ট ম্যুরিং প্রকল্প। গভীর সাগর থেকে মহেশখালীর পাম্পিং স্টেশন ও স্টোরেজ ফ্যাসিলিটি এবং সেখান থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারি পর্যন্ত ১১০ কিলোমিটার করে দুটি পৃথক পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে। 

এছাড়া মহেশখালীতে প্রায় ১০০ একর জায়গার ওপর তেল পরিবহনের জন্য পাম্পিং স্টেশন, ডিজেল জেনারেটর এবং ছয়টি স্টোরেজ ট্যাঙ্ক নির্মাণ করা হয়েছে। ছয়টি স্টোরেজ ট্যাঙ্কের মধ্যে ক্রুড অয়েলের জন্য তিনটি ট্যাঙ্কের প্রতিটি ৬০ হাজার কিলোলিটার বা ৪২ হাজার টন ক্ষমতার আর ডিজেলের তিনটি ট্যাঙ্ক- প্রতিটি ৩৬ হাজার কিলোলিটার প্রায় ২৫ হাজার টন। সবমিলিয়ে ছয়টি স্টোরেজ ট্যাঙ্কে দুই লাখ টন তেলের মজুদ সক্ষমতা রয়েছে।

বর্তমান ব্যবস্থায় গভীর সাগরে মাদার ভেসেল বা বড় ট্যাঙ্কার জাহাজে তেল আমদানির পর সেটি ছোট (লাইটার) ছোট জাহাজে করে কর্ণফুলী চ্যানেল দিয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিবহন করা হয়। এসপিএমব্যবস্থায় গভীর সাগর থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল সরাসরি মহেশখালীতে এনে আবার পাম্প করে পাইপলাইনে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিবহন করা হবে। প্রকল্প তত্ত্বাবধানকারী ইস্টার্ন রিফাইনারির তথ্য অনুযায়ী, সনাতন পদ্ধতিতে এক লাখ টন ক্রুড তেল আমদানির পর খালাসে সময় লাগে ১১ দিন। আর পাইপলাইনে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সমপরিমাণ তেল খালাস ও পরিবহন সম্ভব। সবমিলিয়ে সময়ের বাঁচানো ছাড়াও তেল পরিবহনে অপচয় রোধ, পরিবেশ রক্ষা এবং অর্থেরও বড় সাশ্রয় করতে পারবে এসপিএম অবকাঠামো।

চালু না হওয়ার কারণ : বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের আওতাধীন কোম্পানি ইস্টার্ন রিফাইনারির তত্ত্বাবধানে ২০২৪ সালে এসপিএম প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। সেই বছর মার্চ মাসে গভীর সাগর থেকে ক্রুড ও ডিজেল খালাস করে পরিবহন টেস্টিং কমিশনিং পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। এসপিএম পরিচালনার জন্য দক্ষ অপারেটর প্রয়োজন, কারণ বাংলাদেশে এ ধরনের অভিজ্ঞ কোনো অপারেটর নেই।

জ্বালানি বিভাগ জানায়, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ না হওয়ায় পাইপলাইনে তেল খালাস ও পরিবহন এবং মজুদ অবকাঠামো চালু করা যায়নি। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ-জ্বালানি বিশেষ বিধান আইনে বিনা দরপত্রে চীনের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়েছে। নির্মাণ শেষে এসপিএমের অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স বা পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের ঠিকাদার নিয়োগও বিশেষ আইনে দরপত্র ছাড়াই কার্যাদেশ দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিশেষ আইনটি বাতিল করলে পরে আর সেই চুক্তি হয়নি। পরে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করে অন্তর্বর্তী সরকার ঠিকাদার নিয়োগ করে যেতে না পারায় জ্বালানি তেলের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি আর চালু হয়নি। 

এসপিএম প্রকল্পে নির্মিত অবকাঠামো ব্যবহার করে বছরে ৯০ লাখ টন ক্রুড অয়েল এবং ডিজেল আমদানির পর খালাস ও পরিবহন করা যাবে। কর্মকর্তারা জানান, ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা অনুযায়ী বর্তমানে এই অবকাঠামোর প্রায় ৭০ ভাগ পর্যন্ত কাজে লাগানো সম্ভব। কারণ বাংলাদেশে ক্রুড অয়েলের বাৎসরিক পরিশোধন ক্ষমতা ১৫ লাখ টন। বাংলাদেশে ডিজেলের চাহিদা বেশি হওয়ায় এই অবকাঠামো ব্যবহার করে ৪৫ লাখ টনের বেশি বছরে ডিজেল আমদানির পর খালাস ও পরিবহন করা যাবে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান। এ প্রকল্প পূর্ণমাত্রায় চালু হলে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার মতো বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হওয়া কথা।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা : প্রকল্প পরিচালক নাহিদ জামান বলেন, এখনও প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি। তবে ২০২৪ সালে পরীক্ষামূলকভাবে স্টোরেজে কিছু অপরিশোধিত তেল মজুদ করে সফলতা যাচাই করা হয়েছে। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো- অপরিশোধিত তেল মজুদ করে তা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পাঠানো। সেখান থেকে তেল পরিশোধিত হয়ে দেশের জ্বালানি সংকট মেটাবে। আশা করছি, চলতি বছরে ত্রুটি ও লজিস্টিক সংকট নিরসন করে প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে পারব।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ম তামিম বলেন, অগ্রাধিকার দিয়ে এসপিএম চালুর পদক্ষেপ নিলে এই বিলম্ব এড়ানো যেত। ‘একটু ইনোভেটিভ চিন্তাভাবনা করলে কিন্তু আমরা এতদিনে এটা চালু করতে পারতাম।’ প্রকল্পটি চালু না হওয়ায় একদিকে সময় ও অর্থের সাশ্রয় যেটা হতো সেটা থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে, আবার ঋণ পরিশোধের চাপ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এটা ডেফিনেটলি জ্বালানি খাতে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। প্রথমত এটা বেশ দেরি হয়েছে তৈরি করতে। কস্ট ওভাররানও হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে। দুই লাখ টন একটা বড় মজুদ সক্ষমতা যেটা ওখানে আনইউজড পড়ে আছে।

ম তামিম বলেন, এটি অত্যন্ত জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রকল্প। তিনি বলেন, এটা চালু না হওয়ায় যেটা হয়েছে যে প্রথমত লাইটারেজে করে আনতে খরচ বেশি হচ্ছে। মাদার ট্যাঙ্কারগুলো কিন্তু আউটার অ্যাঙ্করেজে থাকে। আমরা ছোট ছোট জাহাজে করে আনছি। এখন যেহেতু জ্বালানির অভাবে তাই লাইটারেজেও কিন্তু অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে আমাদের। পাইপলাইনটা চালু থাকলে পাম্প করে ডিরেক্ট ইস্টার্ন রিফাইনারিতে নিয়ে আসা যেত। লাইটারেজে যখন তেল আনা হয় তখন একটা লস কাউন্ট হয়। 

সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত : নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার ছয় মাসের মধ্যে এই বিশাল প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সম্প্রতি কক্সবাজারের মহেশখালীতে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন শেষে তিনি এ ঘোষণা দেন। এ সময় তিনি ট্যাঙ্ক ফার্ম থেকে পাইপলাইন পর্যন্ত পুরো কার্যক্রম ঘুরে দেখেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।

দুই বছর ধরে অচল থাকা এসপিএম প্রকল্পের দায় নিয়ে সরাসরি মন্তব্য এড়িয়ে গিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দায় কার, এটা সবাই জানে। কিন্তু দায় দেওয়া-নেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সমস্যার সমাধান খোঁজা।

তিনি জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স (ওএন্ডএম) ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে প্রকল্পটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গভীর সমুদ্র থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল খালাস করে মহেশখালী হয়ে সারা দেশে সরবরাহব্যবস্থাটি চালু করতে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার মধ্যেই এসপিএম কার্যক্রম চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। 

এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট স্থাপনা সরেজমিন পরিদর্শন, কর্মকর্তাদের প্রস্তুতি যাচাই এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি চালু করা গেলে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন গতি আসবে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হবে।

এ বিষয়ে পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী মো. জিয়াউল হাসান বলেন, সাধারণ পদ্ধতিতে গভীর সমুদ্র থেকে মাদার ভেসেল হয়ে তেল খালাস করতে ১১ থেকে ১২ দিন সময় লাগত। কিন্তু এসপিএম চালু হলে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই তেল খালাস করা সম্ভব হবে।

সময়ের আলো/আআ



  বিষয়:   জ্বালানি  নিরাপত্তা  হৃৎপিণ্ড  নিষ্প্রাণ  সংকট 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: