শিক্ষাঙ্গন- যেখানে জ্ঞানচর্চা, সহনশীলতা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন একসঙ্গে বিকশিত হওয়ার কথা- সেই পরিসরই এখন সংঘাত, উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ দেশের সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় রাজনৈতিক সংঘাতের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। একদিকে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ নিয়ে তীব্র বিতর্ক, অন্যদিকে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ, শোডাউন ও সহিংসতার বিস্তার- সব মিলিয়ে শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্রমেই ভঙ্গুর হয়ে উঠছে।
জামায়াত শিবিরের রাজনীতিকে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ আখ্যা দিয়ে তা নিষিদ্ধের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে দেয়াল লিখন ও পাল্টাপাল্টি শোডাউনের খবর পাওয়া গেছে। এতে শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। জাতীয় অঙ্গন থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যন্ত এই উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে, আর এর মধ্যেই উদ্বেগ, শঙ্কা ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
চট্টগ্রাম সিটি কলেজে সংঘর্ষের রেশ কাটতে না কাটতেই রাজধানীর শাহবাগ, পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ এবং কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন স্থানে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এর জেরে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ, মিছিল ও শোডাউন দেখা গেছে। বিষয়টি জাতীয় সংসদেও গড়িয়েছে, যেখানে এ নিয়ে তীব্র বাগবিতণ্ডা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও উত্তপ্ত আলোচনা চলছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটে ভুগছে গোটা দেশ। সরকার তেলের দাম বাড়াতে না চাইলেও শেষ পর্যন্ত না বাড়িয়ে থাকতে পারেনি। জ্বালানির দাম বাড়ায় জনজীবনে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। আগে থেকে চড়া দ্রব্যমূল্য আরও বেড়েছে। পাম্পে পাম্পে তেলের জন্য গাড়ির লম্বা লাইন। সেচের জন্য জ্বালানির অভাবে ধুঁকছেন কৃষক। জ্বালানির অভাবে শুরু হয়েছে লোডশেডিং। চলমান এসএসসি পরীক্ষার্থীদের অবস্থা নাকাল। অন্যদিকে হামের প্রাদুর্ভাবে শিশুরা মারা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ছাত্রদল-শিবিরের সংঘর্ষ দেশের উচ্চ শিক্ষাঙ্গনগুলোকে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীতে শাহবাগ থানার ভেতরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ডাকসু নেতা ও সাংবাদিক সমিতির সদস্যরা ছাত্রদলের হামলার শিকার হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ও তার মেয়েকে নিয়ে বিকৃত ও কুরুচিপূর্ণ এআই জেনারেটেড ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে এ হামলা হয়েছে। এমন কুরুচিপূর্ণ ছবি যে-ই তৈরি বা ছড়িয়ে থাকুক, ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞান থাকলে কারও পক্ষেই এটি মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। স্বাভাবিকভাবে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। এ কারণে গত বুধবার রাত থেকে ওই এআই জেনারেটেড ছবি নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হতে থাকে। ডাকসুর শিবির প্যানেলের এক নেতাই এ অশ্লীল ছবি ছড়িয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। ওই শিবির নেতা শাহবাগ থানায় নিজের নিরাপত্তার জন্য ও নিজের নামে ভুয়া ছবি ছড়ানোর অভিযোগ দায়ের করতে যান। সেখানেই হামলার ঘটনা ঘটে।
শাহবাগে উত্তপ্ত পরিস্থিতি : রাজধানীর শাহবাগ থানায় এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। থানায় আটকেপড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নেতাদের উদ্ধার করতে গিয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের তীব্র তোপের মুখে পড়েন ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ছাত্রদল নেতাকর্মীরা সাদিক কায়েমের বিরুদ্ধে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ করার অভিযোগ তুলে স্লোগান দিতে থাকেন। তার অতীত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও সেখানে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ভিপি ও জিএস থানা এলাকা ত্যাগ করে ডাকসু ভবনের দিকে চলে যান।
এর আগে, ডাকসু নেতা এ বি জুবায়ের ও মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদের ওপর হামলা হয়। তারা মূলত শিবির প্যানেলের প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ও সাইয়েদুজ্জামান আলভীকে উদ্ধার করতে গিয়ে মারধরের শিকার হন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রামে পাল্টাপাল্টি শোডাউন ও উত্তেজনা : চট্টগ্রাম সিটি কলেজের সংঘর্ষের রেশ ধরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ক্যাম্পাসে একই রাতে শক্তি প্রদর্শনে নামে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। রাত সাড়ে ৯টায় চবি ছাত্রদল জিরো পয়েন্ট থেকে মিছিল বের করে। সমাবেশে শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে এ ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে।’ একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসগুলোতে গুপ্ত রাজনীতি সক্রিয় রয়েছে এবং তা শক্ত হাতে প্রতিহত করা হবে।’
এর ঠিক এক ঘণ্টা পর পাল্টা মিছিল বের করে চবি ছাত্রশিবির। সমাবেশে চবি ছাত্রশিবির সভাপতি ও চাকসু ভিপি ইব্রাহিম হোসেন রনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক শব্দচয়ন ও ‘গুপ্ত’ শব্দের ব্যবহারকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হচ্ছে, যা শিক্ষার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ : চট্টগ্রামের ঘটনার প্রতিবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) মঙ্গলবার রাতে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল করেছে শাখা ছাত্রদল। মিছিল থেকে ‘রগ কাটা যেখানে, লড়াই হবে সেখানে’- এমন স্লোগান দেওয়া হয়। অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও (জাবি) একই রাতে বিক্ষোভ মিছিল ও সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
রাজশাহী কলেজে বিক্ষোভ সমাবেশে কলেজের ছাত্রদলের আহ্বায়ক খালিদ বিন ওয়ালিদ (আবির) বলেন, দেশের কোনো ক্যাম্পাসেই গুপ্ত রাজনীতি চলতে দেওয়া হবে না। রাজনীতি করতে হলে প্রকাশ্যে করতে হবে। গোপন কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা হলে তা প্রতিহত করা হবে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকা মারা কর্মসূচি : চট্টগ্রাম সিটি কলেজে ‘গুপ্ত রাজনীতির’ বিরুদ্ধে দেয়াল লিখন (চিকা মারা) করায় ছাত্রদল নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শাখা ছাত্রদল। এ হামলার প্রতিবাদে বুধবার বিকালে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দেয়াল লিখন কর্মসূচি পালন করে সংগঠনটি।
এ সময় তারা চট্টগ্রাম সিটি কলেজে হামলার ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। কর্মসূচিতে উপস্থিত ছাত্রদল নেতারা বলেন, দেশের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে কোনো ধরনের ‘গুপ্ত রাজনীতি’ বা অপরাজনীতির স্থান হবে না। সাধারণ শিক্ষার্থীরা যখনই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে, তখনই তাদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। চট্টগ্রাম সিটি কলেজের ঘটনার প্রতিবাদে এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে তারা এই দেয়াল লিখন করেছেন।
নোবিপ্রবিতে দেয়াল লিখন : নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) ভিন্নধর্মী কর্মসূচি পালন করেছে ছাত্রদল। তারা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন দেয়ালে ‘গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধ’ করার দাবিতে দেয়াল লিখন কর্মসূচি পালন করে।
ভিপি সাদিক কায়েমের বিচার দাবি : এদিকে চট্টগ্রাম সিটি কলেজের ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নিতে বৃহস্পতিবার পুলিশ কমিশনার ও বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গে দেখা করেন ভিপি সাদিক কায়েম।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মির্জা ফারুক এ হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। বহিরাগত সন্ত্রাসীদের নিয়ে এসে আমাদের প্রায় ৩০ জন নেতাকর্মীর ওপর হামলা করা হয়েছে। আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন করতে চাই, ক্যাম্পাসে একের পর এক সন্ত্রাসী হামলা হচ্ছে সেই হামলায় কি আপনারা প্রশ্রয় দিচ্ছেন?’ তিনি আরও বলেন, ‘মেডিকেলে আহত শিবির কর্মীকে দেখতে গিয়েছি। হত্যার উদ্দেশ্যে তার ওপর হামলা করা হয়েছে। তার পায়ের গোড়ালি কেটে গেছে। আমরা এই বর্বর হামলার বিচার দাবি করছি।’
স্থবির একাডেমিক কার্যক্রম : এদিকে গত মঙ্গলবার থেকে চট্টগ্রাম সিটি কলেজে ক্লাস ও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হলেও সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে এখনো গভীর আতঙ্ক বিরাজ করছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, শিক্ষার্থীরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ধর্ম, মত, জাতি-গোষ্ঠী, লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তাদের মত প্রকাশ করে। এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, নেতারা তাদের ক্ষেত্রেও যেন সে যত বড়ই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হোক না কেন, শালীনতা এবং শিষ্টাচার বজায় রেখে যেন মত প্রকাশ করে- এই আহ্বান আমরা জানিয়েছি।
ছাত্র অধিকার পরিষদের আহ্বান : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংগঠনটি ছাত্রদলকে সহিংসতা পরিহার এবং ছাত্রশিবিরকে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ ছেড়ে প্রকাশ্যে গণতান্ত্রিক ধারায় আসার আহ্বান জানায়।
সংগঠনের সভাপতি নাজমুল হাসান বলেন, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে একসঙ্গে থাকা শক্তিগুলো এখন নিজেদের মধ্যে সংঘাতে জড়াচ্ছে, যা হতাশাজনক।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, সংঘর্ষে ব্যবহৃত অস্ত্র ও হামলার ঘটনায় এখনও দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ না থাকায় দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে।
সময়ের আলো/আআ