ইসরায়েলি হামলায় নিহত সাংবাদিক আমাল খলিল। সংগৃহীত ছবি ইসরাইলি হামলায় নিহত লেবাননের অভিজ্ঞ সাংবাদিক আমাল খলিলকে শুধু একজন প্রতিবেদক হিসেবে নয়, দক্ষিণ লেবাননের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হিসেবেই স্মরণ করছেন সহকর্মী, বন্ধু ও স্বজনরা। দখল, যুদ্ধ, স্থানচ্যুতি আর প্রতিরোধের ভেতর বেড়ে ওঠা এই সাংবাদিক চার দশকের জীবনজুড়ে নথিবদ্ধ করেছেন ইসরাইলি আগ্রাসন, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ এবং দক্ষিণ লেবাননের ইতিহাস।
সহকর্মীদের ভাষায়, তিনি সংবাদকর্মী ছিলেন, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিলেন প্রতিরোধের কণ্ঠ। মানুষের লড়াইকেই লিপিবদ্ধ করতেন তিনি। গত ২২ এপ্রিল বুধবার ইসরাইলি বুলেটে প্রাণ হারান আমাল।
১৯৮৪ সালে দক্ষিণ লেবাননের সাইদা জেলার আল-বাসাইরিয়ায় জন্ম আমাল খলিলের। জন্মের সময়ই অঞ্চলটি ইসরাইলি দখল ও গৃহযুদ্ধের অভিঘাতে বিধ্বস্ত। শিশুকালে দূর থেকে দখলকৃত গ্রাম দেখেছেন, বড় হয়েছেন যুদ্ধের বাস্তবতায়। সেই অভিজ্ঞতাই তার লেখক ও সাংবাদিক হয়ে ওঠার ভিত গড়ে দেয়।
আরবি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনার সময় পরিবারের অজান্তে বৈরুতে গিয়ে বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। সেখান থেকেই লেখালেখির শুরু। পরে ২০০৬ সালে আল-আখবার পত্রিকায় যোগ দেন। কয়েক সপ্তাহ পরই শুরু হয় লেবাননে ৩৩ দিনের ইসরাইলি যুদ্ধÑ যা তার পেশাগত জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। নারীর অধিকার ও সংস্কৃতি নিয়ে লেখার পরিকল্পনা বদলে তিনি যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি এবং হামলার শিকার মানুষের গল্প নথিবদ্ধ করতে শুরু করেন।
দুই দশক ধরে দক্ষিণ লেবাননের সুর, বিনত জুবেইল, নাবাতিয়াসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল তার রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য, জনস্বার্থ- সবকিছু নিয়েই লিখেছেন। নিজেই বলেছিলেন, চাপ, হুমকি, হামলা- কিছুই তাকে দমাতে পারেনি।
সহকর্মীরা বলেন, দক্ষিণ লেবানন তার হাতের তালুর মতো চেনা ছিল। তরুণ সাংবাদিকদের সঙ্গে সূত্র ভাগ করেছেন, মাঠে সহায়তা করেছেন, প্রতিযোগিতাকেও কখনো দেয়াল বানাননি। অনুসন্ধানী সাংবাদিক হুসেইন শাবান বলেন, দক্ষিণে যেন সব দরজার চাবি ছিল তার কাছে।
বুধবার আল-তাইরি শহরে আগের এক ইসরাইলি হামলা কাভার করতে গিয়ে নিহত হন ৪২ বছর বয়সি খলিল। একটি গাড়িতে প্রথম হামলার পর তিনি আলোকচিত্রী জয়নাব ফারাজকে নিয়ে কাছের একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরে দ্বিতীয় হামলায় সেই বাড়িও আঘাতপ্রাপ্ত হয়। ফারাজ আহত অবস্থায় উদ্ধার হলেও উদ্ধারকারীরা গুলির মুখে পড়ায় আমালের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। ঘণ্টা পরে ধ্বংসস্তূপে তার মরদেহ পাওয়া যায়।
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম একে যুদ্ধাপরাধ বলেছেন। চলচ্চিত্র নির্মাতা বশির আবু জেইদের ভাষায়, এটি শুধু একজন সাংবাদিককে হত্যা নয়, প্রতিরোধের এক নারীকে হত্যা।
আমাল জানতেন সাংবাদিকরা টার্গেট হন। ২০১০ সালে ইসরাইলি গোলায় নিহত সহকর্মী আসাফ আবু রাহহালের স্মৃতিচারণাও লিখেছিলেন তিনি। পরে ২০২৩-২৪ সালের লেবানন যুদ্ধে ইসরাইলি হামলায় বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হওয়ার তথ্যও তিনি নথিবদ্ধ করেন। যুদ্ধবিরতির পরও ইসরাইলের প্রায় প্রতিদিনের লঙ্ঘন নিয়ে রিপোর্ট করেন।
ভিডিও প্রতিবেদনও বানাতেন, সম্পাদনাও শিখেছিলেন নিজে। কিন্তু নিজেকে গল্পের কেন্দ্র করতে চাইতেন না। তার বিখ্যাত কথা- আমি মানুষের গল্প বলতে এসেছি, নিজে গল্প হয়ে উঠতে নয়।
২০২৪ সালে একবার ইসরাইলি বাহিনী গুলি ছুড়ে তাকে ও সহকর্মীদের সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। তবু সহকর্মীদের ভাষায়, আমাল কখনো ইসরাইলি নির্দেশে নিজের চলাচল সীমিত করেননি।
তিনি নিজেও বলেছিলেন, মানুষ তাকে সতর্ক করত, চলাফেরা কমাতে বলত। কিন্তু বিশ্বাস, বিপ্লবী চেতনা আর দক্ষিণের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তাকে শিখিয়েছে নিপীড়নের সামনে দাঁড়াতে।
ফিলিস্তিনের প্রতিও ছিল তার স্পষ্ট অঙ্গীকার। দক্ষিণের মানুষ আরও দৃঢ় হবে, সত্য ও ফিলিস্তিনের দিকে আরও অটল থাকবে- এ বিশ্বাস প্রকাশ করেছিলেন মৃত্যুর আগেও।
তার ভাই আলি খলিলের কথায়, আমাল ছিলেন দক্ষিণ লেবাননের হাওয়া, পাহাড়, উপত্যকা আর পুরোনো ঘরগুলোর মতো।
আর সহকর্মীদের মতে, তার মৃত্যু শুধু শূন্যতা নয়- এক পরীক্ষা। তিনি যে জায়গা ফাঁকা করে গেলেন, তা পূরণ করা এখন বাকি থাকা সাংবাদিকদের দায়িত্ব।
সময়ের আলো/আআ