সারা দেশের অপরাধের বহুমাত্রিকতা ক্রমেই বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে এসব ঘটনায় সংঘটিত মামলার সংখ্যা। তবে সংঘটিত অপরাধের তুলনায় রুজুকৃত মামলার সংখ্যা অনেক কম বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
চুরি, ছিনতাই, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে অপহরণ, অস্ত্রবাজি, নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনাও বাড়ছে। পুলিশ সদর দফতর থেকে বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় রুজুকৃত মামলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে রাজধানীসহ পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের আওতাভুক্ত এলাকাগুলোতে। অপহরণের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটছে চট্টগ্রাম রেঞ্জে। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাতেও চট্টগ্রাম রেঞ্জে মামলার সংখ্যা সর্বাধিক। চোরাচালানের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি মামলা হচ্ছে সিলেট রেঞ্জে।
হত্যা : চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) সারা দেশে ৮৫৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ডিএমপি এবং ঢাকা রেঞ্জে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রুজুকৃত মোট মামলার সংখ্যা ছিল ২৬২টি। অর্থাৎ গত তিন মাসে সারা দেশে সংঘটিত মোট হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক-চতুর্থাংশই রাজধানী এবং এর পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে।
সারা দেশে পুলিশের ৯টি রেঞ্জের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সর্বাধিক ২০১টি মামলা হয় ঢাকা রেঞ্জে। মেট্রোপলিটন সিটিগুলোর মধ্যে ডিএমপিতে অপহরণের মতো হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও সবচেয়ে বেশি ঘটছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ- এই তিন মাসে ডিএমপিতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৬১টি মামলা হয়।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ছিল রাজনৈতিক ও পারিবারিক কারণে। এ ছাড়া এলাকার আধিপত্য বিস্তার, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ নানা কারণে এসব হত্রাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।
গত ৫ মার্চ নওগাঁর আত্রাইয়ে স্ত্রী-সন্তানকে ছুরিকাঘাতে হত্যার পর এক ব্যক্তি নিজেও আত্মহত্যা করেন। রাজধানীর মিরপুরের দারুসসালাম থানার বর্ধনবাড়ী এলাকায় গত ১৭ এপ্রিল তিন মাস বয়সি এক শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ উঠে তার সৎবাবার বিরুদ্ধে। একই দিনে পল্লবীতে ফিরোজা খানম ওরফে জোছনা (৬৮) নামে এক স্কুলশিক্ষককে হাতুড়িপেটা করে হত্যা করা হয়।
১৫ এপ্রিল রাতে মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকায় আসাদুল হক নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এর আগে ১২ এপ্রিল একই এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এলেক্স ইমন নামে এক যুবককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন বলেন, অরাজনৈতিক যে হত্যাকাণ্ডগুলো হচ্ছে তার বেশিরভাগই পারিবারিক সহিংতা। আবার কিছু হচ্ছে আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে। পাশাপাশি পূর্বশত্রুতার জেরেও এমন অপরাধ সংঘটিত হয়। এগুলো কিন্তু ঘরের মধ্যে সংঘটিত অরপাধ। এখানে আগাম কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে না। এ ধরনের অরাজনৈতিক অপরাধ বেড়ে যাওয়ার পেছনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। অপরাধীদের চিহ্নিত করা এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্য দিয়ে এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বরাবরই কাজ করে যাচ্ছে।
অপহরণ : চট্টগ্রাম ও এর আশপাশের অঞ্চলে অপহরণ ও খুনসহ গুরুতর অপরাধের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। সম্প্রতি বান্দরবান জেলার লামায় অপহৃত ৬ রাবার বাগান শ্রমিককে সেনাবাহিনীর অভিযানে উদ্ধার করা হয়। গত ১২ এপ্রিল চট্টগ্রামের বাকলিয়া এলাকায় এক কলেজছাত্রকে অপহরণের পর নির্মাণাধীন ভবনে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে একদল দুর্বৃত্ত। এর আগে গত গত ২৪ মার্চ চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানা এলাকায় ১৪ বছর বয়সি এক স্কুলছাত্রকে অপহরণের পর ধর্ষণ করা হয়।
বাংলাদেশ পুলিশের ৯টি রেঞ্জের মধ্যে অপহরণের ঘটনায় সর্বাধিক মামলা হয় চট্টগ্রাম রেঞ্জে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে এই রেঞ্জে ৬১টি অপহরণের ঘটনায় মামলা হয়। আর দেশের ৮টি মেট্রোপলিটন সিটির মধ্যে সর্বাধিক ৪৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) আওতাভুক্ত এলাকাগুলোতে। বছরের প্রথম তিন মাসে সারা দেশে অপহরণের ঘটনায় মামলা হয় ২৫৩টি।
চোরাচালান : দেশে সবচেয়ে বেশি চোরাচালান হচ্ছে সিলেট সীমান্ত দিয়ে। গত তিন মাসে পুলিশের তথ্যে এমনটাই জানা যায়। দেশের সব সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান হলেও সিলেট সীমান্তে চোরাচালান সিন্ডিকেট খুবই বেপরোয়া। সিন্ডিকেট সদস্যরা বিজিবি সদস্যদের ওপর আক্রমণ করতেও পিছপা হচ্ছে না। গত বছরের ১৬ মার্চ জৈন্তা সীমান্তে দুজন বিজিবি সদস্যকে রক্তাক্ত করে আটককৃত কয়েকটি গরু ছিনিয়ে নেয় চোরাচালানিরা।
গত ২৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার সিলেটের বিভিন্ন সীমান্ত থেকে অর্ধকোটি টাকার ভারতীয় চোরাইপণ্য জব্দ করে বিজিবি। সিলেটের গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে এসব পণ্য জব্দ করা হয়।
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে চোরাচালানের ঘটনায় সর্বাধিক মামলা হয় বাংলাদেশ পুলিশের সিলেট রেঞ্জে। এই রেঞ্জে তিন মাসে চোরাচালান সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ছিল ১২১টি। ৯টি রেঞ্জের মধ্যে ময়মনসিংহ রেঞ্জে ৮৮টি এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জে ৮৭টি চোরাচালান সংক্রান্ত মামলা নথিভুক্ত হয়।
পুলিশ সদর দফতর থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, বছরের প্রথম তিন মাসে ঢাকা রেঞ্জে নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত সর্বাধিক ৭৫০টি মামলা হয়। এরপর রংপুর রেঞ্জে ৪৭১টি এবং রাজশাহী রেঞ্জে ৪৬৭টি মামলা নথিভুক্ত হয়। তিন মাসে সারা দেশে অস্ত্র আইনে মামলার সংখ্যা ছিল ৫৯৭টি আর নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলা ছিল ৩ হাজার ৯৪৭টি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক ও অপরাধ বিশ্লেষক বলেন, নতুন সরকার গঠনের পর পুলিশ কিছুটা দ্বিধা নিয়ে কাজ করছে, আর সেই সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা।
তিনি বলেন, বিশেষ করে রাজধানীর কিছু এলাকায় অপরাধীরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অপরাধী নেটওয়ার্কের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন তিনি। এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, মানুষের মধ্যে এখনও ভীতি কাজ করছে। ফলে অনেক ঘটনা ঘটলেও নিরাপত্তাহীনতা ও হয়রানির ভয়ে অনেকেই মামলা করেন না। এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে জনবান্ধব পুলিশ গঠনের কোনো বিকল্প নেই।
তবে সম্প্রতি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করছে তা স্বীকার করেছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির।
গত ২০ এপ্রিল সোমবার রাজধানীর মালিবাগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সদর দফতরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, সম্প্রতি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করলেও পুলিশের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
সময়ের আলো/আআ