নন-স্টিকে স্বাস্থ্যঝুঁকি, মানদণ্ড চূড়ান্ত করেনি বিএসটিআই

অলিউল ইসলাম

জাতীয়

সহজে রান্না, কম তেল ব্যবহারসহ পরিষ্কারের সুবিধার কারণে নন-স্টিক প্যান এখন দেশের ঘরে ঘরে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণায়

2026-04-27T00:46:11+00:00
2026-04-27T00:46:11+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
নন-স্টিকে স্বাস্থ্যঝুঁকি, মানদণ্ড চূড়ান্ত করেনি বিএসটিআই
এক আঁচড়ে বের হতে পারে ৯ হাজার প্লাস্টিক কণা
অলিউল ইসলাম
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:৪৬ এএম 
নন-স্টিক প্যান। ছবি : সংগৃহীত
সহজে রান্না, কম তেল ব্যবহারসহ পরিষ্কারের সুবিধার কারণে নন-স্টিক প্যান এখন দেশের ঘরে ঘরে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্যানে সামান্য আঁচড় পড়লেও সেখান থেকে প্রায় ৯ হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা খাবারের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে বাংলাদেশে নন-স্টিক প্যানের কোটিংয়ের কোনো চূড়ান্ত মানদণ্ড না থাকায় প্রশ্ন উঠছে ভোক্তা সুরক্ষা নিয়েও।

নন-স্টিক প্যান নিয়ে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। এতে বলা হয়েছে, প্যানে একটি ছোট আঁচড় পড়লে সেখান থেকে প্রায় ৯ হাজার পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা খাবারে মিশতে পারে। আর কোটিং যদি পুরোনো বা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তবে প্রতি ব্যবহারে ২০ থেকে ২৩ লাখ পর্যন্ত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা খাদ্যে প্রবেশের আশঙ্কা থাকে।

গবেষকদের মতে, এসব কণা মূলত পলি টেট্রাফ্লুরোইথিলিন (পিটিএফই), যা ‘টেফলন’ নামে পরিচিত একটি সিন্থেটিক পলিমার। এই কোটিং খাবার প্যানে আটকে যাওয়া রোধ করে। তবে উচ্চ তাপমাত্রা, দীর্ঘদিন ব্যবহার বা ধাতব খুন্তি ব্যবহারের ফলে কোটিং ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয় এবং খাবারের সঙ্গে মিশে যেতে পারে।

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) জানিয়েছে, নন-স্টিক প্যানের জন্য দেশে এখনও নির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ড চূড়ান্ত হয়নি। 

সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের মান নির্ধারণ করতে হলে পণ্যের উপাদান, তাপ সহনশীলতা এবং খাদ্যে মিশে যাওয়ার মাত্রা নিরূপণে বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন হয়। বর্তমানে বিএসটিআইয়ের ম্যান্ডেটরি পণ্যের সংখ্যা প্রায় ৩১৩টি হলেও বাজারে পণ্যের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় সব পণ্যকে একসঙ্গে বাধ্যতামূলক মানের আওতায় আনা সম্ভব হয় না। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পণ্য নির্বাচন করা হয়।

বিএসটিআইয়ের মান বিভাগের পরীক্ষক (প্রকৌশল) মোহাম্মদ জাকির হোসাইন সময়ের আলোকে বলেন, নন-স্টিক কোটিং মূলত টেফলনের একটি প্রলেপ, যা খাবার আটকে যেতে দেয় না। তবে এই কোটিংয়ের স্ট্যান্ডার্ড এখনও চূড়ান্ত হয়নি। সম্ভবত ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ড যেটা আছে ইএন, সেটাই আমরা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে অনুসরণ করতে পারি সামনে। সেটার কাজ চলমান আছে।

বিএসটিআইয়ের সহকারী পরিচালক ফিরোজ আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, শুধু মেলামাইন টেস্টটা আছে আমাদের, সেটা দুধের ক্ষেত্রে। নন স্টিক প্যানের মাইক্রো প্লাস্টিক নিয়ে আমাদের পরীক্ষার পরিসর এখনও সীমিত। এটি মূলত গবেষণার বিষয়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নন-স্টিক বা কোটেড প্যান উচ্চ তাপে ব্যবহার করলে সেখানকার সূক্ষ্ম প্লাস্টিক বা রাসায়নিক উপাদান খাদ্যের সঙ্গে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, লিভার ও কিডনির ওপর প্রভাব পড়ার মতো ঝুঁকির ইঙ্গিত বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া যাচ্ছে বলে তারা জানান।

সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদ সময়ের আলোকে বলেন, দেশে এখনও টেফলনজাত প্যানই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। অতিরিক্ত তাপে এসব প্যানে থাকা কিছু কেমিক্যাল খাদ্যের সঙ্গে মিশে যেতে পারে, যা শরীরে হরমোনজনিত জটিলতা তৈরি করতে পারে। এর ফলে থাইরয়েড সমস্যা, প্রজননক্ষমতার ওপর প্রভাব কিংবা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে এ বিষয়ে সরাসরি সম্পর্ক নির্ধারণে আরও বড় গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

বিকল্প হিসেবে ডা. হাসান মোস্তফা সিরামিক, কাস্ট আয়রন, কার্বন স্টিল বা স্টেইনলেস স্টিলের প্যান ব্যবহারের পরামর্শ দেন। তবে তুলনামূলক উচ্চমূল্যের কারণে অধিকাংশ ভোক্তা এখনও নন-স্টিক প্যানেই নির্ভরশীল বলে জানান তিনি। 

তার মতে, শুধু প্যানের ধরন নয়, রান্নার পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত তাপে রান্না বা ধাতব খুন্তি ব্যবহার কোটিং নষ্ট করে ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে তিনি জানান।

পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ এখন বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। নন-স্টিক প্যানের কোটিংসহ দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন উৎস থেকেও এ ধরনের কণা পরিবেশে যুক্ত হচ্ছে। বিশেষ করে স্থানীয়ভাবে তৈরি কোটিংয়ের মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন থাকায় ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন তারা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, নন-স্টিক প্যানের কোটিংয়ের একটি অংশ স্থানীয়ভাবে তৈরি হয়, যার মান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাই এ বিষয়ে দেশের নিজস্ব মানদণ্ড ও গাইডলাইন প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি। 

তিনি বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। পানি, মাটি, খাদ্য, সব জায়গাতেই এর উপস্থিতি রয়েছে। এটি যখন পানি বা বাতাসের সঙ্গে মিশে যায়, তখন যে কোনো খাদ্যশৃঙ্খল বা ফুড ওয়েবকে দূষিত করতে পারে। জলজ প্রাণীরা এসব প্লাস্টিক কণাকে শনাক্ত করতে না পেরে নিয়মিত খাদ্যের সঙ্গে গ্রহণ করে এবং তা তাদের দেহে থেকে যায়।

তিনি জানান, মাছ ও পোলট্রি মাংস নিয়ে করা গবেষণায় এসব কণার উপস্থিতি পেশির মধ্যেও পাওয়া গেছে, যা থেকে বোঝা যায় এগুলো সহজেই মানবদেহে ফিরে আসতে পারে। তার মতে, এর ক্ষতিকর দিক ব্যাপক এবং বহুমাত্রিক।

অন্যদিকে বাজারে দেশীয় ও বিদেশি, উভয় ধরনের নন-স্টিক প্যানের চাহিদা বাড়ছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, নিউমার্কেটসহ একাধিক এলাকার বিক্রেতারা জানান, তুলনামূলক কম দাম ও সহজলভ্যতার কারণে দেশীয় ব্র্যান্ডের পণ্যই বেশি বিক্রি হচ্ছে। তবে পণ্যের মান সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে। 

অন্যদিকে ক্রেতারা বলছেন, কম তেলে রান্না ও সহজ পরিষ্কারের সুবিধার কারণে তারা নন-স্টিক প্যান ব্যবহার করেন। তবে সাম্প্রতিক ঝুঁকির তথ্য জানার পর অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং নিরাপদ পণ্য বাছাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ডের দাবি জানিয়েছেন তারা।

মোহাম্মদপুর টাউন হলের মিনা গিফট সেন্টারের বিক্রেতা মো. স্বাধীন মিয়া সময়ের আলোকে বলেন, আমরা বিভিন্ন কোম্পানির নন-স্টিক প্যান বিক্রি করি। আরএফএল, কিয়ামসহ একাধিক কোম্পানি আছে। চায়নিজও হয়। এগুলোর মধ্যে ভালো কোনটা প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, দেশি ব্র্যান্ডের প্যানের চাহিদাই বেশি। দাম তুলনামূলক কম এবং সহজলভ্য হওয়ায় ক্রেতারা এগুলোর দিকেই ঝুঁকছেন।

এ আর এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. শরীফ সময়ের আলোকে বলেন, সবচেয়ে বেশি কিয়াম কোম্পানির প্যানটা চলে। দাম ও সাইজ নিয়ে তিনি বলেন, ঢাকনাসহ বিগ সাইজটা ১ হাজার ৬০০ টাকা। ঢাকনা ছাড়া ১ হাজার ২০০ টাকা। মিডিয়ামগুলো ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত। ঢাকনাসহ ছোটগুলো ৮৫০ টাকা থেকে শুরু করে ১১০০ টাকা। ঢাকনা ছাড়া ৫৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৭০০ টাকা পর্যন্ত।

নিউমার্কেটের চন্দ্রিমা মার্কেটের ৩ তলায় অবস্থিত দিসনিয়ের বিক্রয় প্রতিনিধি জানান, তাদের কাছে মার্বেল কোটিংয়ের ফ্রাইপ্যান বা কুকওয়্যার রয়েছে। সর্বনিম্ন ২৪ সেন্টিমিটার সাইজের মার্বেল কোটিংয়ের এই পাত্রগুলো ইন্ডাকশন ওভেনে ব্যবহার করা যাবে। মার্বেল সিরামিক ও টেফলন মার্বেল কোটিংযুক্ত এই পণ্যটির দাম পড়বে ১ হাজার ৪০০ টাকা। তবে বর্তমানে তাদের কাছে সাদা সিরামিকের পণ্যটি স্টকে নেই বলে তিনি জানান।

নিউমার্কেটে নন-স্টিক প্যান কিনতে আসা ছামসুন্নাহার বেগম বলেন, কম তেলে রান্না করা যায় আর পরিষ্কার করাও সহজ, এই কারণে নন-স্টিক প্যান ব্যবহার করি। তবে এখন ঝুঁকির কথা শুনে চিন্তায় আছি। ভালো মানের পণ্য কীভাবে চিনব, সেটা বুঝতে পারি না।

ক্রেতা স্বর্ণালী স্মৃতি বলেন, আমরা সাধারণত দামের দিকে তাকিয়ে প্যান কিনি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টাও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। যদি নির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকত, তা হলে ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ পণ্য বেছে নেওয়া সহজ হতো।

নন-স্টিক প্যানের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে বিশেষজ্ঞরা কিছু সতর্কতা মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। সেগুলো হলো : নন-স্টিক প্যানে ধাতব খুন্তি বা ধারালো বস্তু ব্যবহার না করা। উচ্চ তাপে রান্না এড়িয়ে চলা। কোটিং উঠে গেলে প্যান ব্যবহার বন্ধ করা। প্যান পরিষ্কারে নরম স্পঞ্জ ব্যবহার করা। পুরনো প্যান নিয়মিত পরিবর্তন করা প্রভৃতি।


  বিষয়:   নন-স্টিক  স্বাস্থ্যঝুঁকি  মানদণ্ড  বিএসটিআই  প্লাস্টিক কণা 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: