উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরজুড়ে এখন এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা- প্রকৃতির সঙ্গে কৃষকের লড়াই। আকাশে মেঘ জমলেই শঙ্কা, বৃষ্টি নামলেই দুশ্চিন্তা। কারণ, আর কয়েকটি দিন সময় পেলেই ঘরে উঠতে পারত সোনালি ধান; কিন্তু তার আগেই আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, জমিতে পানি জমে যাওয়ায় অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে আধাপাকা ধান কেটে ফেলছেন। কেউ আবার অপেক্ষা করছেন- যদি আবহাওয়া একটু সহনীয় হয়। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই চলছে ফসল বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা।
লক্ষ্মীপুর গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, তার অধিকাংশ জমির ধান এখনো কাটা হয়নি। একদিকে জমিতে পানি, অন্যদিকে শ্রমিক ও যন্ত্রের সংকট- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। রোদ না থাকায় কাটা ধান শুকানোও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ধান কেটে তুললেও ক্ষতির আশঙ্কা, আর না কাটলে বন্যায় তলিয়ে যাওয়ার ভয়।
একই চিত্র দেখা গেছে অন্যান্য হাওর এলাকাতেও। অনেক কৃষক ধান পুরোপুরি পাকার আগেই কেটে নিচ্ছেন, যাতে অন্তত কিছু ফসল রক্ষা করা যায়। তাদের ভাষায়, ‘যা পাওয়া যায় তাই লাভ’ -কারণ পুরো ফসল হারানোর ঝুঁকি এখন বাস্তব।
আরও পড়ুন
আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস বলছে, সামনে কয়েক দিনে বৃষ্টিপাত আরও বাড়বে। বিশেষ করে উজানে ভারী বৃষ্টি হলে পাহাড়ি ঢল নেমে দ্রুত হাওর প্লাবিত হতে পারে। ইতিমধ্যে নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাওরের ফসল রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হলেও অতিবৃষ্টি ও ঢলের চাপ অনেক বাঁধের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফলে আকস্মিক বন্যা দেখা দিলে ব্যাপক ফসলহানির আশঙ্কা রয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলায় এবার বিপুল পরিমাণ জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। তবে এখনো অর্ধেকের বেশি ধান মাঠেই রয়ে গেছে। এর একটি বড় অংশ পুরোপুরি পাকা নয়, যা কৃষকদের সিদ্ধান্তকে আরও কঠিন করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাওর অঞ্চলের কৃষকেরা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু প্রতিবছর প্রাকৃতিক ঝুঁকির মুখে তাদের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
এএডি/