দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ ও নির্যাতনের পথ পেরিয়ে ক্ষমতায় আসা একটি রাজনৈতিক দলের কাছে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা থাকে ত্যাগী নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন। দীর্ঘ ১৭ বছর নেতাকর্মীদের আন্দোলন, জেল-জুলুম-নির্যাতন এবং ত্যাগে ভর করে ক্ষমতায় এসেছে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। তাই দলের কাছে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের আকাক্সক্ষা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে দলের জ্যেষ্ঠ সিনিয়র নেতারা সরকারের অংশ হয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ত হয়ে পড়া এবং দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে যাওয়ায় নিজেদের প্রত্যাশা ব্যক্ত করতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়ছেন নেতাকর্মীরা। দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত মূল্যায়িত না হওয়ার আক্ষেপ ছড়িয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় দলীয়প্রধান বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মতবিনিময়ের পাশাপাশি উজ্জীবিত হতে চান তারা।
তাদের ভাষ্য, দীর্ঘ ১৭ বছর নেতাকর্মীদের আন্দোলন, সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার শেখ হাসিনাকে বিদায় করে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। প্রত্যাশা ছিল, বিএনপির সরকার গঠন করতে পারলে ত্যাগী ও আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখা প্রকৃত নেতাকর্মীরা মূল্যায়িত হবে। কিন্তু সরকারের ৩ মাস পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ ত্যাগী নেতাকর্মীরা এখনও মূল্যায়িত হয়নি। তাদের কথা শোনার মতো কেউ নেই। এ জন্য দলীয়প্রধান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজেদের কথা তুলে ধরতে চান তারা।
নয়াপল্টনসহ বিভিন্ন আলোচনায় এ বিষয়টি উল্লেখ করে তারা বলছেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এক ধরনের অবস্থা ছিল। তখন আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে সরকার হটানোই ছিল একমাত্র লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যে লন্ডনে থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সিনিয়র নেতাদের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর প্রত্যাশা ছিল বিএনপি সরকার গঠন করলে সরকার বা দলে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা হবে। সরকার গঠন হয়ে ৩ মাস পেরিয়ে গেছে, ত্যাগীদের পাশাপাশি অনেক সুবিধাবাদীও মূল্যায়িত হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ত্যাগী নেতাকর্মী এখনও মূল্যায়িত হননি। নির্বাহী কমিটির অনেক পদ শূন্য, কাউন্সিলও হয় না অনেক দিন। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর কমিটিও মেয়াদোত্তীর্ণ। কাউন্সিল হলে এবং মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠন হলে অনেককে মূল্যায়িত করা যেত। অথচ সেটারও কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে দলের সাংগঠনিক অবস্থাও নাজুক হয়ে পড়ছে।
রোববার নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতাকর্মীর সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, দলীয়প্রধান লন্ডনে অবস্থানকালে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সাংগঠনিক নির্দেশনা দিতেন। দেশে আসার পর থেকেই তিনি নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় সেই যোগাযোগে ছেদ পড়ে। সরকার গঠনের পর সপ্তাহের বেশিরভাগ সময় তিনি দেশের কাজে ব্যস্ত। দেশে আসার পর থেকে দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়ই তো সেভাবে হয়নি। তা হলে সর্বস্তরের ত্যাগী নেতাকর্মীদের বক্তব্য তার কাছে পৌঁছাবে কীভাবে। সম্প্রতি নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এসেছিলেন চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি নিজেই নেতাকর্মীদের নয়াপল্টনে আসতে বলেন। এমন খবরে হাজারো নেতাকর্মী ভিড় করেন ওই এলাকায়। নিরাপত্তার কারণে গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতাই দেখা করতে পারেননি। বেছে বেছে কয়েকজনকে দেখা করার সুযোগ দেওয়া হয়।
তাদের আক্ষেপ, দলের প্রধানের সঙ্গে যদি দেখা করে কথা বলার সুযোগই না পাই, তা হলে দলের জন্য এই দীর্ঘ ত্যাগের মূল্যায়ন কীভাবে হবে?
তারা বলছেন, একসময় নেতাকর্মীদের পদচারণে মুখর থাকা নয়াপল্টন কার্যালয়ে সেভাবে কোনো নেতার আনাগোনা নেই। প্রায় প্রতিদিন আসতেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনিও এখন অনিয়মিত। তাকেও সেভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। এ ছাড়া আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা নেতাদেরও যথাযথ মূল্যায়ন না করায় তাদের অনুসারী নেতাকর্মীরা হতাশ।
অনেকেই আক্ষেপ করে বলছেন, আন্দোলনের সময় যাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি, তারাই এখন প্রভাবশালী। আর যারা জীবনবাজি রেখে রাজপথে ছিলেন, তারা অবহেলিত। কেউ কেউ সরাসরি দলের কাছে ত্যাগের স্বীকৃতি দাবি করছেন। তাদের মতে, শুধু ক্ষমতায় আসাই শেষ কথা নয়, যারা এই পথ তৈরি করেছেন, তাদের মূল্যায়ন না হলে দলীয় ঐক্য ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি হুমকির মুখে পড়তে পারে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, ড. আসাদুজ্জামান রিপন, উপদেষ্টা জয়নুল আবদীন ফারুক, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচির রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুন হাসান, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান, সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল, সাবেক সভাপতি রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণের মতো হাজারো ত্যাগী নেতার যথার্থ মূল্যায়ন চান দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী ১১টি সংগঠনের মধ্যে ১০টিই মেয়াদোত্তীর্ণ। দলীয় গঠনতন্ত্রে প্রতি তিন বছর পর নতুন কমিটি গঠনের বিধান থাকলেও দীর্ঘদিন তা বাস্তবায়ন হয়নি। এতে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতৃত্বের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই পরিস্থিতি মূল দল বিএনপিতেও। সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল হয়েছিল ২০১৬ সালের মার্চে। নিয়ম অনুযায়ী তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও এক দশকেও তা হয়নি। তবে এই সময়ে নির্বাহী কমিটিতে একাধিকবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। যুক্ত হয়েছে নতুন মুখ। নির্বাচনের পরও কয়েকজনকে নির্বাহী কমিটিতে বিশেষ সম্পাদক পদে স্থান দেওয়া হয়েছে।
এদিকে দলের ঢাকা মহানগর, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল, কৃষক দলের কমিটি পুনর্গঠনের আলোচনায় নিজেদের মতো লবিং তদবির শুরু করেছেন পদ প্রত্যাশী নেতারা। কমিটিতে ত্যাগী ও পরীক্ষিতরা যেন মূল্যায়িত হন এবং প্রয়োজনে কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠনের দাবি জানান নেতাকর্মীরা।
দলের দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, ঝিমিয়ে পড়া সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে, এটা শিগগিরই আরও গতি পাবে। দলের জাতীয় কাউন্সিল, মেয়াদোত্তীর্ণ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি পুনর্গঠন করার বিষয়ে কাজ চলছে। দলীয় প্রধান এসব বিষয়ে ওয়াকিবহাল। এক এক করে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি দেওয়া হবে। কমিটিগুলো পুনর্গঠিত হলে ত্যাগী ও পরীক্ষিত স্থান পাবেন।
দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমের বিষয়ে জানতে রুহুল কবির রিজভী সময়ের আলোকে বলেন, দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। আগে ছিল শুধু সাংগঠনিক কার্যক্রম কিন্তু এখন বিএনপি সরকারে। সুতরাং বিএনপির জনগণের প্রতি যে কমিটমেন্ট আছে সেটাও দেখতে হবে, বাস্তবায়ন করতে হবে। যারা সরকারে নেই তারা দলীয় কার্যক্রমগুলো দেখছেন। অসুস্থ থাকায় কয়েক দিন নয়াপল্টনে যাইনি, এখন যাওয়া শুরু করেছি। তিনি বলেন, সারা দেশে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে, কোথাও সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছে। যারা দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন সব কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে সেগুলো এক এক করে দেওয়া হবে। সেখানে ত্যাগী ও পরীক্ষিতরা স্থান পাবেন।
দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে নেতাকর্মীদের মতবিনিময়ের বিষয়ে তিনি বলেন, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে নেতাকর্মীদের মতবিনিময় হচ্ছে। প্রায়ই তিনি গুলশান অফিসে বসে নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলছেন। নেতকর্মীদের সঙ্গে দলীয়প্রধানের ইন্টারেকশনটা আরও বাড়বে, ঘাটতি থাকবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, নেতাকর্মীরাই বিএনপির প্রাণ, তাদের ত্যাগ অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের ত্যাগী নেতারা মূল্যায়িত হবেন।