বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ককে এক নতুন এবং টেকসই উচ্চতায় নিয়ে যেতে ‘এআরটি’ চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে ওয়াশিংটন। এই লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় আইন পাস এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের আমূল সংস্কার চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচ্যাম) আয়োজিত ‘যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব অগ্রসরকরণ’ শীর্ষক এক নীতি সংলাপে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন এসব কথা বলেন।
সংলাপে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র এখন অতীতের সেই ‘ব্যর্থ’ নীতিগুলো থেকে সরে আসছে, যা অসামঞ্জস্যপূর্ণ বাণিজ্য ও অস্বচ্ছ বাজারকে উৎসাহিত করত। ওয়াশিংটন এখন অনুদানের বদলে বাণিজ্য, আর সহায়তার বদলে বিনিয়োগনির্ভর কৌশলের দিকে এগোচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, ১৭ কোটিরও বেশি জনসংখ্যা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত অবস্থানের কারণে একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের প্রধান উৎপাদনকেন্দ্র হয়ে ওঠার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।
সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া ‘এআরটি’ চুক্তিকে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করে রাষ্ট্রদূত বলেন, এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের পণ্য মাত্র ১৯ শতাংশ শুল্কে মার্কিন বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। চুক্তিটি না থাকলে এই শুল্কের হার হতো ৩৫ শতাংশ। তবে এই সুবিধা পাওয়ার বিনিময়ে বাণিজ্যে ভারসাম্য আনতে হবে। অর্থাৎ, বাংলাদেশে মার্কিন পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান শুল্ক ও অশুল্ক বাধাগুলো দূর করতে হবে। রাষ্ট্রদূতের মতে, দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্য ঘাটতি কোনো দেশের বাজারের জন্যই ভালো ফল বয়ে আনে না।
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট কিছু অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেন রাষ্ট্রদূত। তিনি জানান, বাংলাদেশ ৩৫০ কোটি ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য—গম, সয়াবিন, তুলা ও ভুট্টা ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। উন্নত গুণমানের কারণে মার্কিন গমের অপচয়ের হার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। এছাড়া আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য (এলপিজি) ক্রয়ের অঙ্গীকারও করেছে বাংলাদেশ, যা বর্তমানে আমদানির ধারাবাহিকতা বজায় রাখলেই সম্ভব।
বাংলাদেশে ব্যবসা করার চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে অকপট কথা বলেন ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন। তিনি বলেন, মার্কিন কোম্পানিগুলো কঠোর নিয়ম-অনুবর্তিতা বা কমপ্লায়েন্স মেনে চলে। তাদের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, মেধাস্বত্ব রক্ষা, সহজ লাইসেন্সিং এবং কাস্টমস প্রক্রিয়ার পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র গোপন সমঝোতা বা ‘ঋণ-ফাঁদের’ কূটনীতিতে বিশ্বাস করে না। বাংলাদেশের উচিত এমন কোনো বিলিয়ন ডলারের সুড়ঙ্গ প্রকল্পের দায় না নেওয়া, যার কোনো বাস্তব সুফল নেই। বরং আইনের শাসনের অধীনে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই এখন প্রধান কাজ।
বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে লক্ষ্যমাত্রা প্রধানমন্ত্রী নির্ধারণ করেছেন, তা পূরণে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া রেলওয়ের সিগন্যালিং ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিকায়ন, বন্দরের লজিস্টিকস অটোমেশন এবং বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের উন্নয়নে মার্কিন দক্ষতা ব্যবহারের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। সড়ক, সেতু ও নগর পরিবহনের প্রকৌশল নকশা ও নির্মাণে বিশ্বখ্যাত মার্কিন কোম্পানিগুলো মান ও স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা দিয়ে কাজ করতে আগ্রহী।
বক্তব্যের শেষে মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্পষ্ট বার্তা দেন, যুক্তরাষ্ট্র তার অঙ্গীকার পূরণ করেছে এবং বাজার খুলে দিয়েছে। এখন অগ্রগতিকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশের। এর জন্য প্রয়োজনীয় আইন পাস করা, অপ্রয়োজনীয় বিধিবিধান সংস্কার করা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘ওয়ান-স্টপ’ সেবা কেন্দ্র কার্যকর করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি মার্কিন রাষ্ট্রদূতের প্রস্তাবগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেন এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
/কহু