দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় অন্তত ১৯০ জন বিএনপি নেতা বহিষ্কৃত হন। তাদের মধ্যে অনেকেই কেন্দ্র ও তৃণমূলের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদে ছিলেন। ভোটে অংশ নিয়ে বেশিরভাগ বিদ্রোহী প্রার্থী ভরাডুবির শিকার হন। নির্বাচনে জিতে বিএনপি এখন সরকারে।
দলের সুদিনে বিদ্রোহী প্রার্থীরা রয়েছেন দলের বাইরে। ইতিমধ্যে নির্বাচনের আড়াই মাস পার হয়েছে। এর মধ্যে একজন গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক নেতা জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দিয়েছেন। অন্যদিকে বহিষ্কৃতরা দলে ফেরার তৎপরতা চালাচ্ছেন। সম্প্রতি কয়েকজন নেতা দলে ফিরেছেন। শৃঙ্খলা ভঙ্গের মাত্রা ও অবস্থান বিবেচনা করে বিএনপি বহিষ্কৃতদের দলে ফেরাতে চায়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর প্রথম দিকে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে ১১৭টি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন অন্তত ১৯০ জন বিএনপি নেতা। পরবর্তীতে দলীয় নির্দেশনা মেনে বেশিরভাগ নেতা তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। তবে দলের কঠোর অবস্থান মানেননি অনেক হেভিওয়েট নেতা। তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে লড়েন। ফলে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাদের বহিষ্কার করে বিএনপি। এমনকি তাদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় সারা দেশের সহস্রাধিক নেতাকর্মীকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকা ৭৮টি আসনের মধ্যে ২১টি আসনে জয় পান জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি জোটের প্রার্থীরা। আর বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা জয়ী হন সাতটি আসনে।
জানা গেছে, এই সাতজন এমপির মধ্যে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বাদে সবাই দলে সপদে ফিরতে চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ দলটির নীতিনির্ধারকদের কাছে ভুল স্বীকার করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার পথে রয়েছেন। শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল বাজিতপুর ও নিকলী উপজেলা নিয়ে গঠিত কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। না পেয়ে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করেন। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট করায় বহিষ্কৃত হন। যদিও নির্বাচনে জিতে তিনি সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন। এই স্বতন্ত্র এমপি প্রত্যাশা করছেন, শিগগিরই তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হবে এবং তিনি পুরোদমে বিএনপির রাজনীতিতে ফিরতে পারবেন।
চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আসনে বিএনপির বিদ্রোহী হিসেবে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে জয় পান মো. আবদুল হান্নান। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, ‘দলীয় আদর্শ ও রাজনীতির প্রতি আমার আজীবনের অঙ্গীকার অটুট থাকবে। আমি অবশ্যই দলে ফিরতে চাই। বিএনপিই আমার শেষ ঠিকানা।’
বিদ্রোহী হিসেবে নাটোর-১ আসনে নির্বাচন করে বহিষ্কৃত হওয়া সাবেক সহ-দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গেই থাকব আমৃত্যু। আমি এখনও দলের সঙ্গেই আছি। আগে পদে ছিলাম, এখন কর্মী-সমর্থক হিসেবে কাজ করছি। বিএনপির সঙ্গে আমার নাড়ির সম্পর্ক। জীবনের ৪৩ বছর বিএনপিতে কাজ করেছি এবং দীর্ঘদিন দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করেছি। আবার যখন দলের দুর্দিন আসবে, তখন বুক পেতে দেব। এখন তো দলের সুসময়; আসল-নকল কর্মী চেনা দায়।’
এ সময় ‘সমর্থক হিসেবে’ দলের পাশে থাকার কথা তুলে ধরে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এবং স্থায়ী কমিটির কাছে চারটি চিঠিও দিয়েছেন তিনি।
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ঢাকা-১২ আসনে নির্বাচন করায় ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরবকে বহিষ্কার করা হয়। নীরব স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে পরাজিত হন। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, ‘বিএনপিই আমার শেষ ঠিকানা। আমি শহিদ জিয়ার আদর্শের সৈনিক। তারেক রহমানের হাতকে শক্তিশালী করতে চাই। দল বহিষ্কার করেছে, আবার ফিরিয়েও নেবে- সেই বিশ্বাস আছে। বিএনপির বিরুদ্ধে কেউ কিছু করলে আমরা প্রতিহত করব। প্রথম থেকে বিএনপির সঙ্গে ছিলাম, শেষ পর্যন্তও থাকব।’
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় ঢাকা-১৪ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী এস এ সিদ্দিক সাজুকে নির্বাহী কমিটির সদস্য পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। সাজু বলেন, ‘অন্য দলে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব পাচ্ছি। কিন্তু বিএনপিই আমার শেষ ঠিকানা। দলের সঙ্গেই আছি। দলের পুনর্বিবেচনার অপেক্ষায় আছি। আশা করি দল আমাদের সুযোগ দেবে। বিএনপি ছাড়া অন্য কিছু ভাবি না।’
পটুয়াখালী-৩ আসনটি গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে ছেড়ে দেয় বিএনপি। এ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য হাসান মামুন স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করে পরাজিত হন। দলীয় নির্দেশনা অমান্য করায় তাকে বহিষ্কার করা হয়। বিএনপিতে ফেরা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এখনই কিছু ভাবছি না। পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছি। পরিবেশ তৈরি হলে করণীয় ঠিক করব।’
এছাড়াও বিগত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করে বহিষ্কার হন, তাদেরকেও দলে ভেড়াতে ইতিবাচক আছে বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা।
সংসদ নির্বাচনে দল মনোনীত প্রার্থীর বিপক্ষে প্রচার চালানোর কারণে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য মোহাম্মদ দুলালকে বহিষ্কার করা হয়। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে, অর্থাৎ ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে ধানের শীষের প্রার্থী দীপু ভূঁইয়াকে সমর্থন দেন। পরবর্তীতে তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়।
দল ছেড়েছেন বহিষ্কৃত ইসহাক সরকার : সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-তে যোগ দিয়েছেন যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা ইসহাক সরকার।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৭ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় গত ৪ ফেব্রুয়ারি তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। ইসহাক সরকার বিএনপিতে কোণঠাসা থাকা ও হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন। শেখ হাসিনার শাসনামলে তিন শতাধিক রাজনৈতিক মামলার শিকার এই নেতা জানান, জনসেবার সুযোগ পেতেই তিনি এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন।
জানা গেছে, আরও কয়েকজন বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা অন্য দলে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
কী ভাবছে বিএনপি : নির্বাচনের সময় বহিষ্কৃতদের দলে ফেরানো নিয়ে বিএনপিতে দুই ধরনের মত রয়েছে। দলের এক সিনিয়র নেতা বলেন, ‘স্বতন্ত্র বিদ্রোহী প্রার্থীদের ডেকে একসঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা উচিত।’ তবে অন্য একটি পক্ষের মতে, যারা দলের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত মানেননি, তাদের শাস্তির আওতায় রাখা প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘কে কোন দলে যাচ্ছে, তা নিয়ে আমরা ভাবছি না। দলীয় ফোরামে বহিষ্কৃতদের নিয়ে এখনও কোনো আলোচনা হয়নি। এটি সর্বোচ্চ ফোরামের সিদ্ধান্তের বিষয়, তাই আগাম কিছু বলা যাবে না।’
অন্যদিকে স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যারা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিল, তাদের বিষয়ে এখনই মন্তব্য করার সময় আসেনি। দলীয় ফোরামেই সিদ্ধান্ত হবে।’
সময়ের আলো/আআ