সুন্দর জীবনের স্বপ্নে বিদেশযাত্রা অনেক বাংলাদেশির কাছেই এক প্রলুব্ধকর হাতছানি। কিন্তু সেই স্বপ্নের পেছনে ছুটতে গিয়ে অবৈধ পন্থার আশ্রয়, দালাল চক্রের প্রতারণা এবং অজ্ঞতার কারণে অনেকেই পৌঁছে যাচ্ছেন অনিশ্চিত অন্ধকারে। যে স্বপ্ন একদিন ছিল সম্ভাবনার, তা অনেকের জীবনে পরিণত হচ্ছে দুঃস্বপ্নে। ঠাঁই হচ্ছে কারাগার, আটককেন্দ্রে। সেই সঙ্গে ভাগ্যে জুটছে মানব পাচার চক্রের নির্মম নির্যাতন, সেই নির্যাতনের শিকার হয়ে হরহামেশা মৃত্যুও হচ্ছে অনেকের।
ভুয়া নথি দিয়ে অবৈধভাবে অন্য রাষ্ট্রে প্রবেশ, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থান, কর্মসংস্থান বিষয়ক আইন-কানুন লঙ্ঘন, মাদক সংক্রান্ত অপরাধ, সাধারণ অপরাধসহ একাধিক অনিয়মের কারণে প্রচুর বাংলাদেশি বিদেশে বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত অতিলোভের কারণে বাংলাদেশিরা দালাল চক্রের মাধ্যমে অবৈধ পন্থায় বিদেশে গিয়ে কারাগারে বন্দি হন বা বিদেশে বিভিন্ন চক্রের হাতে বন্দি হয়ে মুক্তিপণ দিতে বাধ্য হন।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বিদেশে গিয়ে বিভিন্ন অপরাধের দায়ে প্রায় ১২ হাজার বাংলাদেশি একাধিক দেশের কারাগারে বন্দি আছেন। বিদেশের কারাগারে বন্দিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সৌদি আরবের কারাগারে প্রায় ৫ হাজার বন্দি রয়েছেন। এর বাইরে বিভিন্ন মানব চক্রের হাতে প্রচুর বাংলাদেশি বন্দি আছেন, যাদের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। এসব বাংলাদেশির ক্ষেত্রে মূল বিষয় হচ্ছে অবৈধ পন্থার আশ্রয় নিয়ে বিদেশযাত্রা।
বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রায় সব বাংলাদেশিরই স্বপ্ন থাকে ইউরোপের দেশগুলোতে প্রবেশ করার। অনেকেই মনে করেন, কোনোভাবে ইউরোপে একবার ঢুকতে পারলে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না। এ কারণে অনেকেই সরাসরি মানব পাচার চক্রের সদস্যদের কাছে যান। দালাল চক্র প্রচুর অর্থের বিনিময়ে ভুয়া নথিপত্র তৈরি করে তাদের বিদেশ পাঠিয়ে থাকে।
সম্প্রতি ইউরোপের ১৩টি দেশ একযোগে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভিসা ইস্যুতে সতর্কবার্তা জারি করেছে। সতর্কবার্তা দেওয়া দেশগুলো হলো– অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, হাঙ্গেরি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্য।
এই দেশগুলোর যৌথ সতর্কবার্তায় বলা হয়, ভিসা, পারমিট বা অন্যান্য কনস্যুলার সেবা নিতে সব আবেদনকারীকে সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করার আহ্বান জানানো হয়। বার্তায় আবেদনকারীদের ভুয়া নথি, অবিশ্বস্ত বা লাইসেন্সবিহীন এজেন্ট ব্যবহার না করতে এবং অননুমোদিত ব্যক্তি, এজেন্ট বা মিশনের কাছে অর্থ প্রদান না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে ভিসা প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, আর্থিক ক্ষতি, সীমান্তে প্রবেশে বাধা কিংবা গুরুতর আইনি শাস্তির মতো পরিণতি হতে পারে। সবসময় যাচাইকৃত তথ্য ও বৈধ কর্তৃপক্ষের সরবরাহ করা সরকারি মাধ্যমের ওপর নির্ভর করার আহ্বান জানানো হয়। সবার জন্য নিরাপদ, ন্যায্য ও স্বচ্ছ আবেদন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাই তাদের যৌথ অগ্রাধিকার।
সৌদি আরব, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশ কঠোরভাবে ইসলামি আইন অনুসরণ করে থাকে। এসব দেশে থাকা বাংলাদেশিরা অনেক সময়ই স্থানীয় আইন সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে কারাগারে বন্দি থাকতে বাধ্য হন। যেমনটি ঘটেছিল ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আইন লঙ্ঘন করে মিছিল-সমাবেশে অংশ নেওয়ায়। এ সময় ২০০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়ে কারাগারে যান।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে গত মার্চে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও বিভ্রান্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশিসহ একাধিক বিদেশিকে গ্রেফতার করে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ।
এদিকে প্রায়ই শোনা যায়, ইউরোপের দেশগুলোতে মানব পাচার চক্রের সহায়তায় প্রবেশ করতে গিয়ে একাধিক বাংলাদেশি লিবিয়ায় দালাল চক্রের হাতে বন্দি হন এবং পরবর্তী সময়ে মুক্তিপণের দাবি করে আটক বাংলাদেশিদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। শুধু তাই নয়, নির্যাতনের ভিডিওচিত্র দেশে পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দ্রুত মুক্তিপণের জন্য চাপ দেওয়া হয়।
লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, সম্প্রতি ৩৭ জন বাংলাদেশিকে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উদ্ধার করে দূতাবাসের কাছে হস্তান্তর করেছে। এর আগে ২৩ এপ্রিল লিবিয়া থেকে ১৭৪ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়। দূতাবাস জানায়, প্রত্যাবাসিতদের বেশিরভাগই সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইউরোপ গমনের উদ্দেশ্যে মানব পাচারকারীদের প্ররোচনায় লিবিয়ায় অনুপ্রবেশ করেন। তাদের অনেকে বিভিন্ন সময়ে অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
চলতি এপ্রিল মাসে মোট ৩৪৯ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়, যাদের প্রায় সবাই লিবিয়ার বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টার বা কারাগারে বন্দি ছিলেন। প্রতি মাসেই লিবিয়া থেকে এমন কয়েকশ বাংলাদেশিকে সরকার দেশে ফিরিয়ে আনে।
এ ছাড়া ইউরোপে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে বহু বাংলাদেশি প্রাণ হারান। নৌকাডুবির অনেক ঘটনা জনসমক্ষে আসে, আবার অনেক ঘটনাই অপ্রকাশিত থেকে যায়। মূলত ইতালি, স্পেন, বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের একাধিক দেশে যাওয়ার জন্য দালাল চক্র লিবিয়াকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে। লিবিয়ার বিভিন্ন স্থান থেকে ভূমধ্যসাগর হয়ে এসব মানুষকে ইউরোপে পাঠানো হয়। ফলে লিবিয়া অবৈধ অভিবাসন যাত্রার অন্যতম প্রধান রুটে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের (বিএনএসকে) নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, ‘অবৈধ উপায়ে বিদেশযাত্রার মূল কারণ মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক সংকট। সচেতনতার অভাবও একটি বড় কারণ। অনেকেই অবৈধভাবে বিদেশে যাচ্ছেন এবং যে দেশে যাচ্ছেন, সেখানকার আইন-কানুন সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন না। ফলে অনেক বাংলাদেশিকে বিদেশের কারাগারে বন্দি জীবন কাটাতে হয়।’
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, ‘অবৈধ উপায় অবলম্বন, সচেতনতার অভাব, মানব পাচারকারীদের অধিক সক্রিয়তা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যথাযথ উদ্যোগ না থাকার কারণে বাংলাদেশিরা অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা করেন। এসব কারণেই তারা বিদেশের কারাগারে বন্দি থাকেন। অনেকে আবার নৌকাডুবিতে প্রাণ হারান। এ ছাড়া লিবিয়া এখনও একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্র এবং সেখানে শতভাগ কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। অথচ কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ লিবিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক করেছে, যা মানুষকে ভুল বার্তা দিচ্ছে।’
এফআর