ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নির্মম বাস্তবতা– হরিজন কলোনিগুলোর জীবনযাপন, যা এখনও মৌলিক মানবাধিকার থেকে বহু দূরে। এখানে অন্তত ৭৫ জন মানুষকে একটি বাথরুম ভাগাভাগি করতে হয়। সংকীর্ণ ঘর, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অপর্যাপ্ত পানি ও স্যানিটেশন– এসবই তাদের প্রতিদিনের সঙ্গী।
আবাসন সংকট, নিরাপত্তাহীনতা ও দীর্ঘদিনের সামাজিক বৈষম্যের জালে আটকে আছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। দুঃসহ এই বাস্তবতা এই নগরে যেন কুপির নিচের অন্ধকারটিকে মনে করিয়ে দেয়। এ যেন ন্যূনতম মানবিক মর্যাদার হাহাকার।
গাবতলী সুইপার কলোনির বাসিন্দা মোবারক হোসেনের কণ্ঠে সেই কষ্ট স্পষ্ট– ‘আমাদের ঘর থেকে বাথরুমে যেতে চার-পাঁচ মিনিট লাগে। ১৫টা ঘরের জন্য একটা বাথরুম। একেকটা ঘরে চার-পাঁচজন মানুষ, মোটামুটি ৭৫ জন মানুষ একটাই বাথরুম ব্যবহার করি।’
এটি শুধু সংখ্যা নয়, প্রতিদিনের সংগ্রামও। সকালে একটি বাথরুমের সামনে দীর্ঘ সারি, অসুস্থতা নিয়েও অপেক্ষা, শিশু ও নারীদের চরম ভোগান্তি– সব মিলিয়ে এক অমানবিক বাস্তবতা।
আবাসনের চিত্রও ভিন্ন নয়। ছোট ছোট কক্ষে গাদাগাদি করে বাস করতে হয় পরিবারগুলোকে। অনেক সময় পরিবারের সবাই একসঙ্গে ঘুমানোর মতো জায়গাও থাকে না। এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই বেড়ে উঠছে নতুন প্রজন্ম- যাদের শৈশবের সঙ্গী সংকীর্ণতা আর ছোট ছোট বঞ্চনা।
এই বাস্তবতা বদলাতে গাবতলী সুইপার কলোনিতে বহুতল আবাসন নির্মাণ করছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। ‘গাবতলী সিটি পল্লী আবাসন প্রকল্প’। এর আওতায় চারটি ১৫ তলা ভবনে ৭৮৪টি ফ্ল্যাট নির্মাণ শেষের পথে। প্রতি ফ্ল্যাটে দুটি বেডরুম, বারান্দা ও অগ্নিনির্বাপক সুবিধা রয়েছে।
ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, আগামী জুলাইয়ের শেষ বা আগস্টের শুরুতে ফ্ল্যাট হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বহু প্রতিশ্রুতি আর দীর্ঘসূত্রতায় ক্লান্ত মানুষরা এখন আর সহজে আশা রাখতে পারছেন না। কলোনির বাসিন্দা আনোয়ারের কথায় হতাশা স্পষ্ট– ‘চার বছরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। এখন ছয়-সাত বছর হয়ে গেল। আজ না কাল করতে করতে সময় যাচ্ছে, আর আমরা কষ্টেই আছি।’
শুধু বাসস্থান নয়, শিক্ষার পথও তাদের জন্য সহজ নয়। আশপাশে পর্যাপ্ত স্কুল না থাকায় শিশুদের যেতে হয় দূরে। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হওয়া তাদের নিয়তি। অভিভাবকদের মনে সারাক্ষণ ভয়– কী হয় কী হয়!
ঢাকার লালবাগ, বংশাল, নারিন্দা, গোপীবাগসহ বিভিন্ন এলাকার পুরোনো কলোনিগুলোতে বংশপরম্পরায় বাস করছে হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ। ২০২২ সালে পিপিআরসির এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৩৭টি জেলায় ৪৬টি কলোনিতে ৩৯ হাজারের বেশি হরিজন রয়েছে– যার বড় অংশ ঢাকায়। তাদের প্রায় অর্ধেক প্রাপ্তবয়স্ক নিরক্ষর, আর অধিকাংশ পরিবারের মাসিক আয় ১৫ হাজার টাকার নিচে।
অনেকেই সামাজিক বৈষম্যের কারণে নিজের পরিচয় গোপন রাখতে বাধ্য হন, যা এই বঞ্চনার গভীর ক্ষতটি আরও স্পষ্ট করে।
নারী পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অবস্থা আরও বেহাল। প্রতিদিন খালি হাতে ময়লা পরিষ্কার করতে গিয়ে নানা রোগে আক্রান্ত হন। তবু নেই প্রয়োজনী সুরক্ষা বা চিকিৎসার নিশ্চয়তা।
অনুরাধা দেবীর কণ্ঠে ক্ষোভ ও অসহায়তা– ‘আমাদের কোনো গ্লাভস বা মাস্ক দেওয়া হয় না। খালি হাতে কাজ করতে হয়। অসুখ লেগেই থাকে।’
নাইট শিফটে কাজ করা নাগমনি বলেন, ‘শেষ রাতে কাজ করতে হয়। রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকে। খুব ভয় লাগে, বিশেষ করে আমরা নারীরা আতঙ্কে থাকি।’
চাকরির ক্ষেত্রেও বৈষম্যের দেয়াল ভাঙতে পারেননি তারা। এক পরিচ্ছন্নতাকর্মীর আক্ষেপ– ‘আমাদের সন্তানরা পড়াশোনা করেও “সুইপারের ছেলে” পরিচয়ের কারণে ভালো চাকরি পায় না।’
হরিজন নেতারা বলছেন, এই সংকট কোনো একটি এলাকার নয়, সারা দেশেরই চিত্র। কোথাও ৩০-৪০টি পরিবারের জন্য একটি টয়লেট, কোথাও ৫০০ মানুষের জন্য মাত্র দুই-তিনটি।
বাংলাদেশ হরিজন যুব ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পংকজ বাসফোর বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা ভূমি ও আবাসন। কলোনির বাইরে বাসা পাওয়া যায় না। কম বেতন, নিরাপত্তাহীনতা আর সামাজিক বৈষম্য জীবনকে আরও ভারি করে তুলেছে।’
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন থেকে যায়– একবিংশ শতাব্দীর রাজধানীতে, মৌলিক মানবাধিকারের দুর্দশা কবে কাটবে? একদিকে এআই দৌড়ায়, অন্যদিকে ন্যূনতম মানবিক মর্যাদার হাহাকার– এই নগরকে কোথায় নিয়ে যাবে– প্রশ্নটাই শুধু করা যায়।
এফআর