ভঙ্গুর অর্থনীতি টেনে তোলার বাজেট আসছে

এসএম আলমগীর

জাতীয়

দেশে এখন নতুন সরকার। নতুন সরকারের নতুন বাজেট আসতে যাচ্ছে আগামী মাসের ১১ তারিখে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি

2026-05-03T01:04:30+00:00
2026-05-03T01:15:58+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
ভঙ্গুর অর্থনীতি টেনে তোলার বাজেট আসছে
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: রোববার, ৩ মে, ২০২৬, ১:০৪ এএম  আপডেট: ০৩.০৫.২০২৬ ১:১৫ এএম
ছবি : সংগৃহীত
দেশে এখন নতুন সরকার। নতুন সরকারের নতুন বাজেট আসতে যাচ্ছে আগামী মাসের ১১ তারিখে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে পথ চলতে হচ্ছে এখন। তাই দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি টেনে তোলার বাজেট দিতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। 

বিশেষ করে থমকে থাকা বিনিয়োগ বাড়ানো, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষায় অধিক গুরুত্ব দেওয়া, কল্যাণকর অর্থনীতির ভিত তৈরি করা, নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে জোর দেওয়া, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নীতি সহায়তা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনার ক্ষেত্রে জোর দেওয়া হচ্ছে আগামী বাজেটে। তা ছাড়া আগামী বাজেটে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। 

জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের সম্ভাব্য আকার হতে যাচ্ছে ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি। নতুন বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হচ্ছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এ ছাড়া আগামী বাজেটে এডিপির আকার ধরা হতে পারে ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা আর বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হতে পারে ২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা। 

আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। তা ছাড়া ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হবে আগামী বাজেটে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, যেহেতু অর্থনীতিতে এখন টানাপোড়েন চলছে তাই আগামী বাজেট হওয়া দরকার সাশ্রয়ীমূলক। 

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন সময়ের আলোকে বলেন, ‘আগামী বাজেটকে নিছক সরকারের এক বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে প্রণয়ন না করে ভঙ্গুর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার হাতিয়ার হিসেবে প্রণয়ন করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে নিজস্ব অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করা এবং সরকারের নীতিমালার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠায় বাজেটে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নীতিগত দিকনির্দেশনা থাকতে হবে। যেহেতু আমাদের সম্পদ সঞ্চালন কম, সে কারণে ব্যয় সাশ্রয়ী বাজেট হতে হবে। বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে প্রচুর পরিমাণে ঋণ নেয়, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বিশেষ করে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা। তাই বাজেটে ঘাটতি পূরণে আন্তর্জাতিক উৎসগুলোর প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।’ 

এর আগে সর্বশেষ ২০০৫-০৬ অর্থবছরের জন্য মাত্র ৬১ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছিলেন বিএনপি সরকারের সে সময়ের অর্থমন্ত্রী প্রয়াত এম সাইফুর রহমান। সে সময় দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল সাড়ে ৫০০ ডলারের কাছাকাছি। এর প্রায় ২০ বছর পর জাতীয় সংসদে বাজেট দিতে যাচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি ৬৮ লাখ ৩১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে অর্থ বিভাগ। বর্তমান খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা এবং ইরানে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের কারণে ইতিমধ্যে জ্বালানির সংকট হওয়ায় ফের মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে ১১টি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে আছে কল্যাণকর অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার পাশাপাশি উদ্যোক্তা তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। দেশীয় ও প্রবাসী শ্রমবাজারে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তোলা এবং তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন প্রণোদনা ও সহায়তা কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করা। বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নীতি-সহায়তা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনার পরিকল্পনা রয়েছে। 


সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নও এই বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন ও সম্প্রসারিত কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার রোডম্যাপও বাজেটে প্রতিফলিত হচ্ছে। এ লক্ষ্যে গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প বিকাশ এবং সৃজনশীল অর্থনীতিকে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। 

আগামী বাজেটে আর্থিক খাত পুনর্গঠন, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। গত মাসে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় প্রাক্কলিত বাজেট উপস্থাপন করা হয়। 

এতে বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটে নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কল্যাণমূলক কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, চলতি বছরের সংশোধিত বাজেটে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে আসবে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। 

আগামী অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৬ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা করা হতে পারে। যদিও সংশোধিত বাজেটে ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা জিডিপির ৩.৩ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল, দুর্বল রাজস্ব আদায় এবং ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে। আগামী অর্থবছরের ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হবে। এ ছাড়া সংশোধিত বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল।

বিএনপি সরকার তাদের প্রথম বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশ উন্নীতকরণ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে এনে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখাই মূল লক্ষ্য। 

অন্যদিকে, নির্বাচনি ইশতেহার পূরণে সরকারের চলতি মেয়াদের প্রথম বাজেটে শুধু ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড ও খালকাটা কর্মসূচিতে নতুন বরাদ্দ থাকবে। এর বাইরে ধাপে ধাপে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে সচিব কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হতে পারে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্প্রতি কয়েক দফায় জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকি দাবি করে অর্থ বিভাগে চিঠি দিয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রয়োজন হবে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। নতুন কর্মসূচি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ঘিরে প্রথম বছরেই ৪০ লাখ পরিবারকে লক্ষ্য করে ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কয়েক ধাপে এ কর্মসূচিতে ১ কোটি পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তাই এ খাতেই ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন। ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচিকে নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে। এ খাতে সম্ভাব্য বরাদ্দ ধরা হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা। ‘স্বাস্থ্য কার্ড’ চালুর মাধ্যমে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ থেকে কিছুটা মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ খাতে ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে। খালকাটা কর্মসূচি, কর্মসংস্থান ও পানি ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্য বরাদ্দ ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।

নবম বেতন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কাজ শুরু করলেও এ খাতে অতিরিক্ত ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে। তবে পুরোপুরি বাস্তবায়নে প্রয়োজন ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। ভর্তুকির জন্য চলতি সংশোধিত বাজেটে ৮৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল, কিন্তু চলমান সংকট মোকাবিলায় মন্ত্রণালয়গুলো এখন অতিরিক্ত বরাদ্দ চাইছে। ফলে ভর্তুকি ব্যয় ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও গতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাজেট প্রস্তাবে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ বিনিয়োগে আনার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে ২৪.৯ এবং সরকারি খাতে ৬.৫ শতাংশ বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। অর্থ বিভাগের মতে, এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারলে অর্থনীতিতে গতি ফিরবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং উৎপাদন ও রফতানি নতুন করে উজ্জীবিত হবে। 

উন্নয়ন ব্যয় ও এডিপি 
আগামী অর্থবছরের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ধরা হতে পারে প্রায় ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগব্যবস্থা, জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশ বরাদ্দ থাকতে পারে। তবে পরিকল্পনা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এবার প্রকল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কার্যকারিতা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ অতীতে অনেক বড় প্রকল্প অনুমোদিত হলেও বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায়নি।

ঘাটতি বাজেটে বাড়বে ঋণের চাপ
আগামী বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হতে পারে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে প্রধানত দুই উৎসের ওপর নির্ভর করা হতে পারে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মোট সংগ্রহ লক্ষ্য প্রায় ২ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। বৈদেশিক উৎস : সম্ভাব্য সংগ্রহ প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত : মানব সম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি
মানব সম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হলেও বাংলাদেশে এই দুই খাতে বরাদ্দ তুলনামূলক কম। বর্তমানে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির প্রায় ২ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশ, যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজন প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে এটি বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 অপরদিকে, স্বাস্থ্য খাতেও সরকারি ব্যয় কম হওয়ায় চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ জনগণকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় এই খাতে সরকারি বিনিয়োগ এখনও সীমিত। এ কারণে আগামী বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং ব্যয়ের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হতে পারে।

বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তারা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পর ইতিমধ্যে বাড়তি জ্বালানি ব্যয় মেটাতে সরকারের গাড়ি কেনা, বিদেশ ভ্রমণ নিষিদ্ধ করাসহ বেশকিছু খাতে ব্যয় সংকোচন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এর বাইরে রাজস্ব বাজেটে থাকা থোক বরাদ্দ এবং অন্যান্য খাতে বরাদ্দ থাকা অর্থ কাটছাঁট করে মার্চ-এপ্রিলসহ কয়েক মাসের বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়া গেলেও মাসের পর মাস সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে। এ অবস্থার মধ্যে আগামী অর্থবছরে বড় বাজেট প্রণয়ন করলেও রাজস্ব আহরণ করা সম্ভব হবে না। 

এদিকে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট হতে যাচ্ছে। এমন এক সময়ে এই বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে, যখন দেশের অর্থনীতি অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপের পাশাপাশি মধ্যমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের ভিত্তি শক্ত করা জরুরি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণের ধীরগতি, বাজেট বাস্তবায়নে দুর্বলতা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, নিম্ন বিনিয়োগ এবং সীমিত কর্মসংস্থানের মতো নানা সমস্যার সম্মুখীন। এর পাশাপাশি আর্থিক খাতের অস্থিরতা এবং রফতানি প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি অর্থনীতির জন্য অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে আগামী সময়ে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণের বিষয়টিও একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে রয়েছে। 

এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতসহ বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে এই পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব শৃঙ্খলা বজায় রাখা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   অর্থনীতি  বাজেট  সরকার  অর্থ  বছর 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: