ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সাংগঠনিক কাজে নজর দিয়েছে বিএনপি। এর অংশ হিসেবে সাংগঠনিক শক্তির মূল কেন্দ্রবিন্দু- ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ কমিটি ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। মূলত সংসদীয় দায়িত্ব এবং সরকারি পদের কারণে শীর্ষ নেতাদের ব্যস্ততা এবং দলের চেইন অব কমান্ডে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য। ঢাকা মহানগরের দুই ইউনিটেই নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের নানা তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, হাইকমান্ড চান নবীন ও প্রবীণ নেতাদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ও গতিশীল কমিটি গঠন করতে, যা আগামী দিনে যেকোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে। সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের বৈঠকের পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
সাংগঠনিক কাঠামো আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে মহানগর পর্যায়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের নির্দেশনা এসেছে। কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের আগেই এই কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজস্ব তদারকির মাধ্যমে নেতাদের সাংগঠনিক দক্ষতা ও বিগত দিনের আন্দোলনের ভূমিকা যাচাই করছেন।
দলের নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেছে, এবার কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ‘এক নেতার এক পদ’ নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হতে পারে। অর্থাৎ যারা সরকারে আছেন বা সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের মহানগরের নেতৃত্বে রাখা হবে না। এবারও নতুন ও পুরোনো নেতাদের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কমিটি গঠন করা হবে। যারা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন এবং তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে যাদের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তারাই শীর্ষ পদে অগ্রাধিকার পাবেন।
দলের পদপ্রত্যাশীরা মনে করছেন, বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- এই দুই কমিটিতে কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলা। যেখানে বিগত ১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রামে সম্পৃক্ত থাকা দক্ষ, পরিচ্ছন্ন ও জনগ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদেরই অগ্রাধিকার দিতে হবে। তা না হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে দলটিকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বর্তমানে ঢাকা মহানগর বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্ব সংসদীয় ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমিনুল হক বর্তমানে সরকারের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু ফেনী-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় ও সংসদীয় কাজের প্রবল ব্যস্ততার কারণে তারা দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না। ফলে তৃণমূলের কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা ও শৃঙ্খলার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতেই মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে নতুন নেতৃত্ব আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনে পুরোনো নেতাদেরও দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। কেননা অভিজ্ঞদের রয়েছে বিরাট কর্মীবাহিনী এবং সাংগঠনিক দক্ষতা। ফলে মহানগর বিএনপিকে আরও শক্তিশালী করতে নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে চাচ্ছেন বলে সূত্রের দাবি।
দুই মহানগরে আলোচনায় যারা : ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু আগের মতো মহানগরীর রাজনীতিতে সময় দিতে পারছেন না। যে কারণে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সম্ভাব্য নতুন কমিটির শীর্ষ পদের জন্য জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশার, বর্তমান সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন, সহ-সভাপতি লিটন মাহমুদ এবং যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেনের নাম।
ত্যাগী ও রাজপথের পরীক্ষিত নেতা হিসেবে তাদের নিয়ে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। এদের মধ্যে ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা, মহানগরের সাবেক জয়েন্ট সেক্রেটারি ও বর্তমানে জয়েন্ট কনভেনার মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেনের নাম আলোচনায় রয়েছে। তার কর্মী সমর্থকরা বলছেন, ফরহাদ হোসেন ঢাকা দক্ষিন বিএনপির রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। গত ১৭ বছর আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে মামলায় জর্জরিত হয়েছে। আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি ফেয়ার রাজনীতি করেন, অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের সাথে ভালো সমন্বয় রয়েছে। প্রচারেও এগিয়ে আছেন।
এ ছাড়া আলোচনায় রয়েছেন দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আ ন ম সাইফুল ইসলাম এবং দফতর সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা সাইদুর রহমান মিন্টু।
জানা গেছে, উল্লিখিত নেতাদের মধ্যে কাজী আবুল বাশার দীর্ঘদিন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব ছিলেন। তিনি সে সময় ফ্যাসিস্ট হাসিনাবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। হামলা-মামলার শিকার হয়েও রাজপথের আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তা ছাড়া প্রায় ১৮ বছর একাধারে তিনি সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর এবং অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ছিলেন।
পুরান ঢাকার স্থানীয় নেতা কাজী আবুল বাশারের রয়েছে বিশাল কর্মী বাহিনী। ঢাকা মহানগর দক্ষিণে বিএনপির সব ধরনের কর্মসূচি আয়োজনেও তার ভূমিকা অবিস্মরণীয়। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তাকে ঢাকা-৬ আসনে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি জোর আলোচনায় ছিল। কিন্তু শেষ অবধি তা হয়নি। ফলে তার অনুসারী নেতাকর্মীরা কাজী আবুল বাশারকে আবারও ঢাকা দক্ষিণের সভাপতি হিসেবে দেখতে চান।
অন্যদিকে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিতে আমিনুল হকের পাশাপাশি সম্ভাব্য নতুন কমিটির শীর্ষ পদের জন্য আলোচনায় রয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান সেগুন। সাবেক ছাত্রনেতা মোস্তাফিজুর রহমান সেগুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এফ রহমান হলের নির্বাচিত ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিগত ১৭ বছর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন রাজপথে সক্রিয়।
দলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এবার এবিএম আব্দুর রাজ্জাকের শীর্ষ পদে আসার সম্ভাবনা বেশি।
আরও আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত নেতা মামুন হাসান, মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এবিএম আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক কমিশনার আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার, কফিল উদ্দিন আহমেদ, বিগত দিনের আন্দোলনগুলোতে তাদের সক্রিয় ভূমিকা হাইকমান্ডের নজর কেড়েছে। আব্দুর রাজ্জাক দীর্ঘদিন আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
দলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এবার এবিএম আব্দুর রাজ্জাকের শীর্ষ পদে আসার সম্ভাবনা বেশি। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের একাধিক নেতাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যারা কঠিন সময়ে মাঠে ছিলেন, এখন তাদের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। বরং নতুন করে আসা বা বিতর্কিতদের কমিটিতে জায়গা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তাদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সংগঠন আরও দুর্বল হবে এবং সিটি নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
নতুন নেতৃত্ব গঠন ঘিরে তৃণমূল পর্যায়ে ‘ত্যাগী ও পরীক্ষিত’ নেতাদের মূল্যায়নের দাবি উঠেছে। আর ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন থানা বিএনপির আহ্বায়ক মনে করছেন, দলের দুর্দিনে যারা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, তাদেরই নতুন কমিটিতে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
এ বিষয়ে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সময়ের আলোকে বলেন, দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। আগে শুধু সাংগঠনিক কার্যক্রম চলত কিন্তু এখন বিএনপি সরকার গঠন করেছে। সুতরাং বিএনপির জনগণের প্রতি যে কমিটমেন্ট আছে সেটাও দেখতে হবে, বাস্তবায়ন করতে হবে। যারা সরকারে নেই তারা দলীয় কার্যক্রমগুলো দেখছেন।
তিনি বলেন, সারা দেশে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে, কোথাও সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছে। যেসব কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে সেগুলো এক এক করে দেওয়া হবে। সেখানে ত্যাগী ও পরীক্ষিতরা স্থান পাবেন।
সময়ের আলো/আআ