এশিয়া অঞ্চলে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্ধুপ্রতিম দেশ চীন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান আগামীকাল মঙ্গলবার দুদিনের সফরে দেশটিতে যাচ্ছেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর নতুন সরকারের ঢাকার পক্ষ থেকে এটি প্রথম বেইজিং সফর। দুই দেশই বিদ্যমান সম্পর্ক আরও নিবিড় করতে আগ্রহী। সফরে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে একটি পথনকশা তৈরি হতে পারে।
জানা গেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মঙ্গলবার দুপুরে বেইজিংয়ের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন। পরদিন বুধবার তিনি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতি দেওয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে। উন্নয়ন সহযোগিতা নিয়ে তিনি চীনের উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী জেং শানজির সঙ্গেও বৈঠক করবেন।
এ ছাড়া চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একাধিক নেতার সঙ্গে তার বৈঠকের কথা রয়েছে। সফরে উন্নয়ন, বাণিজ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, পূর্বাচলে চীনের সহযোগিতায় একটি বিশ্বমানের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, মোংলা বন্দর, পানি, রোহিঙ্গা ও ভূরাজনীতি ইস্যু গুরুত্ব পাবে।
ঢাকার কূটনীতিকরা বলছেন, চীন বাংলাদেশের পুরোনো বন্ধুপ্রতিম দেশ। শুরুতে সম্পর্ক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকলেও বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তা রাজনৈতিক পর্যায়েও উন্নীত হয়েছে। গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই পক্ষের ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে।
বর্তমানে উভয় পক্ষই সম্পর্ক আরও গভীর করতে চায়। এরই মধ্যে বাংলাদেশের নতুন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের চীন সফরের আমন্ত্রণ জানানো ও সফর আয়োজন সেই বার্তাই দিচ্ছে। বেইজিং চায়, উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তাদের পাশে থাকুক এবং চীনের উদ্যোগগুলোতে সমর্থন দিক।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ২০১৬ সালে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে (বিআরআই) যুক্ত হয়। চীন চায় বাংলাদেশ তাদের বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ (জিডিআই), বৈশ্বিক নিরাপত্তা উদ্যোগ (জিএসআই) ও বৈশ্বিক সভ্যতা উদ্যোগে (জিসিআই) যুক্ত হোক। তবে ঢাকা এখনই এসব উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব উদ্যোগের সঙ্গে ভূরাজনৈতিক বিষয় জড়িত থাকায় বাংলাদেশ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। এতে সুবিধার পাশাপাশি ঝুঁকিও রয়েছে- বিশেষ করে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
পানি ইস্যুতেও সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ রয়েছে। গত বছর এ বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে। এর আওতায় বন্যা প্রতিরোধ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নদী খনন, পানি সম্পদের বহুমুখী ব্যবহার ও প্রযুক্তি সহায়তায় সহযোগিতার কথা রয়েছে। এবারের সফরে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
বিশেষ করে নদী ও পানি ব্যবস্থাপনায় চীনের সহায়তায় ৫০ বছরের একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে। পাশাপাশি তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনঃসংস্কার প্রকল্পে চীনা কোম্পানির অংশগ্রহণ নিয়েও আলোচনা হবে। এ ছাড়া চীনা বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে শিল্প-কারখানা স্থানান্তরের বিষয়েও আলাপ হতে পারে।
ঢাকায় চীনা দূতাবাস জানিয়েছে, নতুন সরকারের সঙ্গে সবক্ষেত্রে সহযোগিতা এগিয়ে নিতে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন অধ্যায় সূচনায় চীন প্রস্তুত।
বেইজিংয়ের কূটনীতিকরা জানান, সাম্প্রতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। গত ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
বৈঠকে পানি সম্পদ খাতে সহযোগিতা এবং দ্বিপক্ষীয় বাস্তবমুখী সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়। উভয় পক্ষ জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি, চীনা ভাষা শিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়ে একমত হয়।
এর আগে ২৭ এপ্রিল রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন চতুর্থ বাংলাদেশ-চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ফোরামে অংশ নেন। তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে সহযোগিতা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, রফতানি সক্ষমতা ও টেকসই উন্নয়নে কৌশলগত ভূমিকা রাখবে। এ খাতে নীতি সমন্বয়, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়াতে চীন প্রস্তুত।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের একটি প্রতিনিধি দল চীন সফর করে। তাই আসন্ন সফর দুই দেশের রাজনৈতিক যোগাযোগ জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে গত এপ্রিলে ভারত সফরের সময় বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, ভারত বা চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক জিরো- সাম গেম নয়। কোনো উদ্বেগ থাকলে আমাদের ভারতীয় বন্ধুরা তা স্পষ্টভাবে জানাতে পারে। অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভারতের ক্ষতির বিনিময়ে নয়। আমরা চীনের সঙ্গে ফলপ্রসূ সহযোগিতা করি এবং ভারতের সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রাখি।