আর্থিক চাপ স্বাধীনতার বাধা

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

বর্তমান সংকট উত্তরণে গণমাধ্যমের টেকসই অর্থনৈতিক মডেল প্রণয়ন জরুরি বলে মত দিয়েছেন বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন আলোচনায়

2026-05-04T04:37:46+00:00
2026-05-04T04:37:46+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
আর্থিক চাপ স্বাধীনতার বাধা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ৪ মে, ২০২৬, ৪:৩৭ এএম 
প্রতীকী ছবি
বর্তমান সংকট উত্তরণে গণমাধ্যমের টেকসই অর্থনৈতিক মডেল প্রণয়ন জরুরি বলে মত দিয়েছেন বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন আলোচনায় বক্তারা। 

তাদের মতে, সরকার বা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আর্থিক সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়লে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই আর্থিকভাবে স্বনির্ভর ও টেকসই মডেল গড়ে তোলার বিকল্প নেই। 

একই সঙ্গে পজিশন ধরে রাখতে গিয়ে মালিকদের সঙ্গে আপস করা সম্পাদকদেরও পেশাগত দায়িত্বের জায়গা থেকে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা। তা না হলে গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে পড়বে বলেও সতর্ক করেন তারা।

রোববার বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পৃথক কর্মসূচি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। 

এদিন সম্পাদক পরিষদ ও নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) যৌথভাবে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করে। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গঠন : মানবাধিকার, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রসার’।

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, অবশ্যই একটি গণমাধ্যম কমিশন দরকার। সরকার এখানে একটি পক্ষ হিসেবে কাজ করে। ফলে গণমাধ্যম খাতের জবাবদিহি, নীতিনির্ধারণ ও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য কমিশন থাকা জরুরি। 

তিনি বলেন, বিনা অপরাধে কোনো সাংবাদিক কারাগারে থাকবে না। নীতিগতভাবে সব সাংবাদিককে আইনের আওতায় এনে তাদের পেশাগত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে সরকার।

মন্ত্রী আরও বলেন, আধুনিক বিশ্বে অনেক দেশই গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও নীতিগত দিকনির্দেশনার জন্য স্বাধীন কর্তৃপক্ষ বা কমিশন গঠন করেছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রথম ধাপে একটি পরামর্শ কমিটি গঠন করা হবে, যেখানে সাংবাদিক, সম্পাদক, মালিক ও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।

তিনি বলেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তার এবং প্রচলিত গণমাধ্যমের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি সমন্বিত কাঠামো প্রয়োজন। প্রস্তাবিত কমিশন এই দুই ক্ষেত্রেই নীতিগত দিকনির্দেশনা দিতে সক্ষম হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী বলেন, এই খাতে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা মূলত বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানির হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর সমাধান খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে এসব প্ল্যাটফর্মকে কীভাবে দায়বদ্ধতার আওতায় আনা যায়, তা নিয়ে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।

গণমাধ্যম খাতের অভ্যন্তরীণ কিছু কাঠামোগত সমস্যার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। টেলিভিশনের টার্গেট রেটিং পয়েন্ট (টিআরপি) ও পত্রিকার প্রচারসংখ্যা নির্ধারণ পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সীমিত কিছু সূচকের ওপর ভিত্তি করে জাতীয় মানদণ্ড নির্ধারণ করা বাস্তবসম্মত নয়। 

গণমাধ্যমকে শুধু ব্যবসা হিসেবে না দেখে সমাজ গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে নীতিগত সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও সরকার ভাবছে। তিনি গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের গঠনমূলক মতামত ও সমালোচনা সরাসরি সরকারের কাছে তুলে ধরার আহ্বান জানান।

সভায় সভাপতিত্ব করেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর। সঞ্চালনা করেন সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। 

আলোচনায় আরও অংশ নেন নোয়াব সভাপতি ও মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ, প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, কালের কণ্ঠ সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাব সভাপতি হাসান হাফিজ, ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী, সময়ের আলোর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, দৈনিক সংবাদের নির্বাহী সম্পাদক শাহরিয়ার করিম এবং ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ।

এদিকে রাজধানীর তথ্য ভবন মিলনায়তনে পৃথক এক আলোচনা সভায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ও বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালন করে। সেখানে সভাপতির বক্তব্যে মন্ত্রী পুনরায় বলেন, গণমাধ্যম একটি জটিল ও বিস্তৃত ইকোসিস্টেম, তাই সরকার এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায় না।

তিনি আবারও উল্লেখ করেন, বিনা অপরাধে কোনো সাংবাদিক কারাগারে থাকবে না। নীতিগতভাবে সব সাংবাদিককে আইনের আওতায় এনে তাদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে মানহানি মামলা ও অন্যান্য আইনি জটিলতা প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আব্দুল হাকিম আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম শামীম রেজা। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. শাহ আলম। পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।

এ ছাড়া ইউনেস্কো ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) যৌথভাবে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আরেকটি আলোচনা সভার আয়োজন করে। সেখানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, ভুয়া তথ্য এবং সুশাসনের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। সভাটি সঞ্চালনা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।

উদ্বোধনী বক্তব্য দেন ইউনেস্কোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুজান ভাইজ। আলোচনায় অংশ নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাওয়ার পেছনে স্বাধীনতার ঘাটতি ও অর্থনৈতিক চাপ বড় কারণ। মালিকানার প্রভাব ও করপোরেট স্বার্থের কারণে অনেক ক্ষেত্রে সম্পাদকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও অনেক গণমাধ্যম নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে পারে না। তার মতে, আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা টেকসই হবে না।

আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান গণমাধ্যমকে সরকারের যৌক্তিক সমালোচনা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত গণমাধ্যম অপরিহার্য।

তিনি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ও ফটোকার্ডের মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানোর প্রবণতা উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। একটি মূলধারার গণমাধ্যম ভুলভাবে তার বক্তব্য উপস্থাপন করেছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন এবং এ ধরনের মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সঙ্গে দ্রুত বৈঠক করে বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ গ্রহণের আশ্বাস দেন তিনি। একই সঙ্গে ৫ আগস্টের পর আটক সাংবাদিকদের মুক্তির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান উপদেষ্টা।

সভায় নারীর প্রতি সাইবার সহিংসতা প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিশেষ সেল গঠনের সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম বিটিভির আর্থিক কাঠামো পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

বক্তারা সামগ্রিকভাবে বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক টেকসইতা এবং নীতিগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারলেই একটি কার্যকর ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

/এসএকে


  বিষয়:   আর্থিক চাপ  স্বাধীনতা  বাধা  বিশ্ব  মুক্ত গণমাধ্যম  দিবস 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: