জাতীয় রাজনীতিতে সংস্কারের প্রশ্নে ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নিয়ে নতুন করে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, নোট অব ডিসেন্টের আলোকে যদি রাষ্ট্রীয় সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তবে জাতীয় ঐকমত্য বলে কিছু থাকবে না। এতে শুধু জুলাই সনদের প্রাসঙ্গিকতাই হারাবে না, বরং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্ন আবারও হোঁচট খাবে।
রোববার (৩ মে) রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে জাতীয় নাগরিক পার্টি আয়োজিত ‘জ্বালানি, অর্থনীতি, মানবাধিকার, সংস্কার ও গণভোট’ শীর্ষক এক জাতীয় কনভেনশনে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। কনভেনশনে দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
বক্তব্যের শুরুতেই নাহিদ ইসলাম দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি নাতিদীর্ঘ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘যে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্য আমরা গত ১৬ বছর লড়াই করেছি, এমনকি স্বাধীনতার পর থেকে বিগত ৫৫ বছর লড়াই অব্যাহত রয়েছে, সেই স্বপ্ন বারবার থমকে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধে মানুষ জীবন দিয়েছিল একটি সুন্দর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানেও মানুষ রক্ত দিয়েছে একই প্রত্যাশায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে নানান শক্তির বাধায় আমরা বারবার হোঁচট খাচ্ছি।’ তিনি অভিযোগ করেন, পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্রের কবর রচনা করে বাকশাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, যা ছিল ফ্যাসিবাদের প্রাথমিক রূপ। বিগত ১৬ বছরও দেশ একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। বর্তমানে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি জনগণের সেই স্বপ্নের সাথে প্রতারণা করছে বলে তিনি দাবি করেন।
নাহিদ ইসলাম সংস্কারের আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘বিএনপি যে প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সংস্কার আনতে চাচ্ছে, তা টেকসই হবে না। আজ তারা ক্ষমতায় আছে, কিন্তু চিরকাল কেউ ক্ষমতায় থাকে না। সংসদের সাধারণ সংশোধনীর মাধ্যমে আনীত পরিবর্তনগুলো যেকোনো সময় আদালত বা পরবর্তী সরকার বাতিল করে দিতে পারে।’ তিনি মনে করেন, ৭২-এর সংবিধানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার দোহাই দিয়ে প্রকারান্তরে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন এবং তাদের রাজনীতি ফিরিয়ে আনার পথ উন্মুক্ত রাখা হচ্ছে। বিএনপি বুঝে হোক বা না বুঝে হোক- এই কাজটিই করছে।
সংস্কারের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, সংবিধানে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ তৈরির জন্য একটি উচ্চকক্ষ অপরিহার্য। যাতে কোনো সরকার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংবিধানকে ইচ্ছামতো কাটছাঁট করতে না পারে। তিনি স্পষ্ট করেন, এই উচ্চকক্ষ হওয়া উচিত ভোটের আনুপাতিক হারে, শুধু আসন ভিত্তিক নয়। এছাড়া সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় নিয়োগ বন্ধ, নির্বাচন কমিশন, পিএসসি ও দুদককে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ করার ওপর তিনি জোর দেন।
প্রথম সংসদ অধিবেশন নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সরকার ইতোমধ্যেই প্রথম অধিবেশনকে ব্যর্থ করেছে। যদি সরকার নিজেদের ভুল বুঝতে না পারে এবং গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে উদ্যোগী না হয়, তবে এই লড়াই আবারও রাজপথে গড়াবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার স্বার্থে আমরা এগিয়ে যেতে চাই। কিন্তু যদি তা না হয়, তবে যারা সংস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছে তারা বসে থাকবে না।’
অনুষ্ঠানে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবের সঞ্চালনায় কনভেনশনে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক ও এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুসহ অন্যান্যরা বক্তব্য রাখেন।
/কহু