আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে মাঠ গোছাতে শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। বাম দলগুলোও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ও অনুকূল পরিবেশ থাকলে বাম দলগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ নির্বাচনে অংশ নিতে চায় তারা। বাম দলগুলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ের সুযোগ, তৃণমূলের সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক যোগাযোগ তৈরির ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও বাম দলগুলো রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ দেখছে। তবে অতীতের নির্বাচনি অভিজ্ঞতার কারণে সরাসরি অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নির্বাচনি পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করতে চায় দলগুলো। নির্বাচনের মাঠ যদি সবার জন্য সমান থাকে এবং অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়, তা হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেবে বামপন্থিরা।
ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন— ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের জন্য বিধিমালা ও আচরণবিধি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে।
বাম দলগুলোর নেতারা বলছেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নে আমরা একমত। তবে নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সবার জন্য সমান রাজনৈতিক ও নির্বাচনি সুযোগ, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হবে।
বাম দলগুলোর প্রার্থীরা দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং স্থানীয় সংগঠনের ওপর নির্ভর করবেন। বিশেষ করে ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ে বাম দলগুলোর দীর্ঘদিনের কৃষক, শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা ভোটে রূপান্তর করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
যদিও নির্বাচনের গ্রহণযোগ্য পরিবেশকে অংশগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে বাম দলগুলোর নেতারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে বাস্তব পরিস্থিতি দেখতে চাইছেন। অবশ্য ইসি বলছে, এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে দলীয় প্রতীক ছাড়া। অর্থাৎ প্রার্থীরা দলীয় মনোনয়ন বা দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করবেন না। জুনে প্রকাশিত খসড়া বিধিমালায় যোগ্যতা পূরণকারী যেকোনো ব্যক্তিকে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
তারা বলেন, দলীয় প্রতীক না থাকায় স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক সক্ষমতার ভূমিকা বাড়বে। একই সঙ্গে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কতটা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা প্রচারের সমান সুযোগ পাচ্ছেন কি না এবং ভোটাররা ভয়ভীতি ছাড়া কেন্দ্রে যেতে পারছেন কি না— এসব বিষয় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে। ইসির বিধান গুরুত্বপূর্ণ হলেও কাগজে-কলমে কঠোর বিধান থাকলেই হবে, নাকি মাঠেও সমানভাবে প্রয়োগ হবে?
যদিও প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছিলেন, কমিশন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু স্থানীয় সরকার নির্বাচন করতে চায় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা ছাড়া নির্বাচন আয়োজন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আমরা জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখি। তবে শুধু তফসিল ঘোষণা করলেই হবে না, নির্বাচনের মাঠে সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হলে এবং ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারলে আমরা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করব।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল— বাসদের উপদেষ্টা খালেকুজ্জামান বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জনগণের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এই নির্বাচনকে কোনোভাবেই প্রভাব মুক্তির বাইরে রাখা যাবে না। আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণের পক্ষে, কিন্তু তার জন্য গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকতে হবে। ভোটার যেন স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন, প্রার্থী যেন ভয়ভীতি ছাড়া প্রচার করতে পারেন এবং প্রশাসন যেন কারও পক্ষে না দাঁড়ায়— এগুলো নিশ্চিত করতে হবে। এসব বিষয় নিশ্চিত হলে বাম দলগুলো নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু বলেন, আমাদের কাছে নির্বাচন মানে শুধু ভোটের দিন নয়। পুরো নির্বাচনি প্রক্রিয়াই গুরুত্বপূর্ণ। মনোনয়ন থেকে প্রচার, ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ থেকে ফলাফল ঘোষণা— প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে দেখাতে হবে যে তারা কোনো রাজনৈতিক পক্ষের প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করতে সক্ষম। অতীতের অভিজ্ঞতায় আমাদের যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, সেটি মাঠ পর্যায়ে নিরপেক্ষতা দেখিয়েই কাটাতে হবে। তবে আমরা অবশ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেব। এ জন্য স্থানীয় পর্যায়ে নেতাকর্মীরা কাজ করছে।
বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, আমরা নির্বাচন থেকে দূরে থাকতে চাই না। কিন্তু নির্বাচনকে যদি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করা হয়, তা হলে অংশগ্রহণ করে কোনো লাভ নেই। স্থানীয় নির্বাচনে অর্থবল, পেশিশক্তি ও প্রশাসনিক প্রভাব যাতে কোনো প্রার্থী ব্যবহার করতে না পারে, সেটি নির্বাচন কমিশনকে নিশ্চিত করতে হবে। কমিশন যদি মাঠে তার স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে পারে, তা হলে বাম দলগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে