রাজধানী ঢাকার অন্যতম প্রাচীন বিনোদনকেন্দ্র শহিদ জিয়া শিশুপার্ক। এটি আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়ার সাত বছর পার হলেও প্রকল্পের অগ্রগতি আশানুরূপ নয়। প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে গণপূর্ত অধিদফতর। এ তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। দরপত্র জট, জমি দখল ও প্রশাসনিক ধীরগতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে এই কাজে। ফলে ২০১৯ সাল থেকে বন্ধ থাকা পার্কটি এখনও শিশু-কিশোরদের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
একসময় ঈদ বা ছুটিতে শাহবাগ এলাকা শিশু-কিশোরদের কোলাহলে মুখর থাকত। এখন আধুনিকায়নের নামে সাত বছর ধরে এই বিনোদন থেকে বঞ্চিত তারা। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রকল্পের কাজ কার্যত থমকে যায়। প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনের উদ্যোগও বন্ধ হয়ে পড়ে। বর্তমানে ২০২৭ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্প হস্তান্তরের সময়সীমা নির্ধারণ হলেও, এটি সম্ভব হবে কি না এই নিয়ে সংশয়ে রয়েছে ডিএসসিসি।
ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় শিশুপার্ক আধুনিকায়নের প্রস্তাব দেয়। ‘স্বাধীনতাস্তম্ভ নির্মাণ (তৃতীয় পর্যায়)’ প্রকল্পের আওতায় পার্ক সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য ৭৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব ছিল। এতে ভূগর্ভস্থ গাড়ি পার্কিং, জলাধার, আন্ডারপাস, হাঁটার পথ ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের পরিকল্পনা হয়। তবে বরাদ্দ কম বলে তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন প্রস্তাবটি নাকচ করেন। পরে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে পার্কটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
২০২০ সালের মে মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস নতুন করে ৬০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেন। ২০২৩ সালের আগস্টে একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। এতে ৪৮৩ কোটি টাকা সরকার (অর্ধেক অনুদান, অর্ধেক ঋণ) এবং ১২০ কোটি টাকার ব্যয় ডিএসসিসি বহন করবে। প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল ইউরোপীয় মানের আধুনিক রাইড ও অবকাঠামোর মাধ্যমে পার্কটি নতুনভাবে গড়ে তোলা।
প্রকল্পব্যয়ের বড় অংশ ৪৪১ কোটি টাকা ধরা হয় ১৫টি আধুনিক রাইড কেনায়। তবে দরপত্রের আগেই এসব রাইডের মূল্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একনেকের কারিগরি ও মূল্য যাচাই কমিটি পর্যালোচনা শেষে প্রকল্প অনুমোদন দেয়। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আগে মেয়র তাপস দেশ ত্যাগ করলে রাইড কেনাসহয় প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ডিএসসিসি প্রকল্পটি পুনর্মূল্যায়ন করে।
বর্তমানে প্রকল্পের প্রায় ৪৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএসসিসি। তবে গণপূর্ত অধিদফতরের সব জমি বুঝে না পাওয়ায় কিছু অংশে কাজ শুরু করা যায়নি। বিশেষ করে শাহবাগ মোড়সংলগ্ন ফুল মার্কেট, পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের ডাম্পিং স্পট এবং কিছু স্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে। এ ছাড়া পরিত্যক্ত ভবন ও দখল করা এলাকাও কাজের গতি কমিয়ে দিয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় অবকাঠামোগত কাজের মধ্যে ড্রেনেজ ৫০ শতাংশ, সীমানা প্রাচীর ও ওয়াকওয়ে ৪৫ শতাংশ, ফোয়ারা ও পানিপ্রবাহ ৪০ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা ১৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। বহিরাঙ্গন বিদ্যুৎ সংযোগের টেন্ডার তিনবার ব্যর্থ হয়ে চতুর্থবার আহ্বান করা হয়েছে। নতুন পরিকল্পনায় পার্কে যুক্ত হবে ১৫টি আধুনিক রাইড। এতে একসঙ্গে প্রায় ৬০০ শিশু বিনোদন উপভোগ করতে পারবে। আগে ১১টি রাইড ছিল। নতুন করে যুক্ত হচ্ছে ডিস্ক ও মেগা-৪০, সুপার এয়ার রেস, টি কাপ-৯, ফ্লাইং ক্যারোসেল, এনডেভার, গ্যালিয়ন, ১২ডি থিয়েটার, মাইন কোস্টার, ক্লাইম্বিং কার, বাম্পার কার, ম্যাজিক বাইকস, ট্রাম্পোলিন বেড, সুপার হ্যাপি সুইং, মেরি-গো-রাউন্ড ও ওয়াটার ম্যানিয়া। পাশাপাশি থাকবে দুটি ফ্রি রাইড এবং ৭০০-৮০০ আসনের বসার ব্যবস্থা।
রাইডগুলোর কারিগরি অনুমোদন ও দর পুনর্মূল্যায়নের জন্য বুয়েট, ডুয়েট, এমআইএসটি, আহ্ছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং আইইউটির মতামত চাওয়া হয়েছে। মতামত পাওয়ার পর দরপত্র আহ্বান করা হবে।
ডিএসসিসির যান্ত্রিক বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, প্রকল্পের অগ্রগতি ধীর হলেও কাজ চলমান। আগামী জুনে রাইডের দরপত্র আহ্বান করা হবে। টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষে রাইড স্থাপনে আরও ৮ থেকে ১০ মাস সময় লাগতে পারে। আশা করছি, ২০২৭ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্প শেষ করে পার্কটি শিশুদের জন্য উন্মুক্ত করা যাবে।
উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে ১৫ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত পার্কটি ১৯৮৩ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সময়ের সঙ্গে এর নাম একাধিকবার পরিবর্তন হলেও বর্তমানে এটি ‘শহিদ জিয়া শিশুপার্ক’ নামেই পুনঃনিশ্চিত হয়েছে।