নতুন সরকারের কাছে জনগণের চাওয়া ছিল— নিরাপত্তা, সুশাসন ও উন্নয়ন। এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এপ্রিল মাসের প্রথম ১৫ দিনে ঢাকায় অন্তত ১৬টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। গত জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসে রাজধানী ঢাকায় ১০৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে মার্চে ৩৩টি হত্যাকাণ্ড হয়। এছাড়া ফেব্রুয়ারিতে ৩৮ এবং জানুয়ারিতে খুনের ঘটনা ঘটে ৩৬টি।
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সারা দেশে ৮৫৪টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। আর ফেব্রুয়ারিতে ২৫০ ও মার্চে খুন হয় ৩১৭টি। চলতি মাসেও দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে।
দেশে এখন নির্বাচিত সরকার। সম্প্রতি সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হলো। কিন্তু জনগণ কি তাদের নাগরিক নিরাপত্তা পেল? অধিবেশনেই বা কতটুকু আলোচনা হয়েছে এসব বিষয়ে?
গত বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল শেষ হলো বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। সরকারি ও বিরোধী দলের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিতর্কের ২৫ দিনের এ অধিবেশন বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জনগণও সংসদের বাইরে থেকে আগ্রহ নিয়ে আলোচনায়-সমালোচনায় যেন অধিবেশনের অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এ বেলায় প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, এ অধিবেশনের জনগণের চাওয়া-পাওয়ার অঙ্ক কতটা মিলল?
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় দুই বছর পর বসা এই সংসদকে নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। অধিবেশনের প্রতিটি বিল, বক্তব্য আর সিদ্ধান্ত নিয়ে সংসদের বাইরেও ছিল বাড়তি আগ্রহ। রাষ্ট্রপতির ভাষণ, ওয়াকআউট, মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই সনদসহ নানা ইস্যুতে সরকারি ও বিরোধী দলের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিতর্কের পাশাপাশি স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের নানা বক্তব্যও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু সংসদ সদস্যদের বক্তব্যে কতটা অংশ জুড়ে জনগণের কথা উঠে এসেছে?
সাধারণ মানুষ বলছেন, তাদের প্রয়োজন নিরাপত্তা, সুশাসন ও উন্নয়ন। অথচ প্রথম অধিবেশন পর্যালোচনা করলে দেখা যাচ্ছে, এ বিষয়গুলোই যেন আড়ালে থেকে গেছে। মোটাদাগে আলোয় এসেছে আটটি বিষয়।
অধিবেশনের প্রথম দিনেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়। বিরোধী দলের সদস্যরা এ নিয়ে ওয়াকআউট করেন, আর সরকারি দল এটিকে সাংবিধানিক ও নৈতিক ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছে। বিতর্ক জুলাই সনদ নিয়েও।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম 'জুলাই সনদ'। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংসদে তীব্র বিতর্ক ও হট্টগোল হতেও দেখা গেছে।
একদিকে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলন কুক্ষিগত করার অভিযোগ তুলেছেন সরকারি দলের একাধিক সদস্য। অন্যদিকে বিরোধী দলের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘যেটা আপনারা স্বাক্ষর করেছেন। আমরাও করেছি। আসুন, সেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করি।’
সংসদে সরকারি দলের সংসদ সদস্য এম মঞ্জুরুল করিম রনির জুলাই সনদ নিয়ে দেওয়া একটি বক্তব্য নিয়ে সংসদে হট্টগোল হতেও দেখা গেছে।
‘সংসদের প্রথম দিন থেকেই আননেসেসারি (অপ্রয়োজনীয়) একটি জুলাই সনদ নিয়ে বিতর্ক শুরু করেছে,’ সাংসদ রনির এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা।
অবশ্য সংসদে দেওয়া বক্তব্যে জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সেজন্য সর্বদলীয় কমিটি গঠন করার কথাও জানান তিনি।
এছাড়া অধিবেশনের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, 'ইতিহাসের মধ্যে সবচেয়ে সফল অধিবেশন ছিল এই অধিবেশন। দীর্ঘ ১৭ বছর পরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত এই পার্লামেন্ট। এই পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশন ছিল সবচাইতে লাইভলি, ভাইব্রেন্ট। এই পার্লামেন্টের কন্ট্রিবিউশন ছিল ইতিহাসের মধ্যে সবচাইতে বেশি। সবচাইতে বেশি আইন প্রণয়ন হয়েছে এই পার্লামেন্টে।'
এদিকে, শুরুর দিন থেকেই সংবিধান সংশোধন পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার বিষয়েও মুখোমুখি অবস্থানে ছিলেন সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিরোধী দল ও সরকারি দলের মধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে ঐকমত্যের অভাব আরও স্পষ্ট হয়েছে।
এছাড়া সরকারি অংশে বৈঠকে বিভিন্ন বিল পাসের মাধ্যমে আইন-প্রণয়ন কার্যক্রমে জোর দেওয়া হয়েছে এবং প্রশ্নোত্তর পর্বেও সরকারি মন্ত্রীরা বেশ কিছু জবাব দিয়েছেন। কিন্তু বিরোধীরা দাবি করেছেন, নিরাপত্তা ও দুর্নীতিসহ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অনুভূত সমস্যাগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক যুদ্ধপরিস্থিতির নানামুখি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশে। সংসদে যখন অধিবেশন চলছিল তখন বাইরে থাকা জনজীবন তীব্র জ্বালানি সংকটে নাজেহাল, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকায় গুরুত্বপূর্ণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছিল নাগরিকদের। এছাড়া বাসা-বাড়ির জ্বালানি গ্যাস সংকটও সমান তালে চলছে। সরকারি লাইনের গ্যাসের স্বল্পতায় নাগরিকরা ছুটে যায় এলপিজির দিকে। সেখানেই বড় ধাক্কা, উচ্চ মূল্যেও পাওয়া যাচ্ছিল না গ্যাস সিলিন্ডার। সিলিন্ডারের দাম বৃদ্ধির তালিকার দিকে তাকালে দেখা যাবে মানুষের ভোগান্তির পারদ কোন চূড়ায় উঠে গেছে। গত বছরের নভেম্বরে ১২ কেজি এলপিজির দাম ছিল ১২১৫ টাকা, চলতি মে মাসে সে সিলিন্ডারের দাম ১৯৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে প্রথম অধিবেশন যতই ‘লাইভলি, ভাইব্রেন্ট’ হোক না কেন, যুক্তি-তর্কের বেড়াজালে জনগণের এ ভোগান্তির কথা ব্যাপকভাবে প্রাধান্য পায়নি।
একাধিক সংবাদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সংসদের আলোচনায় মূলত রাজনৈতিক ইস্যু ও ঐতিহাসিক বিবৃতি নিয়ে বিতর্ক বেশি দেখা গেছে—যেমন রাষ্ট্রপতির ভাষণ, মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই ঘোষণাপত্র সংক্রান্ত দাবি। কিন্তু সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়ে সরাসরি ও ধারাবাহিক প্রস্তাব বা কার্যকর উদ্যোগের অভাব ছিল বলে মত প্রকাশ করেছেন কিছু বিশ্লেষক।
সংসদ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন এমন একজন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধির মন্তব্য, ‘দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় সংসদ প্রথম অধিবেশন থেকে জাতির অনেক আকাঙ্ক্ষা ছিল।'
'প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে সংসদ থেকে আগামী এবং বর্তমান নাগরিকদের সমস্যা নিয়ে কার্যকর আলোচনার চেয়ে গণভোট জুলাই সনদ আর ২৪ আন্দোলন বিষয়ে বেশি জোরালো ছিল।'
তিনি আরও বলেন, 'তবে সংসদ নেতা ও বিএনপি মহাসচিবের সমাপনী বক্তব্য সব বিষয় উঠে এসেছে যা আগামী সময়ের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে নাগরিকগণ আশা করেন।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকারি ও বিরোধী দল উভয়ের বক্তব্যে দেশ ও রাজনীতিতে কিছু পরবর্তী পদক্ষেপের ইঙ্গিত পাওয়া যায়—যেমন বিরোধী পক্ষ জবাবদিহির পরিবেশ তৈরিতে চাপ দিচ্ছে এবং সরকারি দলের পক্ষ থেকে কমিটি গঠন করে সহযোগিতা তুলে ধরা হয়েছে—যা একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুল আলম বলছেন, ‘সংসদে সরকারি দল এবং বিরোধী দলের মধ্যে নানা বিষয়ে বিতর্ক হবে, এটাই স্বাভাবিক কিন্তু তা যেন অর্থবহ হয়।’
তবে সাধারণ নাগরিকদের প্রশ্ন—এ অধিবেশন কি অর্থবহ হয়েছে, অর্থাৎ নিরাপত্তা, সুশাসন এবং উন্নয়নসহ জীবনযাত্রার মৌলিক দাবিগুলোতে বাস্তবধর্মী অগ্রগতি পেয়েছে? অনেকেই মনে করছেন, এসব বিষয় সরাসরি আলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি এবং মুখ্য রাজনৈতিক ইস্যুর বাইরে বাস্তব সমস্যা নিয়ে সংসদীয় সমাধানের প্রস্তাব সীমিত ছিল।
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন কিছু তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে শেষ হলেও, অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ও জনগণের মৌলিক দাবির বাস্তবায়নের জন্য প্রথম ধাপ মাত্র। নাগরিকরা নিরাপত্তা, সুশাসন, আর্থ-সামাজিক সুযোগ চাইছেন; এবং এর উত্তর পেতে হলে সংসদের কার্যক্রমকে আরও বাস্তবসম্মত, সমন্বিত ও জনমুখী করতে হবে।
অধিবেশনের শেষ পর্যায়ে স্পিকারও মনে করিয়ে দিয়েছেন— সংসদ যেন মানুষের প্রত্যাশাকে কেন্দ্র করে কাজ করে, সে দিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২৫ দিনের এই অধিবেশনে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপিত হয়েছে। যার বিপরীতে ৯১টি বিল পাস হয়। শেষ দিনের দুটি বিলসহ সর্বমোট ৯৪টি বিল পাসের মাধ্যমে অধিবেশন শেষ হয়েছে।
সংবাদ সংস্থা বাসসের তথ্য অনুসারে, এই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে ৯৩টি প্রশ্নের নোটিশ জমা পড়ে, যার মধ্যে তিনি ৩৫টির উত্তর দিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের জন্য জমা পড়া দুই হাজার ৫০৯টি প্রশ্নের মধ্যে এক হাজার ৭৭৮টির উত্তর দেওয়া হয়েছে।
জেডও/এমকে