অসম মার্কিন চুক্তি, বাতিল কতটা সম্ভব?

এসএম আলমগীর

জাতীয়

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক যে শুধু অর্থনৈতিক বিনিময়ের বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, কূটনীতি ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিনির্ধারণের গভীর সমীকরণ- সেই বাস্তবতাই

2026-05-06T01:30:06+00:00
2026-05-06T03:47:38+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
অসম মার্কিন চুক্তি, বাতিল কতটা সম্ভব?
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ১:৩০ এএম  আপডেট: ০৬.০৫.২০২৬ ৩:৪৭ এএম
প্রতীকী ছবি
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক যে শুধু অর্থনৈতিক বিনিময়ের বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, কূটনীতি ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিনির্ধারণের গভীর সমীকরণ- সেই বাস্তবতাই আবারও সামনে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাণিজ্যচুক্তিকে ঘিরে।

গত ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি নিয়ে এখন দেশজুড়ে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। শুরুতে শর্তাবলি গোপন থাকলেও সম্প্রতি তা প্রকাশ্যে আসার পর অর্থনীতিবিদ, রফতানিকারক ও নীতিনির্ধারক মহলে উদ্বেগ ও সমালোচনার সুর আরও জোরালো হয়েছে। কারও মতে, এটি একটি অসম ও একপক্ষীয় চুক্তি।

বিগত সরকার তাড়াহুড়ো করে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে তখন চুক্তি করেছিল। বর্তমান বিএনপি সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা এই চুক্তি নিয়ে নতুন করে এগোতে হবে। আবার আলোচনার টেবিলে তুলে দেশের স্বার্থ সুরক্ষার পর নতুন করে আবার চুক্তি করা দরকার বলে মত তাদের। 

অন্যদিকে কেউ বলছেন, তৎকালীন বৈশ্বিক চাপের বাস্তবতায় এটি ছিল প্রায় অনিবার্য সিদ্ধান্ত। ফলে চুক্তিটি এখন আর শুধু কাগুজে সমঝোতা নয়, বরং জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ বাণিজ্য কৌশলের এক গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

এদিকে এই চুক্তি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ওঠার প্রেক্ষিতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্যচুক্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। বর্তমান সরকার এই চুক্তির সূচনাকারী নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে এটি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত কোনো চুক্তি ব্যক্তিগত চুক্তির মতো নয় যে ইচ্ছামতো বাতিল করা যাবে। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে এ কথা বলেন তিনি।

দেশের স্বার্থ সুরক্ষাই সরকারের মূল লক্ষ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, চুক্তির কোনো ধারা বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী হলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। তাই এ নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি (এগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড-এআরটি) স্বাক্ষর হয় গত ৯ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে। পরে ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এই পাল্টা বা পারস্পরিক শুল্ক আরোপ বাতিল করে দেন। এই চুক্তি নিয়ে দেশে নানা ধরনের সমালোচনা হচ্ছে। জাতীয় সংসদে এই চুক্তি বাতিলের জোর দাবি জানানো হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন থেকেও চুক্তি বাতিলের দাবি উঠেছে।

অর্থনীতিবিদরাও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে গ্রহণযোগ্য সমাধানের কথা বলেছেন। চুক্তিটি এখনও কার্যকর হয়নি। তবে এরই মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে নানা পণ্য কেনার চুক্তি করছে। এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, ৩২ পৃষ্ঠার ওই চুক্তিতে বাংলাদেশকে মোট ১৩১টি শর্ত মানার কথা বলা হয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে মানতে হবে মাত্র ৬টি শর্ত। এ জন্যই এই চুক্তিকে অসম চুক্তি বলছেন অর্থনীতিবিদ ও রফতানিকারকরা। এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমি মনে করি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তি করা বাংলাদেশের একেবারেই ঠিক হয়নি।

গত নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে তাড়াহুড়ো করে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার কেন এই চুক্তি করল- সেটি আমার বোধগম্য নয়। এই চুক্তি বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে। ওই চুক্তির পর মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট চুক্তি বাতিলের রায় দিয়েছে। তাই এই চুক্তি নিয়ে বর্তমান বিএনপি সরকারকে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসা দরকার। আলোচনা করে দেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে এবং উভয় পক্ষ যাতে সমানভাবে লাভবনা হয়- তার আলোকে নতুন করে চুক্তি করা দরকার।’

প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, ‘মার্কিন বাজারে সব পণ্যে এমনিতেই গড়ে ১৬ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। এর সঙ্গে আরও ১৯ শতাংশ শুল্ক যোগ করলে মোট ৩৫ শতাংশ শুল্ক দিয়ে পণ্য রফতানি করতে হবে। এ ছাড়া এই চুক্তির ফলে আমাদের রাজস্বে ছাড় দিতে হবে।

আবার চুক্তিতে বলা হয়েছে বাংলাদেশ কোথায় থেকে জ্বালানি কিনবে সেটিও তারা ঠিক করে দেবে। এ রকম অনেক শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে যা দেশের স্বার্থ পরিপন্থী। তাই আমি মনে করি এই চুক্তি নিয়ে জাতীয় সংসদে ব্যাপক আলোচনা হওয়া দরকার। তা ছাড়া নতুন সরকারের এটি নিয়ে বাধ্যবাধ্যকতা নেই। তারা আলোচনা করতেই পারে। এখনও সুযোগ আছে রিভিউ করার। যেসব জায়গায় বাংলাদেশের স্বার্থহানি ঘটেছে সেগুলো পরিবর্তন করে নতুনভাবে চুক্তি করা দরকার। সেটি না করলে এই অসম চুক্তির যে অভিঘাত আসবে তাতে বাংলাদেশকে চড়া মাসুল দিতে হবে।’

অবশ্য আরেক অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করছেন, ‘গত ফেব্রুয়ারিতে যখন এই চুক্তি হয় তখন বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশকে চুক্তি করা ছাড়া উপায়ও ছিল না। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির জন্য যখন চাপ দিয়েছে তখন আমাদের হাতে বিকল্প কি ছিল- সেটি একটা বিষয়। 
প্রথমে তারা আরও কঠিন কিছু শর্ত দিয়েছিল। তারা যেসব দেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে- যেমন ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও কম্বোডিয়ার মতো দেশ।

এসব দেশের মধ্যে যাদের ভৌগোলিক গুরুত্ব কম বা আমাদের মতো দেশে দরকষাকষির সুযোগ কম- তারা একরকম বাধ্য হয়েই চুক্তি করেছে। যেমন ইন্দোনেশিয়া যুক্তরাষ্ট্রে এক ধরনের মিনারেল রফতানি করে। যেটি ব্যাটারিতে দরকার হয়। রাবারও রফতানি করে। যুক্তরাষ্ট্র যখন বেশি শুল্ক বসাতে চেয়েছে, তখন ইন্দোনেশিয়া সরকারও বলেছে তারাও এসব পণ্যের ওপর শুল্ক বেশি বাড়াবে। তখন মার্কিন প্রশাসন কিছুটা পিছু হটে এবং শুল্ক কমিয়ে দেয়। তাদের এভাবে দরকষাকষির সুযোগ ছিল, কিন্তু বাংলাদেশের এমন সুযোগ ছিল না। তখন চুক্তিটা না করলে ট্যারিফ ১৯ শতাংশ জুটত না, ট্যারিফ ৩৭ শতাংশ হতো। 

তাই তখন হয়তো বাধ্য হয়েই চুক্তি করেছে তৎকালীন সরকার। তবে তারা যেসব শর্ত দিয়েছে সেগুলোর মধ্যে একতরফা আছে অনেক। এ অবস্থায় আমাদের দরকষাকষির সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। দরকষাকষি করে নতুনভাবে এগোতে হবে। যেহেতু এই চুক্তি অবৈধ বলেছে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট। এটিকে পুঁজি করে বাংলাদেশ চুক্তি রিভিও করার চেষ্টা করতে পারে।

এদিকে রফতানিকারকরাও বলছেন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তাড়াহুড়ো করে এই চুক্তি করা ঠিক হয়নি। এটিকে অসম চুক্তি উল্লেখ করে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সময়ের আলোকে বলেন, ‘কোনোভাবেই এই অসম চুক্তি করা ঠিক হয়নি বিগত সরকারের। চুক্তিতে অনেক কিছুই আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই চুক্তিকে আবার আলোচনার টেবিলে নিয়ে নতুন করে চুক্তি করা উচিত। আমাদের ১৩১টি শর্ত মানতে হবে। তারা মানবে ৬টি- এটি শুধু অসম না, এটি চরম বৈষম্যও।’

মোহাম্মদ হাতেম আরও বলেন, ‘এটি নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট করা হয়েছিল, কেন করেছে এটি। নিশ্চয় কোনো গোপন বিষয় ছিল বা কোনো ঘাপলা ছিল। এখন অনেক বিষয পরিষ্কার হয়ে গেছে। মার্কিন সরকার কোনো দেশকে কালো তালিকাভুক্ত করলে সেটি আমাদেরও মানতে হবে- কেন এটি আমাদের মানতে হবে। এটি তো অন্যায়। তাই আমি মনে করি এই চুক্তি নিয়ে আবার আলোচনায় বসা দরকার নতুন সরকাকে। ভালো করে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার পরই নতুন করে চুক্তি করা দরকার।

যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর হয় গত ৯ ফেব্রুয়ারি।  পরে ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এই পাল্টা বা পারস্পরিক শুল্কারোপ বাতিল করে দেন। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রথমে ১০ শতাংশ এবং পরদিন ১৫ শতাংশ শুল্কারোপ করেন। এটি করা হয় ট্রেড অ্যাক্ট অব ১৯৭৪-এর আওতায়। এই আইনে জরুরি পরিস্থিতিতে সাময়িকভাবে আমদানি পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি শুল্ক বসানো যায়। তবে এরও মেয়াদ সর্বোচ্চ ১৫০ দিন। এরপর কংগ্রেসের অনুমোদন লাগবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা এই পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তির কারণে বাংলাদেশ রাজস্ব হারাবে, বেশি দরে পণ্য কিনতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া অনুযায়ী নীতি ঠিক করতে হবে এবং বাধ্যতামূলকভাবে অসংখ্য শর্ত পালন করতে হবে। বিপরীতে এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বাড়বে, নিজের ভূরাজনৈতিক কৌশল অনুযায়ী বাংলাদেশকে নীতি নিতে বাধ্য করতে পারবে এবং এর বিনিময়ে বাংলাদেশকে তেমন কোনো ছাড় দিতে হবে না। সব মিলিয়ে এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের লাভ অতি সামান্য, ক্ষতি বেশি।

অর্থনীতিবিদরা আরও বলেন, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের এই পারস্পরিক শুল্ক চুক্তির অর্থনৈতিক প্রভাব নানামুখী। সাধারণত প্রতিযোগিতামূলক বাজারে জ্বালানি, বিমান বা কৃষিপণ্য কোথা থেকে কেনা হবে, তা ঠিক হয় দাম, পরিবহনসুবিধা ও দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিরাপত্তা দেখে। অথচ চুক্তি অনুযায়ী এসব পণ্য কিনতে হবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। 

সাধারণত নির্দিষ্ট দেশ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণে কেনার শর্ত থাকলে এতে শিল্পে উৎপাদনের খরচ বাড়ে, সরকারও প্রতিযোগিতামূলক দরে পণ্য কেনার সুযোগ হারায়। আবার এসব বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের বর্তমান সরবরাহকারী দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্কের প্রভাব ফেলতে পারে।

/এসএকে


  বিষয়:   আলোচনা  মার্কিন  চুক্তি  বাতিল  আন্তর্জাতিক  কূটনীতি 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: