চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অফশোর থেকে সরাসরি অপরিশোধিত তেল খালাসের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালী উপকূলে স্থাপিত দেশের প্রথম ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মোরিং’ (এসপিএম) নির্মাণ করা হয়েছে।
জ্বালানি সংকটের এই অস্থির সময়ে কক্সবাজারের মহেশখালীতে নির্মিত এসপিএম প্রকল্পটি সাগর থেকে সরাসরি ডিপোতে জ্বালানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত।
প্রকল্পটিতে রয়েছে ছয়টি স্টোরেজ ট্যাঙ্ক তিনটিতে মোট ১ লাখ ২৬ হাজার মেট্রিকটন ক্রুড অয়েল এবং বাকি তিনটিতে ৭৫ হাজার মেট্রিকটন ডিজেল মজুদের সক্ষমতা। ডাবল পাইপলাইন ব্যবস্থার কারণে একই সঙ্গে ক্রুড অয়েল ও ডিজেল পরিবহন করা সম্ভব। কিন্তু ৮ হাজার ৩৪১ কোটি টাকার এই প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও চালু না হওয়ায় বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা লস হচ্ছে সরকারের।
অন্যদিকে শুরুতে প্রকল্পের খরচ ৩০০ মিলিয়ন দেখানো হলেও পরে তা ৭০০ মিলিয়নে উন্নীত হওয়ায় প্রকল্প ব্যয় ও চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির (সিপিপি) যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এরই মধ্যে সিপিপি নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় কোম্পানি ‘পারটামিনা’র সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে কাজ পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, নসরুল হামিদ এবং তার সহযোগী সালমান এফ রহমান ও এনায়েতুল্লাহ খান সিন্ডিকেট এই প্রকল্পে অপ্রয়োজনীয় ‘সাম্প ট্যাঙ্ক’ এবং অতিরিক্ত একটি পাইপলাইন যুক্ত করে এর ব্যয় কৃত্রিমভাবে বৃদ্ধি করেন। ফলে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প সিপিপির সঙ্গে যোগসাজশে শেষ পর্যন্ত ৫৮৬ মিলিয়ন ডলারে ঠেকানো হয়। পরে চার দফায় ‘প্রাইস এসক্যালেশন’-এর মাধ্যমে এই খরচ ৭০০ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৮ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
প্রকল্পের নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১০ সালে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) এই প্রকল্পের জন্য ২৩৭ মিলিয়ন ডলার ঋণ দিতে সম্মত হয়। পরে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইএলএফের মতামতে তা ৩০০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়। তবে দৃশ্যপট বদলে যায় সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর আগমনে। তিনি আইডিবির সাশ্রয়ী ঋণ ফিরিয়ে দিয়ে চড়া সুদে চীনা ঋণের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিপিপির দুর্নীতির ইতিহাস আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ২০১৯ সালে মালয়েশিয়া সরকার দুর্নীতির অভিযোগে সিপিপির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে এবং তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ২৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার জব্দ করে। এ কারণে সিপিপির যোগ্যতা নিয়ে শুরু থেকেই সংশয় ছিল। মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধি দল আফ্রিকায় সিপিপির কাজ পরিদর্শন করতে গিয়ে তাদের দাবিকৃত অভিজ্ঞতার কোনো সত্যতা পায়নি।
প্রতিনিধি দলটি দেশে ফিরে একটি নেতিবাচক রিপোর্ট জমা দিলেও তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ক্ষুব্ধ হয়ে সদস্যদের জীবন ও চাকরির হুমকি দিয়ে রিপোর্টটি ‘ইতিবাচক’ করতে বাধ্য করেন। পরে কোনো ধরনের প্রতিযোগিতা ছাড়াই কেবল সিপিপি প্রদত্ত দরের ওপর নেগোসিয়েশন করে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।
জানা গেছে, প্রায় ৩২ কোটি টাকার কাজ বাকি থাকায় ইস্টার্ন রিফাইনারি ও বিপিসি এখনও প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদন (পিসিআর) জমা দিতে পারেনি। অভিযোগ উঠেছে, চীনা প্রতিষ্ঠান সিপিপি ও অ্যান্ডএম খাতের পূর্ণ অর্থ বুঝে নিলেও সিপিসি চুক্তি অনুযায়ী নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। নতুন পিপিআর-২০২৫ উপেক্ষা করে পুরোনো বিধিতে তড়িঘড়ি দরপত্র আহ্বান করায় জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে ১১টির মধ্যে মাত্র ৩টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে পেরেছে। সিপিপির ভাবমর্যাদা নষ্ট হওয়ায় তারা এখন নতুন কৌশল নিয়েছে। তারা সরাসরি না এসে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় কোম্পানি পারটামিনার সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে কাজ পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। নিজেদের ‘অযোগ্যতা’ ঢাকতে তারা বিদেশি অংশীদারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
এদিকে ২০২৬ সালের ওঅ্যান্ডএম টেন্ডার ঘিরেও দেখা দিয়েছে অনিয়ম। নতুন পিপিআর-২০২৫ উপেক্ষা করে পুরোনো বিধিতে তড়িঘড়ি দরপত্র আহ্বান করায় জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে ১১টির মধ্যে মাত্র ৩টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে পেরেছে। এই অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এবং ঝুঁকি এড়াতে বিশেষজ্ঞরা পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়াটি পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ী প্রকল্প। পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল খালাস করলে ক্ষয়ক্ষতি কমে এবং এটি পরিবেশবান্ধবও। প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার পরও কেন এটি চালু হয়নি, তা প্রশ্নবিদ্ধ। দ্রুত এটি চালু করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি কোনো প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম বলেন, দীর্ঘদিন অলস পড়ে থাকার কারণে এই বহুমূল্য সরঞ্জামগুলো তাদের কার্যক্ষমতা হারাবে। এরই মধ্যে ওয়ারেন্টি পিরিয়ড পার হয়ে গেছে। এখন এগুলো সচল করতে হলে সরকারকে পুনরায় বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হবে, যা স্রেফ রাষ্ট্রের অর্থের অপচয়। জ্বালানি বিভাগ থেকে বলা হয়েছে, সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসপিএম চালু করতে কাজ করছে।
সময়ের আলো/জেডি