মূল্যস্ফীতি আর স্থবির আয়ে মধ্যবিত্তের শ্রেণিচ্যুতি

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

জাতীয়

সকাল ৮টা। গাইবান্ধা জেলা শহরের ডিবি রোডের হকার্স মার্কেটে মাছের আড়তের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন রফিকুল ইসলাম। তিনি স্থানীয় একটি বেসরকারি

2026-05-08T01:37:02+00:00
2026-05-08T01:37:02+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
মূল্যস্ফীতি আর স্থবির আয়ে মধ্যবিত্তের শ্রেণিচ্যুতি
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬, ১:৩৭ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
সকাল ৮টা। গাইবান্ধা জেলা শহরের ডিবি রোডের হকার্স মার্কেটে মাছের আড়তের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন রফিকুল ইসলাম। তিনি স্থানীয় একটি বেসরকারি স্কুলের সহকারী শিক্ষক। রুই মাছের কেজি সাড়ে তিনশ টাকা, দুই বছর আগেও যা ছিল দুইশ। শেষ পর্যন্ত ছোট মাছ কিনে শাকের বাজারের দিকে হাঁটা দিলেন। তিনি বলেন, ‘বাজারে এলে বুক কাঁপে। বেতন বাড়েনি, কিন্তু সবকিছুর দাম বেড়েছে দ্বিগুণ-তিনগুণ। মাসের মাঝামাঝিতেই টাকা শেষ।’

রফিকুলের এই কথা শুধু তার একার নয়, গাইবান্ধার হাজারো মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিদিনের বাস্তবতা। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও যমুনাবেষ্টিত এই প্রান্তিক জেলায় মধ্যবিত্ত শ্রেণি এখন মূল্যস্ফীতি ও আয়ের স্থবিরতার দ্বৈত চাপে ধুঁকছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে জাতীয় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৭১ শতাংশ, খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। 

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নির্দিষ্ট আয়ের চাকরিজীবীরাই এই চাপে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। গাইবান্ধার মতো জেলায় বিকল্প আয়ের পথ সংকীর্ণ, করপোরেট চাকরি নেই বললেই চলে, তাই এখানে এই চাপ বহুগুণ বেশি।

জেলা শহরের কলেজ পাড়ার বাসিন্দা নাসরিন আক্তার। তিনি বলেন, আমার স্বামী এনজিওতে কাজ করেন, বেতন পঁচিশ হাজার টাকা। বাড়ি ভাড়া, সন্তানদের কোচিং, বাজার খরচ, বিদ্যুৎ বিল সব মিলিয়ে মাসের শেষে ধার না করলে চলে না। সঞ্চয় তো দূরের কথা। বড় ছেলের বইপত্র কিনতে গিয়ে দেখি গত বছরের চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ বেশি লাগছে। বুকের ভেতর চাপ অনুভব করলাম।

ফুলছড়ির সিনিয়র শিক্ষক আব্দুল করিম জানান, বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর সুবিধা বা রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট পেতে বছরের পর বছর দফতরে ঘুরতে হয়। তার মাসিক বাজার খরচ আগে আট-দশ হাজারে মিটত, এখন পনেরো-সতেরো হাজারেও হয় না। ছেলে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। দুটো দিক টানছে- একটানে থাকলে একটা ছিঁড়ে যাবে।

স্বাস্থ্য খরচ মধ্যবিত্তকে এক ধাক্কায় নিম্নবিত্তে নামিয়ে দিতে পারে। কাপড়ের দোকানদার জাহিদুল ইসলামের স্ত্রীর হার্টের চিকিৎসায় রংপুরে খরচ হয় দেড় লাখ টাকা। দোকানের পুঁজি ভেঙে ধার করে সেই খরচ মেটানো হয়েছে, কিন্তু দুই বছরেও ঋণ শোধ হয়নি।

নদী ভাঙনের কারণে চর থেকে আসা মজিবর রহমান এখন শহরে ওষুধের দোকানে কাজ করেন, বেতন চৌদ্দ হাজার। তিন বিঘা জমি ব্রহ্মপুত্রে হারিয়ে গেছে এক দশক আগে। এই উচ্ছেদ হওয়া মানুষগুলো মধ্যবিত্তের মোড়ে আটকে আছেন- গ্রামে ফেরার পথ নেই, শহরে স্থায়িত্ব নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যবিত্তের স্থান ক্রমশ দখল করছে সেই পরিবারগুলো, যাদের একজন বা দুজন বিদেশে কর্মরত। বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে চাষি মাঠে যে দামে বিক্রি করেন, শহরে সেই সবজির দাম তিনগুণ। কাগজে-কলমে তদারকি থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর নয়।

মধ্যবিত্তের সংকট শুধু আর্থিক নয়, মনস্তাত্ত্বিকও। সমাজের চোখে ভালো মানুষদের অভাব প্রকাশ করার উপায় নেই। কলেজছাত্র রাকিব হাসান বলছিলেন, বাবা সারাজীবন কষ্ট করে মধ্যবিত্ত জায়গায় এসেছেন। এখন মাসের শেষে হিসাব মেলাতে পারছেন না দেখে ভয় লাগে। মনে হয় আমি কি পারব এর চেয়ে ভালো থাকতে?

গাইবান্ধার মধ্যবিত্ত মানুষ উন্নয়নের বড় স্লোগান চান না। চান বাজারে দামের নিয়ন্ত্রণ, বেতনে বাস্তবসম্মত সমন্বয়, শিক্ষা-স্বাস্থ্যে সাশ্রয়ী ব্যয় আর সঞ্চয়ের একটুখানি সুযোগ। রফিকুল ইসলামের কথায়, ‘আমি চাই না বিলাসিতা। সপ্তাহে এক দিন ছেলেমেয়ে নিয়ে মাছ-ভাত খেতে পারব এটুকু যেন থাকে।’

এই নিঃশব্দ কষ্ট কোনো পরিসংখ্যানে ধরা যায় না। কিন্তু থামানো না গেলে গাইবান্ধার মতো জেলাগুলো এক হতাশার প্রজন্ম তৈরির দিকে এগিয়ে যাবে- যেখানে মধ্যবিত্তের স্থান ক্রমে সংকুচিত হতে থাকবে, আর তার জায়গায় তৈরি হবে হতাশার একটি প্রজন্ম। 

সময়ের আলো/জেডি 


  বিষয়:   মূল্যস্ফীতি  স্থবির  আয়  মধ্যবিত্ত 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: