অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে শক্তিশালী সম্পাদকীয় কাঠামো তৈরি করা এবং সব ধরনের আর্থিক ও রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিহত করা একান্ত প্রয়োজন।
শুক্রবার (৮ মে) রাজধানীর র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে এমআরডিআই আয়োজিত ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’-এর প্রথম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বক্তারা এ কথা বলেন। অধিবেশনের শিরোনাম ছিল, বাংলাদেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা : বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ এবং উত্তরণের পথ।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তথ্য উদ্ঘাটনের ক্ষেত্রে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে এবং লেখক ইউভাল নোয়া হারারিকে উদ্ধৃত করে বলেন, সত্য অনুসন্ধান করা ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ, কিন্তু আধুনিক নিউজরুমগুলো প্রায়ই সত্য খবরের চেয়ে দ্রুততাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানগুলোকে অপ্রাসঙ্গিক তথ্যে ডুবিয়ে দেওয়াকে তিনি সেন্সরশিপের একটি আধুনিক কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করেন। সেন্সরশিপের সূত্র বদলে গেছে। তারা এখন আর আপনাকে হুমকি দেয় না, অপহরণ করে না। পরিবর্তে, তারা নিশ্চিত করে যে যখন আপনার অনুসন্ধানটি প্রকাশিত হবে, তখন তথ্য এবং অপতথ্যের বন্যায় সেটি যেন চাপা পড়ে যায় এবং গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে।
পাকিস্তানের দৈনিক ডনের সম্পাদক জাফর আব্বাস বলেন, একটি সংবাদপত্রের টিকে থাকা সম্পূর্ণভাবে এর সম্পাদকীয় টিমের স্বায়ত্তশাসন এবং সততার ওপর নির্ভর করে। এক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং প্রকাশকদের সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভালো সাংবাদিকতা করার জন্য আপনি যদি আপনার সম্পাদক ও তার সহকর্মীদের বিশ্বাস করতে না পারেন, তবে একটি মিডিয়া হাউস কখনোই সফল হতে পারবে না।
বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির কথা তুলে ধরে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে অন্তত ৫০০ সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং বাংলাদেশেও গত দশকে ২৬ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া সংবাদমাধ্যমের ওপর আক্রমণ এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড দেশের জন্য নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সম্মেলনের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে।
ইউনেস্কোর প্রতিনিধি সুসান ভাইজ বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। মিডিয়া রিফর্ম কমিশন এবং বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে সংবাদমাধ্যমের আমূল পরিবর্তন আনার এটাই উপযুক্ত সময়।
তিনি বর্তমান সরকারকে আলোচনার ক্ষেত্রে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশে একটি বৈচিত্র্যময় ও সংহতিপূর্ণ মিডিয়া ইকোসিস্টেম তৈরি করা জরুরি।
দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম জোর দিয়ে বলেন, স্বাধীন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য পূর্বশর্ত একটি শক্তিশালী সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান। একজন সম্পাদকের কখনোই মালিকের পিআরও (জনসংযোগ কর্মকর্তা) হওয়া উচিত নয়। মালিকদের একটি ভূমিকা থাকলেও, মালিক ও সম্পাদকের ভূমিকার মধ্যে অবশ্যই একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য থাকতে হবে। দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা প্রায়ই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসে থাকেন এবং প্রধান বিজ্ঞাপনগুলো তাদের মাধ্যমেই আসে। সেই চাপ যিনি সামলাবেন, তিনি হলেন সম্পাদক। গণমাধ্যমের রাজনীতিকরণে ফলে দেশে শক্তিশালী সম্পাদকীয় ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। সংবাদমাধ্যম খাতে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা আনতে সম্পাদক পরিষদ সম্পাদক ও মালিকপক্ষের জন্য দুটি আলাদা আচরণবিধি (কোড অব কন্ডাক্ট) তৈরি করছে বলে তিনি জানান।
যমুনা টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ বলেন, আমরা বিজ্ঞাপন-নির্ভর গণমাধ্যম এবং এটি এক ধরনের দুর্বলতা। আমাদের আলাদা কোনো তহবিল নেই এবং সামান্য বিজ্ঞাপনের আয়ের ওপর ভিত্তি করে একটি সংবাদমাধ্যমের পক্ষে পুরো এক বছর একটিমাত্র অনুসন্ধানের পেছনে বিনিয়োগ করা প্রায় অসম্ভব।
স্বাগত বক্তব্যে এমআরডিআই-এর নির্বাহী পরিচালক হাসিব রহমান জানান, কনফারেন্সে অংশ নিতে ৩ হাজার ৮০০-এর বেশি আবেদন জমা পড়েছিল। এটি প্রমাণ করে দেশের সাংবাদিকদের মধ্যে শেখার ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রবল আগ্রহ রয়েছে। তিনি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত এবং নিউজ রুমের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় ‘স্ব-নিয়ন্ত্রণ’ ব্যবস্থার ওপর জোর দেন।
বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হলো জন-জবাবদিহির মেরুদণ্ড। এটি ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনে এবং সমাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অধিকার। গণমাধ্যমের ওপর জনগণের আস্থা শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য।
গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্ক (জিআইজেএন)-এর নির্বাহী পরিচালক এমিলিয়া ডাস অনলাইন বার্তায় জানান, তথ্য বিকৃতি ও ডিজিটাল হুমকির মুখে জ্ঞান বিনিময় সাংবাদিকতাকে আরও উদ্ভাবনী ও শক্তিশালী করবে।
অধিবেশনটি সঞ্চালনা করতে গিয়ে বিবিসির সাবেক সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার উপস্থিত সবাইকে এই পেশার মূল সংজ্ঞা মনে করিয়ে দেন, সংবাদ হলো তা-ই, যা কেউ কোনো স্থানে চেপে রাখতে চায়। বাকি সব কিছুই বিজ্ঞাপন।
সময়ের আলো/জেডআই