সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে অনিশ্চয়তা

জাহিদুল ইসলাম

জাতীয়

গত ১৬ বছরে পতিত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, লুটপাট ও বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের চাপ সামাল

2026-05-09T00:46:47+00:00
2026-05-09T00:47:07+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
ব্যাংক রেজুলেশন আইন ঘিরে নতুন বিতর্ক
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে অনিশ্চয়তা
জাহিদুল ইসলাম
প্রকাশ: শনিবার, ৯ মে, ২০২৬, ১২:৪৬ এএম  আপডেট: ০৯.০৫.২০২৬ ১২:৪৭ এএম
প্রতীকী ছবি
গত ১৬ বছরে পতিত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, লুটপাট ও বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের চাপ সামাল দিতে ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে গঠিত হয়েছে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’। কিন্তু একীভূতকরণ প্রক্রিয়া শুরু হতেই নতুন ব্যাংক রেজুলেশন আইনের বিতর্কিত ধারা, পূর্বের মালিকানা পুনরুদ্ধারের সুযোগ এবং তারল্য সংকট ঘিরে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। একই সঙ্গে আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনে সীমাবদ্ধতা ও ‘হেয়ার কাট’ পদ্ধতির কারণে দেশজুড়ে গ্রাহক অসন্তোষ চরমে পৌঁছেছে। ফলে নবগঠিত এই ব্যাংকের ভবিষ্যৎ ও স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন খাতসংশ্লিষ্ট ও অর্থনীতিবিদরা।

মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট ও দেউলিয়াত্ব রোধসহ আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে গত বছরের ৯ মে ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। এই অধ্যাদেশের আলোকে এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। বর্তমান নির্বাচিত সরকার সে সময়কার অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপান্তরের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে বিল আকারে উপস্থাপন করে। এর মধ্যে ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরে গত ১০ এপ্রিল সংসদে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু এর আগে এই বিলে নতুন একটি ধারা সংযোজন করা হয় সরকারের পক্ষে, যা নিয়ে তৈরি হয় বিতর্ক। নতুন সংযোজিত ১৮-এর ‘ক’ ধারায় ব্যাংকের আগের মালিকদের ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে বলা হয়েছে- ‘আপাতত বলবৎ অন্য কোন আইন কিংবা এই আইনের অন্যান্য বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ ২০২৫-এর আওতায় কোন তফসিলি ব্যাংক রেজুলেশনের সিদ্ধান্তের আলোকে তালিকাভুক্ত হইবার অব্যবহিত পূর্বের শেয়ারধারকগণ অথবা শেয়ারধারকগণ অথবা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক উপযুক্ত বিবেচিত ব্যক্তি উক্ত ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ-দায় পুনঃধারণ বা ধারণ করিবার জন্য রেজুলেশন কর্তৃপক্ষ হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংক বরাবর আবেদন করিতে পারিবে।’
আরও পড়ুন

এ ক্ষেত্রে আবেদন করলেই পূর্বের পরিচালকদের অনুকূলে মালিকানা হস্তান্তরের বিষয়ে আইনে উল্লেখ রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে শর্ত যোগ করা হয়েছে- মালিকানা ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ৩ মাসের মধ্যে সরকারের প্রদত্ত তারল্য সহায়তার অন্যূন সাড়ে ৭ শতাংশ পে-অর্ডারের মাধ্যমে ফেরত দেওয়া এবং বাকি ৯২ শতাংশ অর্থ পরবর্তী ২ বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদসহ ফেরত দেওয়া। এ ছাড়া ব্যাংকে স্থিতিশীলতা ফেরাতে আরও ৯টি শর্ত যোগ করা হয়েছে। 

অর্থাৎ সরকারের দেওয়া তারল্য সহায়তা ফেরত দিলেই ব্যাংকগুলো ফের পূর্বের পরিচালকদের জিম্মায় চলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে, যারা এ দুরবস্থার জন্য দায়ী। বাকি ৯২ শতাংশ পরিশোধে ২ বছরের জন্য একটি স্বতন্ত্র কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে যে কমিটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে দেওয়া মালিকপক্ষের অঙ্গীকারগুলো দেখভাল করবে। তবে এ কমিটি যদি তাদের দায়িত্বে অবহেলা বা কোনো অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে সে ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই আইনে। 

সরকারের এমন পদক্ষেপকে পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার অন্তরায় বলেই মনে করছেন স্বয়ং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারাই। এক কর্মকর্তা সময়ের আলোকে এ প্রসঙ্গে বলেন, যদি পূর্বের পরিচালকরা তাদের স্ব স্ব ব্যাংকে ফিরতেই পারেন, তা হলে আর একীভূত থাকবেন কেন? বরং স্বতন্ত্র ব্যাংকের পরিচালক হওয়াটাই তাদের জন্য সুবিধাজনক। এখন পর্যন্ত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য এমডি নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। এমনকি চেয়ারম্যান হিসেবে যাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তিনিও পদত্যাগ করেছেন। এসব ঘটনা থেকেই বোঝা যায় আলটিমেটলি হয়তো আলোর মুখ দেখবে না একীভূতকরণ।

গ্রাহকদের অসন্তোষের মূল কারণ : খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, তারল্য সংকট এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সম্প্রতি এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী এবং ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠন করে সরকার। কিন্তু এ পদক্ষেপের পরও গ্রাহকদের সংকট না কাটায় ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নির্দেশনায় ২০২৪ ও ২০২৫ সালের লভ্যাংশের মাত্র ৪ শতাংশ দিয়ে বাকি অংশ মূলধন থেকে কর্তন করার (হেয়ার কাট পদ্ধতি) পরিকল্পনা গ্রাহকদের ক্ষুব্ধ করেছে। এ ছাড়া গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী টাকা উত্তোলন করতে না পারা তাদের ক্ষোভ আরও উসকে দিয়েছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, কোটি টাকা জমা থাকলেও ব্যাংক থেকে দৈনন্দিন খরচের জন্য সামান্য টাকাও (এমনকি ১ হাজার টাকাও) তুলতে দেওয়া হচ্ছে না। আবার কিছু ব্যাংকের পক্ষ থেকে ২০২৮ সালের আগে টাকা উত্তোলনের সুযোগ নেই- এমনটা জানানোর পর জমা করা অর্থের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমানতকারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুরোনো মালিকদের ফের ব্যাংকের মালিকানায় আসার শঙ্কা।

মঙ্গলবার দিলকুশা সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখায় টাকা তুলতে টিকাটুলি থেকে আসা সত্তরোর্ধ্ব নজরুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ছেলের পড়াশোনার খরচ ও ব্যাংক ঋণ পরিশোধসহ সংসারের খরচে প্রতি মাসেই ৫০-৬০ হাজার টাকা প্রয়োজন। মাঝেমধ্যে বিশেষ কারণে আরও বেশিও লাগে। কিন্তু ব্যাংক থেকে প্রতি সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা তুলতে পারি। এতে সংসার পরিচালনায় হিমশিম খেতে হচ্ছে।

একই কথা বলেন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক ইউসুফ মিয়া। তিনি বলেন, ব্যাংকের পরিচালনায় কে এলো তার চেয়ে আমাদের টাকা কে দ্রুত ফেরত দিতে পারবে, আমরা তাকে চাই। মেয়ের বিয়ের জন্য টাকা জমিয়েছিলাম, কিন্তু সব আশা দুরাশায় পরিণত হয়েছে।

তবে টাকা পেতে ভোগান্তির চেয়েও পুরোনো মালিকদের ব্যাংকের ফেরার সুযোগ তৈরি হওয়া বেশি বিপজ্জনক বলে মনে করছেন এক্সিম ব্যাংকের গ্রাহক ও ঢাকার বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা শেখ সালাউদ্দিন বাবু। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যেহেতু আমাদের দায়িত্ব নিয়েছে, ইতিমধ্যে কিছু টাকা ফেরত দিয়েছে এবং সামনের দিনগুলোতে বাকি টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে, তাই আমরা চাই এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে যেভাবে চলছে, সেভাবেই চলুক। বরং বারবার পরিচালনগত পরিবর্তন ব্যাংকের জন্য সমস্যা তৈরি করবে। অন্য মালিকরা এসে কী করবেন তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের টাকা আরও দ্রুত দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।

একই মন্তব্য করেন ইউনিয়ন ব্যাংকের গ্রাহক ও ঢাকার হাজারীবাগের ব্যবসায়ী মোবারক হোসেন। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো ধ্বংসের পেছনে যারা মূল ভূমিকা রেখেছে কোনো অবস্থাতেই তাদের হাতে পুনরায় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ দেওয়া ঠিক হবে না। আমরা যারা গ্রাহক আছি, আমাদের টাকা ধীরে ধীরে পরিশোধ করুক সমস্যা নেই, কিন্তু আগের মালিকদের হাতে গেলে এবার ব্যাংকের মাটিও তারা রাখবে না।

একীভূত হওয়া এই পাঁচ ব্যাংক নিয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে গভীর সংকটের মুখে। আমানতের টাকা ফেরত পাওয়া এবং লভ্যাংশ কর্তনের প্রতিবাদে ইতিমধ্যে সারা দেশে গ্রাহকরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। রাজধানীসহ বন্দর নগরী চট্টগ্রামে মানববন্ধন করেছেন তারা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নরের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন একাধিকবার। এমনকি চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ ও খাতুনগঞ্জে ক্ষুব্ধ গ্রাহক পরিচয়ে কিছু লোক ৫ ব্যাংকের ৯টি শাখায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবরুদ্ধ করে ব্যাংকের বাইরে তালাও ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। 

একীভূত হওয়া পর্যন্ত গ্রাহকদের ধৈর্য ধারণের অনুরোধ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের :
একীভূতকরণ প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত হেয়ার কাট পদ্ধতি বাতিল ও টাকা উত্তোলনে দুর্ভোগের শিকার হওয়া গ্রাহকদের ধৈর্য ধারণের পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে আন্দোলনের নামে কেউ স্যাবোটাজ করার চেষ্টা করলে তাদের প্রতি সতর্ক হতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তারা। বিষয়টি নিয়ে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হেড অব ব্রাঞ্চ কন্ট্রোল ডিভিশন মো. শাহরিয়ার খান সময়ের আলোকে বলেন, একীভূত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের মধ্যে আমাদের অবস্থান অন্যদের তুলনায় কিছুটা ভালো। ইতিমধ্যেই আমরা নতুন প্রশাসকের নির্দেশনায় ঋণ পুনরুদ্ধার করা শুরু করেছি এবং পুরোনো ব্যবসাগুলো চালু করেছি। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে ব্যবসার আওতা বৃদ্ধি করছি। 

তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের এলসি সুবিধা পুনরায় শুরু হয়েছে। ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পূর্বে যেসব এলসি ছিল সেগুলোর ৯০ শতাংশ সেটেলমেন্ট হয়েছে। যে ১০ শতাংশ বাকি আছে তা আগামী প্রান্তিকের মধ্যেই সম্পন্ন হবে বলে আশা করছি। তাই গ্রাহকের উৎকণ্ঠিত হওয়ার কিছু নেই। মার্জার প্রক্রিয়া পুরোপুরি সম্পন্ন হলে গ্রাহকদের আর কোনো ভোগান্তি থাকবে না। এ সময় গ্রাহকদের হঠকারী কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ জানান তিনি। 

কী বলছে বাংলাদেশ ব্যাংক : পুরোনো মালিকদের ব্যাংক পরিচালনায় ফেরত আসার সুযোগ থাকলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যত কী- জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. আরিফ হোসেন খান সময়ের আলোকে বলেন, সরকার চিরদিনের জন্য ব্যাংকগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখবে না। একসময় বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেবে। কিন্তু কারা তখন মালিকানা পাবে? তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেই যে, পুরোনো পরিচালকরা ফিরে আসবেন, সে ক্ষেত্রে পরিচালক হওয়ার আগে বিএফআইইউর ক্লিন রিপোর্ট প্রয়োজন হবে। পূর্বের পরিচালকরা যদি বিদেশে পাচার করা সব অর্থ দেশে নিয়ে আসেন, সব বন্ধ কল-কারখানা চালু করে দেন, খেলাপি হওয়া সব ঋণ পরিশোধ করে দেন তা হলে তাদের পরিচালক হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই।

একই সঙ্গে দাবি আদায়ে গ্রাহকদের নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচি অমূলক এবং অনভিপ্রেত বলে মন্তব্য করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, বিভিন্ন সূত্র থেকে আমরা জানতে পেরেছি- ঢাকাতে যারা আন্দোলন বা বিক্ষোভ করেছিল, সেই পরিচিত মুখগুলোই চট্টগ্রামে ব্যাংকে তালা ঝুলিয়ে কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করার মতো নিন্দনীয় কাজ করেছে। দিনের আলোতে ব্যাংকের মতো একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কীভাবে তারা তালা দেয় এটা ভাবনার বিষয়। আমরা ধারণা করছি, হয়তো কোনো গোষ্ঠীর পেইড এজেন্ট হিসেবে অসৎ উদ্দেশ্যেই তাদের মাঠে নামানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সজাগ থাকতে হবে, যেন কেউ এ ধরনের কাজ করার সাহস না দেখায়।

তবে সম্মিলিত ব্যাংকের গ্রাহকদের সমস্যা নিরসনের বিষয়ে তিনি বলেন, এই ব্যাংকগুলোর আমানত ছিল দেড় লাখ কোটি টাকা, যা পূর্বের পরিচালকরা হাতিয়ে নিয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে ব্যাংকগুলোর অনুকূলে ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। বিষয়টি আমানতকারীরাও জানেন। এখন তারা যদি মনে করেন এখনই তাদের জমাকৃত দেড় লাখ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে, সেটা তো সম্ভব নয়। পৃথিবীর কোনো দেশেই হঠাৎ করে সব গ্রাহককে একত্রে টাকা দেওয়া সম্ভব হবে না। কারণ ব্যাংক শুধু আমানত গ্রহণ করে না, ঋণও দেয়। 

কী বলছেন অর্থনীতিবিদরা : পূর্বের পরিচালকরা ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে এলে তার প্রভাব কী এবং সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে কোনো বাধা হবে কি না- এমন প্রশ্নে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, এটা হবে অত্যন্ত ভ্রান্ত পদক্ষেপ। আমি মনে করি, যে লুটেরাদের কারণে ব্যাংকগুলো দেউলিয়াত্বের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছে, সেখান থেকে ব্যাংকগুলোকে উদ্ধার করতে পুরোনো মালিকদের হাতে ব্যাংকগুলো ফিরিয়ে দেওয়া অত্যন্ত বড় ধরনের ভুল হবে। তবে পূর্বের মালিকরা স্ব স্ব ব্যাংকের পরিচালনায় এলে তা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণে কোনো বাধা হবে কি না, সেটা এ মুহূর্তে বলা খুব কঠিন। আলাদা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে, তবে খুব বেশি নয় বরং একসঙ্গে থাকার পরও টিকে থাকবে কি না, সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। তবে আমি মনে করি, একসঙ্গে থাকাটা ব্যাংকগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ভালো একটা সমাধান হতে পারে।

অন্যদিকে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসরুর রিয়াজ বলেন, যদি পুরোনো মালিকরা আবার স্ব স্ব ব্যাংকের পরিচালনায় আসেন তা হলে ব্যাংকগুলো আলাদা হয়ে যাবে। তবে নতুন আইনের ফলে ৫টি ব্যাংক আগের অবস্থানে চলে যাবে, নাকি যেমন আছে তেমনই থাকবে- এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। কারণ এ বিষয়ে স্পষ্টতার যথেষ্ট ঘাটতি আছে।

একই সঙ্গে নতুন আইনের মাধ্যমে পুরোনো পরিচালকদের হাতে ব্যাংকের মালিকানা দেওয়ার বিষয়টি সঠিক সিদ্ধান্ত নয় বলে মনে করেন তিনি। বলেন, দেশে ব্যাংকের সংখ্যা এবং তাদের অনেকের আর্থিক দুর্বলতার দিকে থেকে মার্জার বা একুইজিশন হতে যে আইনি ভিত্তি সেদিক থেকে ব্যাংক রেজুলেশন আইনটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। তবে আইনটা পাস করার সময়ে পুরোনো মালিকদের মালিকানা কিনে নেওয়ার যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, সেটা সঠিক বলে মনে করি না। যারা ব্যাংক লুটপাটে জড়িত ছিল বলে প্রমাণ রয়েছে তাদের এ সুযোগ দেওয়া ঠিক হবে না। 

একীভূত ব্যাংকগুলোর অবস্থা : যে পাঁচটি ব্যাংক নিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে সেগুলো হলো- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক। এর মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছিল নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের নিয়ন্ত্রণে। বাকি চারটি ছিল এস আলাম গ্রুপের হাতে। একীভূত করার আগে আন্তর্জাতিক ফার্ম দিয়ে অডিট করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যেখানে সরকারের পক্ষে ২০ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে এবং বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার দেওয়া হবে। এর বাইরে আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ধার হিসেবে দিয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন ব্যাংকের চাঁদায় গড়ে ওঠা আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে আমানতকারীদের দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে পুরো অর্থ যেন তুলতে পারেন, সে জন্য আলাদা একটি স্কিম ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের মোট ঋণ বিতরণ এক লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি এক লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৮৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। অথচ পুরো ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। 

এ ছাড়া এ সময়ে পাঁচ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৫০ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা, যেখানে দেশের ২২ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দুই লাখ ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ শুধু এই পাঁচ ব্যাংকেই মোট মূলধন ঘাটতির অর্ধেকের বেশি।

একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছে এক্সিম ব্যাংক। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির ৫৩ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৬২ দশমিক ৪৫ শতাংশ খেলাপি। আর মূলধন ঘাটতি রয়েছে ২২ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। বাকি চার ব্যাংকের মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৮ হাজার ১৭ কোটি টাকার ঋণের ৯৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ এখন খেলাপি। মূলধন ঘাটতি ২৭ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৬২ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা ঋণের ৯৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ খেলাপি। মূলধন ঘাটতি ৬৫ হাজার ৯০ কোটি টাকা। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৪ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা ঋণের ৯৬ দশমিক ২৭ শতাংশ খেলাপি। মূলধন ঘাটতি ১৩ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা। আর সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩৮ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে ৭৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ খেলাপি। মূলধন ঘাটতি ২২ হাজার ১১৪ কোটি টাকা।

এএডি/


  বিষয়:   ব্যাংক  রেজুলেশন  আইন  বিতর্ক  ইসলামী ব্যাংক  অনিশ্চয়তা 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: