চলতি অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশেরও বেশি বাড়িয়ে আগামী অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) চূড়ান্ত হচ্ছে। যেখানে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা প্রাথমিকভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে এর মধ্যে বেনামি খাতেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এক লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন ও সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা বাবদ ‘থোক বরাদ্দ’ হিসেবে এই বিশাল অঙ্কের টাকা রাখা হয়েছে।
তবে দিনশেষে এই খাতের টাকা রাজনৈতিক প্রভাব বা পছন্দনির্ভর প্রকল্পে বরাদ্দ কিংবা অপব্যবহারের শঙ্কা রয়েছে। সে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি, দ্রব্য মূল্যবৃদ্ধি, ও দুর্বল প্রবৃদ্ধিসহ ক্রিটিক্যাল এই সময়ে এত বড় এডিপির আকার বাস্তবায়ন নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
শনিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এডিপির বর্ধিত সভায় বড় অঙ্কের এই বরাদ্দ প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত হয়েছে। আগামী ১৬ মে আরেকটি বর্ধিত সভায় এটি চূড়ান্ত হবে। এডিপিতে থাকা মোট ১১২১ প্রকল্পের মধ্যে নতুন প্রকল্প রয়েছে ৭৭টি। আগামী ১৮ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় উন্নয়ন বাজেটটি অনুমোদন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, যা পরে বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। প্রস্তাবিত এডিপিতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা সংস্থান করা হবে। এ ছাড়া স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পের জন্য আরও ৮ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। অন্যদিকে বৈদেশিক উৎস থেকে এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা সংস্থান করা হবে।
প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত এই এডিপিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিশেষ উন্নয়ন সহায়তা এবং সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে সরাসরি প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮১ হাজার ৭১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট উন্নয়ন বাজেটের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি অংশ এখনও নির্দিষ্ট প্রকল্পের বাইরে রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা খাতে রাখা হয়েছে ৩৮ হাজার ২৭ কোটি টাকা এবং সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা খাতে আরও ১৭ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আওতায় ৫৯ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা এবং আরও উন্নয়ন সহায়তা খাতে ৩৯৮৫ কোটি টাকা রাখা হয়েছে, যা অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
জানা যায়, স্বাস্থ্য বিভাগের চলমান প্রকল্পগুলোর জন্য ৬ হাজার ৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও বিপরীতে বিভাগটির জন্য থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দের তুলনায় প্রায় সাড়ে তিন গুণ বেশি অর্থ রাখা হয়েছে অনির্দিষ্ট উন্নয়ন সহায়তা হিসেবে। একই চিত্র দেখা গেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রেও। চলমান প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫ হাজার ৪৮ কোটি টাকা, অথচ থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৪ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগেও প্রকল্পের বাইরে আলাদা বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগে থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩ হাজার ৭৯ কোটি টাকা।
অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দে সবচেয়ে বেশি পাচ্ছে স্থানীয় সরকার বিভাগ, ৩৩ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, যার বরাদ্দ ৩০ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিদ্যুৎ বিভাগও বড় বরাদ্দ পাচ্ছে।
এ ছাড়া খাতভিত্তিক বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত। এ খাতে মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ৯২ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ শিক্ষা খাতে ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা বা ১৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ ৩২ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা এবং গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, থোক বরাদ্দ রাখা হয় মূলত বিশেষ প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য। বিগত সময়েও বিশেষ প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে বরাদ্দ রাখা হতো। তবে শেষ পর্যন্ত সেটির অপব্যবহার হতে দেখা গেছে। বিশেষত এমপি-মন্ত্রীরা নিজেদের খুশিমতো থোক বরাদ্দ থেকে ব্যবহার করেছেন এবং আমলারা বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। এখন এতবড় থোক বরাদ্দ রাখার মানে হচ্ছে পরিকল্পনার অদক্ষতা। অন্যদিকে এর আগের কোনো এডিপিতে এত বড় থোক বরাদ্দ ছিল না বলেও জানা গেছে।
এই বিষয়ে কমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, বিশেষ প্রয়োজনে এত বড় অঙ্কের টাকার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। এবারই প্রথম এত বেশি টাকা থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হচ্ছে। এটি শুধু সরকারের বাজেটটাকে বড় করে দেখায়। অন্যদিকে গেল কয়েক বছর ধরে সরকার উন্নয়ন বাজেটে থোক বরাদ্দ না রাখার পরামর্শ দিয়ে আসলেও অর্থবিভাগ থেকে প্রতিবারই থোক বরাদ্দের বাজেট রাখা হয়। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবে ব্যয় করা যায় না এসব থোক বরাদ্দ। এ কারণে অনেক সময় থোক বরাদ্দের অর্থ অপচয় হয়।
তবে বিশাল এই এডিপি বাস্তবায়নের জন্য কিছু কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে অন্যতম- মধ্যমেয়াদি সম্পদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রকল্প গ্রহণ, বৃহৎ প্রকল্পের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রকল্প বাস্তবায়ন মনিটরিং জোরদার ও প্রকল্প ঋণের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্প পরিচালকদের দক্ষতা উন্নয়ন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ এবং বাজেট বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার সুপারিশ করা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার হয়েছে মাত্র ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। জিওবি অর্থায়নে বাস্তবায়ন হার ৩৩ শতাংশের সামান্য বেশি এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের ব্যবহার হয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। অথচ এই বাস্তবতায় আগামী অর্থবছরে আরও বড় উন্নয়ন বাজেট নেওয়া হচ্ছে। যা নিয়ে শঙ্কার শেষ নেই সংশ্লিষ্টজনদের।
সময়ের আলো/আআ