যে কারণে সরকার সংবিধান সংশোধন করতে চায়

রফিকুল ইসলাম সবুজ

জাতীয়

সংবিধান ‘সংস্কার’ নাকি ‘সংশোধন’ শব্দের এই পার্থক্য এখন দেশের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কে পরিণত হয়েছে। সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রস্তাবিত বিশেষ

2026-05-10T03:22:29+00:00
2026-05-10T03:22:39+00:00
 
  শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
যে কারণে সরকার সংবিধান সংশোধন করতে চায়
রফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: রোববার, ১০ মে, ২০২৬, ৩:২২ এএম  আপডেট: ১০.০৫.২০২৬ ৩:২২ এএম
জাতীয় সংসদ ভবন। ছবি : সংগৃহীত
সংবিধান ‘সংস্কার’ নাকি ‘সংশোধন’ শব্দের এই পার্থক্য এখন দেশের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কে পরিণত হয়েছে। সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রস্তাবিত বিশেষ সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দল নাম না দেওয়ায় এ নিয়ে রাজনৈতিক জটিলতা আরও বেড়েছে। 

সংসদে আইনমন্ত্রী ১৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়ে এতে সরকারি জোটের ১২ জন এবং বিরোধী জোটের জন্য ৫ সদস্যের নাম আহ্বান করলেও বিরোধী দল নাম না দেওয়ায় কমিটি গঠন সম্ভব হয়নি। ফলে সংসদে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধী দলের মতপার্থক্য এখন প্রকাশ্য রাজনৈতিক টানাপোড়েনে রূপ নিয়েছে।

সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, মৌলিক কাঠামো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রেখে সময়োপযোগী পরিবর্তন আনা হবে। এ কারণে সরকার সংবিধান সংস্কারের বদলে সংশোধনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী বাজেট অধিবেশনে যদি বিরোধী দল প্রস্তাবিত সংবিধান সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে নাম না দেয় তা হলে তাদের কমিটির বাইরে রেখেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেবে সরকার।

তবে বিরোধী দল মনে করে বাহাত্তরের সংবিধানটি একটি ‘ফ্যাসিস্ট ও মুজিববাদী’ দলিল, তাই এর আমূল ‘সংস্কার’ প্রয়োজন। তাদের দাবি বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে জনগণের মধ্যে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, সেখানে কেবল আংশিক সংশোধন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। তাই গণভোটের রায় মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে অনঢ় রয়েছে তারা। বিরোধী দলের অভিযোগ সরকার রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী ‘সংশোধন’ শব্দ ব্যবহার করে প্রকৃত পরিবর্তন এড়িয়ে যেতে চাইছে।

সংসদ সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সরকার মূলত সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের আওতায় থেকেই সংবিধান সংশোধনের চিন্তা করছে। কারণ এই অনুচ্ছেদে সংশোধনের স্পষ্ট বিধান রয়েছে। সংবিধানে ‘সংস্কার’ বলে কোনো শব্দ নেই।

সরকারের ধারণা, ‘সংস্কার’ শব্দটি রাজনৈতিকভাবে অনেক বিস্তৃত এবং এতে নতুন সাংবিধানিক কাঠামো তৈরির প্রশ্নও চলে আসে, যা অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি করতে পারে। এ কারণেই সরকারি দল গণভোটের আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করেনি। ফলে এই পরিষদ গঠনের বিষয়টি এখন তামাদি হয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে সাংবিধানিক সংস্কারের নামে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের সতর্ক করেছে। নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার উদাহরণ টেনে সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, বড় ধরনের সাংবিধানিক পুনর্বিন্যাস প্রায়ই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করে। সরকারের ধারণা, সংস্কার শব্দটি ব্যবহার করা হলে প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘিরে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত বাড়তে পারে। তাই ‘সংশোধন’ শব্দটিকেই নিরাপদ মনে করছে সরকার। 

সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রস্তাবিত বিশেষ সংসদীয় কমিটিকে কেন্দ্র করেও বিরোধ তৈরি হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত সংসদ অধিবেশনে আইনমন্ত্রী ১৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। এতে সরকারি জোটের ১২ জন এবং বিরোধী দলের জন্য ৫ জন সদস্যের নাম চাওয়া হয়। কিন্তু বিরোধী দল সমান প্রতিনিধিত্ব দাবি করে। তাদের যুক্তি, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে কমিটি হলে সরকারি দলের মতই শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পাবে। ফলে সংবিধান ‘সংস্কার’ নাকি ‘সংশোধন’ এই বিতর্ক এবং কমিটিতে সমান সংখ্যক সদস্য ইস্যুতে আটকে আছে বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের অগ্রগতি। সহসা এই জট খোলার কোনো সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না।

তবে সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দল কোনো সদস্য দেবে না বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন দলটির সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।

তিনি বলেন, এই কমিটির সঙ্গে তারা নীতিগতভাবে একমত নন। যে বিষয়ে তারা একমত নন সেখানে সদস্য দেওয়ার কোনো সুযোগই নেই।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে অতীতেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে অনেক কিছুই করা হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত টেকেনি। এবারও যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কিছু করা হয়, সে ক্ষেত্রে তাই হবে।

এ বিষয়ে বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, জাতীয় সংসদে সংবিধান সংস্কারের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যদের নামের অপেক্ষায় রয়েছে সরকার। যেহেতু বর্তমানে সংসদের অধিবেশন চলছে না এবং তারা এখনও কোনো নাম দেয়নি, তাই আমাদের আগামী সংসদ অধিবেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করে দেখতে হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী কয়েক মাসে এই বিতর্কই জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। কারণ নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদের কার্যকারিতা, ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও মৌলিক অধিকার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে আগামী বাজেট অধিবেশনে সংবিধানের ইস্যুটি নিয়ে সংসদ আবারও উত্তপ্ত হতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক গোলাম হাফিজ বলেন, সংবিধান সংস্কার ইস্যুটি নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক আপাতত সমাধান হচ্ছে না। সংসদের পরবর্তী অধিবেশনের দিকে সবাই দৃষ্টি রাখছে। বিরোধী দল শেষ পর্যন্ত বিশেষ কমিটিতে তাদের পাঁচজন সদস্যের নাম জমা দেবে, নাকি রাজপথ বেছে নেবে তার ওপর নির্ভর করছে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে। 

অন্যদিকে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে একাই সংবিধান সংশোধন করে ফেলবে, নাকি বিরোধীদের সঙ্গে সম্মানজনক ঐকমত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে তাও দেখার বিষয়। ফলে এই ইস্যুতে সংসদ ও রাজপথে উত্তাপ ছড়াবে বলেও মনে করেন তিনি।

বিরোধী দলনেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকার একদিকে পরিবর্তনের কথা বলছে, অন্যদিকে ‘সংস্কার’ শব্দটিকেই ভয় পাচ্ছে। বাস্তবে জনগণ বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, সংসদ ও প্রশাসনিক কাঠামোয় কার্যকর পরিবর্তন চায়। তার মতে, শুধু কয়েকটি ধারা সংশোধন করে সমস্যার সমাধান হবে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে সংবিধানের আমূল সংস্কার প্রয়োজন। বাহাত্তরের সংবিধানকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের শুরু। ফলে শুধু কিছু অনুচ্ছেদ সংশোধন নয়, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আমাদের সংবিধান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত। এটিকে নতুন করে লেখা বা সংস্কারের কোনো প্রশ্ন নেই। সময়ের প্রয়োজনে সংশোধন হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র অপরিবর্তিত থাকবে। সংবিধানে যেসব বিষয় বাস্তবতার নিরিখে পরিমার্জনের প্রয়োজন হবে, তা সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই করা হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের ভিত্তিগত কাঠামো পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগ সরকার নেবে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রশ্নে সরকার অত্যন্ত সতর্ক। সংবিধানকে ঘিরে এমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে না যাতে বিভ্রান্তি বা অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। তার মতে, সংশোধন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ। কিন্তু সংস্কারের নামে যদি পুরো ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয় তা হলে জনগণের মধ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হতে পারে।

তিনি বলেন, আমাদের সংবিধান কেবল একটি আইনগত দলিল নয়; এটি মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক ভিত্তির প্রতিফলন। ফলে ‘সংস্কার’ শব্দ ব্যবহার করলে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে পুরো রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্বিন্যাস করা হবে। সরকার সেই পথে যেতে চায় না। তাই রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রেখেই প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে।

সময়ের আলো/আআ
  বিষয়:   সরকার  সংবিধান  সংশোধন  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: