এমনিতেই দেশের ব্যাংক খাতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা নেই বললেই চলে। এর মধ্যে নতুন করে ১০টি ব্যাংকের জেড ক্যাটাগরিতে অবনমন হওয়ায় এবার পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় গত সপ্তাহে ব্যাংক খাতের শেয়ারদর ছিল তলানিতে। সপ্তাহ শেষে বাজার বিশ্লেষণে এমন তথ্যই উঠে আসে।
বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত সপ্তাহে কার্যদিবসের প্রথম দিনেই একসঙ্গে ১০টি ব্যাংক জেড ক্যাটাগরিতে নেমে যায়। এগুলো হলোÑ এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, ইউসিবি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ও এনআরবিসি ব্যাংক। এই ঘটনায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়ে সরাসরি প্রভাব পড়েছে শেয়ারদরে।
সপ্তাহজুড়েই একের পর এক কমেছে ব্যাংক খাতের শেয়ারদর। মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে সবচেয়ে বেশি দর কমা শীর্ষ ১০ কোম্পানির মধ্যে ৮টিই ব্যাংকের। এদের মধ্যে সব থেকে বেশি দাম কমেছে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের। প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম কমেছে ২০ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এ ছাড়া সিটি ব্যাংকের ১৮ দশমিক ১৮ শতাংশ, এবি ব্যাংকের ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ, ইস্টার্ন ব্যাংকের ১২ দশমিক ৭৭ শতাংশ, আইএফআইসি ব্যাংকের ১২ দশমিক ২৪ শতাংশ, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১১ দশমিক ১১ শতাংশ, ট্রাস্ট ব্যাংকের ১০ দশমিক ১১ শতাংশ এবং আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ১০ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ দাম কমেছে।
গত সপ্তাহে সব থেকে বেশি দাম কমার তালিকায় জেড ক্যাটাগরির পাঁচটি ব্যাংক রয়েছে। এগুলো হলো- এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক এবং প্রিমিয়ার ব্যাংক।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আগে থেকেই উদ্বেগ ছিল। তার ওপর গত বছর লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণে নতুন করে ১০টি ব্যাংক জেড শ্রেণিতে পড়ায় সেই উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক খাতের শেয়ার বিক্রির দিকে ঝুঁকছেন, যার প্রভাব পড়ছে দামে।
পুঁজিবাজারের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি পরপর দুই বছর লভ্যাংশ দিতে না পারলে তাকে ‘জেড’ শ্রেণিতে স্থানান্তর করা হয়। এর ফলে ওই কোম্পানির শেয়ারে মার্জিন ঋণ সুবিধা বন্ধ হয়ে যায় এবং লেনদেনেও নানা বিধিনিষেধ আরোপ হয়। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে যায় এবং শেয়ারের তারল্য সংকুচিত হয়।
বর্তমানে জেড গ্রুপে থাকা ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫টি। কারণ আগেই পাঁচটি ব্যাংক এই ক্যাটাগরিভুক্ত ছিল। এ ছাড়া একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় থাকা আরও পাঁচটি ব্যাংকের লেনদেন বন্ধ রয়েছে। একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংকগুলো ছাড়া বর্তমানে ব্যাংক খাতে ৪৮ দশমিক ৩৯ শতাংশই জেড ক্যাটাগরিভুক্ত। অপরদিকে একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংকগুলো হিসাবে নিলে জেড ক্যাটাগরিভুক্ত ব্যাংকের হার দাঁড়াবে ৫৫ দশমিক ৫৬ শতাংশে। এত বেশি সংখ্যক ব্যাংক এর আগে কখনোই জেড ক্যাটাগরিভুক্ত ছিল না।
বর্তমানে ১৩টি ব্যাংকের শেয়ারদাম অভিহিত মূল্যের নিচে তথা ১০ টাকার নিচে অবস্থান করছে। একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া থাকা পাঁচ কোম্পানি হিসাবে নিলে এই সংখ্যা হবে ১৮টি। অর্থাৎ শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক কোম্পানিগুলোর ৫০ শতাংশের শেয়ার দাম অভিহিত মূল্যের নিচে অবস্থান করছে।
ব্যাংক খাতের এমন খারাপ সময়ের মধ্যে কয়েকটি ব্যাংক গত বছর রেকর্ড মুনাফাও করেছে এবং ভালো লভ্যাংশ দিয়েছে। বিশেষ করে ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংক শক্তিশালী আর্থিক অবস্থানের কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু দুর্বল ব্যাংকগুলোর অবস্থা পুরো খাতকে চাপে ফেলছে।
ডিএসইর এক সদস্য বলেন, গত সপ্তাহে দাম কমার শীর্ষ তালিকায় থাকা একাধিক ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ভালো অবস্থায় রয়েছে। তবে এক ধাক্কায় ১০টি ব্যাংক জেড গ্রুপে চলে আসায় সার্বিক ব্যাংক খাতের শেয়ারের ওপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ শেয়ার বিক্রির প্রবণতা বাড়িয়ে দিয়েছেন। যে কারণে শেয়ার দাম কমেছে। আর ব্যাংকের শেয়ার দাম কমায় সার্বিক বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক আল-আমিনের মতে, ব্যাংকের শেয়ারদর পতনের কোনো প্রভাব সার্বিক বাজারের ওপর পড়বে না। তিনি বলেন, যারা সত্যিকারভাবে পুঁজিবাজার বুঝে তাদের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ তারা লভ্যাংশ ঘোষণা দেখে শেয়ার কেনে না। যারা শুধু লভ্যাংশ ঘোষণা দেখে শেয়ার ক্রয় করে স্বল্প সময়ের জন্য তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, যেসব কোম্পানি লভ্যাংশ দিতে পারেনি তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার আলোকেই দিতে পারেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা হলো যাদের নন-পারফর্মিং লোন ১০ শতাংশে ওপরে তারা লভ্যাংশ দিতে পারবে না। অপরদিকে পুঁজিবাজারের নিয়ম হলো যারা লভ্যাংশ দিতে পারবে না তারা জেড ক্যাটাগরিতে চলে যাবে। তাই ওইসব ব্যাংকের জেড ক্যাটাগরিতে যাওয়া স্বাভাবিকই ছিল।
সময়ের আলো/আআ