‘আমার পুলিশ, আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’- এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে উৎসবমুখর পরিবেশে শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬’।
গতকাল রোববার সকালে বার্ষিক পুলিশ প্যারেড পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে এই বর্ণাঢ্য কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সকাল ৮টা ৫৬ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির এবং প্যারেড কমিটির সভাপতি অতিরিক্ত আইজিপি একেএম আওলাদ হোসেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী লাল-সবুজ রঙের খোলা জিপে চড়ে পুলিশের বিভিন্ন কন্টিনজেন্ট ও পতাকাবাহী দলের সুশৃঙ্খল ও দৃষ্টিনন্দন প্যারেড পরিদর্শন করেন এবং অভিবাদন গ্রহণ করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য এবং ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এবারের প্যারেডে অধিনায়ক হিসেবে নেতৃত্ব দেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ-উত্তর) হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার।
পরে রাজারবাগ পুলিশ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ‘প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ কল্যাণ সভা’। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য রাখেন আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে খুলনা মহানগর পুলিশের কনস্টেবল তুফানা ইমরান, ডিএমপির এয়ারপোর্ট থানার ওসি কামরুল হাসান তালুকদার, চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল এবং সিটি এসবির মীর আশরাফ আলী বিভিন্ন দাবি-দাওয়া উত্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের বক্তব্য ধৈর্যসহকারে শোনেন এবং বিষয়গুলো বিবেচনার আশ্বাস দেন।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, পুলিশের পক্ষ থেকে সুদমুক্ত মোটরসাইকেল ঋণ, মামলার তদন্ত ব্যয় বৃদ্ধি, অনারারি পদোন্নতিসহ বেশ কয়েকটি দাবি তুলে ধরা হয়।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রীর সামনে তারা সব বিষয়ে বিস্তারিতভাবে কথা বলতে পারেননি। এ জন্য পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে পৃথক বৈঠকের সময় চাওয়া হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন দাবি ও সমস্যার বিষয় তুলে ধরা হবে।
তারা বলেন, বর্তমান সরকার সদ্য রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেছে। তাই এমন কোনো দাবি করা হবে না, যা অযৌক্তিক কিংবা নতুন সরকারের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
পুলিশ কর্মকর্তারা আরও বলেন, অতীতে বিভিন্নভাবে পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করা হয়েছে। সেই নেতিবাচক ভাবমূর্তি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে পুলিশ।
সাধারণ মানুষও এখন এ বাহিনীকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে শুরু করেছে। দায়িত্বশীল ও পেশাদার আচরণের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করা গেলে সরকারও পুলিশ সদস্যদের যৌক্তিক দাবি পূরণে আন্তরিক হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বর্তমানে অনেক পুলিশ কনস্টেবল ৪০ বছরের পদোন্নতি পান না। এ অবস্থাতেই তাদের অবশেষে যেতে হয়।
এ কারণে বিশেষ নীতিমালা ও সন্তোষজনক চাকরির রেকর্ডের ভিত্তিতে অবসরের সময় কিছুসংখ্যক পুলিশ সদস্যকে কনস্টেবল থেকে অনারারি সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই), সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) থেকে অনারারি উপ-পরিদর্শক (এসআই) এবং উপ-পরিদর্শক (এসআই) থেকে অনারারি পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) পদে পদোন্নতি দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীকে জনকল্যাণমুখী ও আধুনিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো পর্যায়ক্রমে পূরণ করা হবে।
পুলিশিং কার্যক্রম আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টায় দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের জন্য বিশেষ নীতিমালার আওতায় ওভারটাইম ভাতা চালুর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইজিপি থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত সব পর্যায়ের সদস্য অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও অতিরিক্ত কর্মচাপের কারণে পুলিশ সদস্যদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালগুলোকে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে উন্নত হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের ভবন ও কার্যালয় নির্মাণ এবং আবাসন সংকট নিরসনে সরকার আন্তরিক। এ লক্ষ্যে ভূমি অধিগ্রহণসহ প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।
গত দুই মাসে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতি আরও উন্নত করতে চিহ্নিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে অপরাধের ধরন ও মাত্রাও পরিবর্তিত হয়েছে। তাই আধুনিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা ছাড়া অপরাধ দমনে কাক্সিক্ষত সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, জুয়া, অনলাইন জুয়া, সাইবার ক্রাইম ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে ইতিমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নতুন আইন প্রণয়ন করা হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মব কালচার’ পুরোপুরি বন্ধে বিদ্যমান আইন সংশোধন ও প্রয়োজনীয় সংযোজনের মাধ্যমে তা যুগোপযোগী করা হবে। একই সঙ্গে তিনি পুলিশ বাহিনীকে জনপ্রত্যাশা ও জনআকাক্সক্ষা অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন।
উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর বিএনপি সরকারের আমলে এটিই প্রথম ‘পুলিশ সপ্তাহ’।
/এসএকে