ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্যদের জন্য নির্ধারিত এমপি হোস্টেল (ন্যাম ফ্ল্যাট) বরাদ্দের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। মানিকমিয়া অ্যাভিনিউ ও নাখালপাড়ায় ২৬৫টি ফ্ল্যাটের মধ্যে প্রায় ২১৫টি ফ্ল্যাট এমপিদের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সংরক্ষিত নারী আসনে সম্প্রতি নির্বাচিত ৫০ জন এমপির নামে বরাদ্দ প্রক্রিয়াটি শুধু বাকি রয়েছে।
জাতীয় সংসদের হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান সময়ের আলোকে বলেন, ইতিমধ্যে সিংহভাগ সংসদ সদস্যের নামে ফ্ল্যাট বরাদ্দ চূড়ান্ত হয়েছে এবং অনেকে বসবাস শুরু করেছেন। তিনি জানান, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অধিকাংশ ফ্ল্যাটের সংস্কারকাজ শেষ হলেও নাখালপাড়ার ফ্ল্যাটের কাজ এখনও শেষ না হওয়ায় এখনই সবাই উঠতে পারছেন না। তবে আগামী ৭ জুন বাজেট অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই বরাদ্দ পাওয়া সংসদ সদস্যরা তাদের জন্য নির্ধারিত ফ্ল্যাটে উঠতে পারবেন।
হুইপ আশরাফ উদ্দিন নিজান জানান, যারা সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কিংবা যারা ইতিমধ্যে সরকারি বাংলো বরাদ্দ নিয়েছেন, তারা বাদে সাধারণ আসনের অধিকাংশ সংসদ সদস্যের নামে ফ্ল্যাট বরাদ্দ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে শুধু সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়াটি বাকি রয়েছে। তবে আবেদনকারী সব নারী সংসদ সদস্যই এমমি হোস্টেলে ফ্ল্যাট বরাদ্দ পাবেন বলে জানান তিনি।
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দকৃত ৬টি ভবনে ২১৬টি ফ্ল্যাট রয়েছে। এর মধ্যে মধ্যে তিনটি ভবনে ১২০০ বর্গফুটের ১০৮টি ফ্ল্যাট রয়েছে। অবশিষ্ট ৩টি ভবনের ১০৮টি ফ্ল্যাট রয়েছে ১৬৫০ বর্গফুটের। সংসদ সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ১৬৫০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটগুলোর। নাখালপাড়ায় আরও ৪৯টি ফ্ল্যাট থাকলেও সেগুলোতে থাকতে আগ্রহী নন এমপিরা।
সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, নতুন নির্বাচিত এমপি এবং যাদের ঢাকায় নিজস্ব কোনো বাড়ি নেই, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে ফ্ল্যাট বরাদ্দের ক্ষেত্রে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অবস্থিত ন্যাম ভবনগুলোর সংস্কারকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং সেখানে ইতিমধ্যে অনেক সংসদ সদস্য উঠে গেছেন। তবে নাখালপাড়া এমপি হোস্টেলের সংস্কারকাজ এখনও চলমান। বিশেষ করে নাখালপাড়া ন্যাম ফ্ল্যাটের পুরোনো পাইপলাইন পরিবর্তন, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ এবং লিফট সংস্কারের কাজ শেষ করতে অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন হচ্ছে। এ ছাড়া অনেক কক্ষের পুরোনো আসবাবপত্র সরিয়ে নতুন করে সাজানো এবং পর্দা লাগানোর মতো ফিনিশিং কাজও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। গণপূর্ত বিভাগ এবার সংসদ সদস্যদের আবাসনে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ওপর জোর দিয়েছে। প্রতিটি ফ্ল্যাটে নতুন এয়ার কন্ডিশনার, আধুনিক কিচেনব্যবস্থা এবং উন্নত ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে প্রথমবারের মতো বসানো হয়েছে ডিজিটাল স্ক্যানিং ব্যবস্থা ও স্মার্ট অ্যাক্সেস সিস্টেম, যেখানে নির্ধারিত কার্ড ছাড়া বহিরাগত কেউ ভবনে প্রবেশ করতে পারবেন না। এ ছাড়া পুরো এলাকা নতুন সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে।
গণপূর্ত বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাম ভবন ও এমপি হোস্টেলের বেশিরভাগ ফ্ল্যাটে নতুন খাট, সোফা, ডাইনিং টেবিল, আলমারি, পর্দা ও রান্নাঘরে সরঞ্জাম সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি আবাসন এলাকায় নতুন সিসি ক্যামেরা, ডিজিটাল স্ক্যানিং ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তাসদস্য বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানান, অতীতের নানা অনিয়ম ও বহিরাগতদের বসবাসের অভিযোগ মাথায় রেখে এবার সংসদ কমিটি কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী এমপিদের জন্য বরাদ্দকৃত ফ্ল্যাট এমপি ও তাদের নিকটাত্মীয়রা ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি ব্যবহার করতে পারবেন না। ফ্ল্যাট ব্যবহার, নিরাপত্তা এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলাদা নির্দেশনাও প্রস্তুত করা হয়েছে। গণপূর্ত বিভাগ জানিয়েছে, ঈদুল আজহার আগেই অধিকাংশ ফ্ল্যাট পুরোপুরি বসবাসের উপযোগী করে হস্তান্তর করা হবে।
জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও গণপূর্ত বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচনের পরপরই এমপিদের আবাসন হিসেবে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর ২১৬টি এবং নাখালপাড়ার ৪৯টিসহ মোট ২৬৫টি ফ্ল্যাটে সংস্কারকাজ শুরু হয়। তবে পুরোনো ভবনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, বৈদ্যুতিক লাইন সংস্কার, লিফট মেরামত, পানির সংযোগ পুনর্বিন্যাস এবং আসবাবপত্র সরবরাহে বিলম্বের কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফ্ল্যাট হস্তান্তর সম্ভব হয়নি। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর এসব ফ্ল্যাটের অধিকাংশ আসবাবপত্র ভেঙে ফেলা ও লুটপাট করে নেওয়া হয়। পরে সংসদ কমিটির নির্দেশনার পর কাজের গতি বাড়ানো হয়। বর্তমানে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের ন্যাম ভবনের অধিকাংশ ব্লকে সংস্কারকাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। বেশ কয়েকটি ফ্ল্যাটে রং করা, নতুন বৈদ্যুতিক সংযোগ স্থাপন, এয়ারকন্ডিশনার বসানো এবং আসবাবপত্র স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে নাখালপাড়ার এমপি হোস্টেলের কিছু অংশে এখনও পর্দা লাগানো, পাইপলাইন পরিবর্তন এবং অভ্যন্তরীণ ফিনিশিংয়ের কাজ চলছে।
হুইপ আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, সদ্য নির্বাচিত সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের জন্য ফ্ল্যাট বরাদ্দ প্রক্রিয়াটিও চলমান। সবাইকে আবাসনের আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের আবাসন শুধু থাকার জায়গা নয়, এটি সংসদীয় কার্যক্রমের অংশ। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করতে বলা হয়েছে।