জোটগত সমঝোতার আভাস এনসিপির, সক্ষমতা যাচাই করবে জামায়াত

অলিউল ইসলাম

রাজনীতি

স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অবস্থানে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এনসিপি আসন্ন নির্বাচনে

2026-05-13T01:17:38+00:00
2026-05-13T01:17:38+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
রাজনীতি
জোটগত সমঝোতার আভাস এনসিপির, সক্ষমতা যাচাই করবে জামায়াত
অলিউল ইসলাম
প্রকাশ: বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬, ১:১৭ এএম 
প্রতীকী ছবি
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অবস্থানে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এনসিপি আসন্ন নির্বাচনে নিজস্ব প্রার্থী ঘোষণা করে পরে জোটগত সমঝোতার ইঙ্গিত দিলেও জামায়াত বলছে, তারা এখন দলীয় সক্ষমতা যাচাই করতে চায়। 

এ নিয়ে দুই দলের ভিন্ন অবস্থান যেমন রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বলে মনে করা হচ্ছে, তেমনি স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণার মাধ্যমে প্রভাবিত করা আইনসংগত কি না, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিশেষজ্ঞরা।

দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিন-তারিখ এখনও ঘোষণা করা হয়নি। সরকারি দল বিএনপি ও সমমনা জোট এ নিয়ে সক্রিয় না হলেও তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে ১১ দলীয় জোটের জামায়াত-এনসিপির মধ্যে।

ইতিমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনে এনসিপির প্রার্থী হিসেবে দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদের ঘোষণা করেছে। 

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) তাদের যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া সব সিটিতেই নিজেদের সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা করেছে এনসিপি।

এর বাইরে ১০০ উপজেলা ও পৌরসভায় প্রার্থী ঘোষণা করেছে এনসিপি। আগামী ২০ মে দ্বিতীয় ধাপে আবারও ১০০ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে। এই নাম ঘোষণা প্রক্রিয়া চলতে থাকবে বলে জানিয়েছে দলটি।

এনসিপি সূত্র জানিয়েছে, দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ এবং চট্টগ্রামকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

গাজীপুরে এক লাখের বেশি ভোট পাওয়া, নারায়ণগঞ্জে সাফল্য এবং চট্টগ্রামে নতুন সমীকরণ তৈরির চেষ্টা সব মিলিয়ে মাঠে সক্রিয় দলটি।

একক নির্বাচনের ঘোষণা থাকলেও স্থানীয় রাজনীতির বাস্তবতায়, বিশেষ করে সিটি করপোরেশন ও হেভিওয়েট পৌরসভা-উপজেলাগুলোতে শেষ পর্যন্ত জোটের সমঝোতার প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন এনসিপির নেতারা। 

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার সময়ের আলোকে বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে জোটের সমন্বয় পরে হবে। আগে আমরা আমাদের প্রার্থী দেব। পরে নির্বাচনের আগে সমঝোতা হতে পারে।

জাতীয় নির্বাচনও এভাবে হয়েছে বলে জানিয়েছেন তুষার। তিনি বলেন, এখন আমরা আমাদের প্রার্থী দিচ্ছি। জাতীয় নির্বাচনে এভাবেই হয়েছে। আমরা আগে আমাদের প্রার্থী দেব। তারপর জোটের সঙ্গে সমন্বয় যখন হবে তখন হবে।

স্থানীয় নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশ নেওয়ার বিষয়ে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বলেন, জাতীয় নির্বাচনে আমরা ১১টি দল নিয়ে একসঙ্গে অংশ নিয়েছিলাম। সেই নির্বাচনি জোট বর্তমানে জাতীয় সংসদে বিরোধী জোট হিসেবে কাজ করছে। 

তবে স্থানীয় নির্বাচনে আমরা এককভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছি। কারণ উপজেলা বা পৌরসভা পর্যায়ের মতো স্থানীয় নির্বাচনে ১১টি দল একমত হয়ে একজন প্রার্থী নির্ধারণ করা বেশ জটিল হয়ে যায়। জোটগতভাবে অংশ নেওয়ার বিষয়টি হলে তা নির্বাচনের আগে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে ১১ দলীয় জোটের নেতৃত্ব দেওয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা না করলেও দলটির অভ্যন্তরে প্রস্তুতি কম নয়। ডিএসসিসির নির্বাচনে দলটি থেকে ডাকসু ভিপি ও ছাত্রশিবিরের নেতা সাদিক কায়েমের প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। 

ঢাকা মহানগর দক্ষিণের জামায়াতের এক সম্মেলনে তার নাম প্রস্তাব হওয়ার পরপরই তৃণমূল পর্যায়ে তাকে সামনে রেখে সংগঠনের কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ডিএনসিসির নির্বাচনে জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন জামায়াতের উত্তরের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। 

দলীয়ভাবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও তাকে কেন্দ্র করে প্রস্তুতি এগোচ্ছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া সব সিটিতেই নিজেদের সম্ভাব্য প্রার্থীকে সামনে আনছে দলটি। সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেন্দ্র করে নিজেদের শক্তি ও প্রভাব পরিমাপ করতে চায় জামায়াত।

দলটির নেতারা বলছেন, স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না। ফলে এটি ব্যক্তি সক্ষমতা ও স্থানীয় প্রভাবের ভিত্তিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র। তাদের মতে, এখানে জোটগত সমীকরণ সবসময় প্রযোজ্য হয় না। 

এলাকাভিত্তিক প্রভাব, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সক্ষমতা এখানে বেশি কাজ করে। এমনকি একই পরিবারের সদস্যরাও ভিন্ন পক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। তাই স্থানীয় নির্বাচন ব্যক্তি সক্ষমতার ভিত্তিতেই হওয়া উচিত বলে মনে করছেন তারা।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম সময়ের আলোকে বলেন, প্রত্যেক দল নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রার্থী দেওয়ার চেষ্টা করবে। নির্বাচন নিয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। 

এনসিপি তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে, আমরাও আমাদের প্রার্থী বাছাই ও প্রস্তুতির কাজ করছি। আপাতত আমরা দলের সার্বিক প্রস্তুতির দিকে গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রতিটি স্থানে সংগঠিতভাবে অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি চলছে।

তিনি বলেন, দলগুলোর তো সক্রিয় ও প্রাণবন্ত থাকা দরকার, তাই না? সবার ক্ষেত্রেই সেই সজীবতা জরুরি। আমরা একটি দল, এনসিপি একটি দল, আরও দল আছে। স্থানীয় নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে অংশ নেওয়ার নজির খুব বেশি নেই।

আলাদা আলাদা প্রার্থী দিলে বিরোধী শিবির সুবিধা পাবে কি না প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে এ ধরনের সুবিধা-অসুবিধার বিষয়টি আগের মতো প্রযোজ্য নয়। 

কারণ এখন স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না। আগে দলীয় মার্কায় নির্বাচন হতো এবং তখন দলীয় পরিচয় বড় ভূমিকা রাখত। বর্তমানে সাধারণ প্রতীকে নির্বাচন হয়। 

ফলে দেখা যায়, কেউ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকেও অন্য প্রতীকে নির্বাচন করছেন, আবার জামায়াতের কেউ ভিন্ন প্রতীক পাচ্ছেন। এটি আগের পরিস্থিতি থেকে ভিন্ন বলে মনে করছেন তিনি।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সময়ের আলোকে বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে জোটগত করার বিষয়ে ভাবনা এখন পর্যন্ত আলাদা।

দলের পক্ষ থেকে নির্দেশনা রয়েছে, প্রতিটি দল নিজ নিজ প্রস্তুতি নেবে এবং প্রয়োজনে আলাদাভাবে প্রার্থী ঘোষণা করবে। তিনি বলেন, স্থানীয় নির্বাচন স্বাভাবিকভাবেই পৃথকভাবে অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানেও প্রতিটি দল নিজ নিজ ব্যানার থেকে অংশ নেবে।

বিরোধী শিবির এতে কোনো বিশেষ সুবিধা পাবে কি না প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেহেতু এটি স্থানীয় নির্বাচন, তাই এটি সরকার গঠনের বিষয় নয়। সে কারণে স্থানীয় নির্বাচনকে সব পক্ষের অংশগ্রহণের মাধ্যমেই সম্পন্ন করার বিষয়টিকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এটাই মূল ধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গি।

দলীয় প্রার্থী ঘোষণা ও স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় রং দেওয়ার বিষয়টি আইনবিরোধী বলে মত দিয়েছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। 

তাদের মতে, প্রচলিত বিধান অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হওয়ার কথা এবং এ বিষয়ে সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশও জারি হয়েছে। তাই আইন প্রণয়ন করে সেই আইন অমান্য করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন তারা।

স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর ঘোষণার বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সময়ের আলোকে বলেন, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এ সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অনাকাক্সিক্ষত এবং আইনবিরোধী। 

তার মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হওয়ার বিধান রয়েছে এবং সম্প্র্রতি এ বিষয়ে অধ্যাদেশও জারি হয়েছে। আইন করে আবার সেই আইন ভঙ্গ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমি আশা করি তারা এ অবস্থান থেকে সরে আসবে।

তিনি আরও বলেন, দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন হলে রাজনৈতিক বিভাজন বাড়ে এবং প্রতিযোগিতা তীব্র সংঘাতে রূপ নিতে পারে। এতে সমাজে পারস্পরিক বিরোধ ও উত্তেজনা তৈরি হয়, যা বৃহত্তর পরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। 

তাই দেশের বৃহত্তর স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত দলীয় প্রতীকে নির্বাচন থেকে সরে এসে আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করা। আগে দলীয় প্রার্থী না থাকলেও অনেক সময় দলের সমর্থন বা আশীর্বাদপুষ্ট প্রার্থী থাকত। 

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের প্রথাও কাম্য নয়। এ বিষয়ে জনমত তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলন করার কথাও জানান তিনি। এনসিপির সংবাদ সম্মেলন করে প্রার্থী ঘোষণাকে তিনি বুদ্ধিমানের সিদ্ধান্ত মনে করেন না এবং বিষয়টিকে দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন।

/এসএকে


  বিষয়:   জোট  সমঝোতা  এনসিপি  জামায়াত  রাজনীতি 


Loading...
Loading...
রাজনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: