রাজধানী ঢাকার সড়কে ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবার প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারিতে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সড়কে নিয়ম ভাঙলেই আর ট্রাফিক পুলিশের হাতে ধরা পড়ার অপেক্ষা নয়- বরং এবার কাজ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন (এআই) স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা ব্যবস্থা।
নতুন এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা তৈরি হয়ে যাবে এবং তা সরাসরি পাঠানো হবে গাড়ির মালিকের মোবাইল ফোন ও ঠিকানায়।
প্রাথমিকভাবে ঢাকার ৮টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, আগামী ছয় মাসের মধ্যে এই সংখ্যা ৬০টি এবং এক বছরের মধ্যে ১২০টি স্থানে উন্নীত করা হবে।
গুলশান-২, বনানীসহ অভিজাত ও ব্যস্ত এলাকায় ইতোমধ্যে হাই-ডেফিনিশন ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে, যা প্রতিটি যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে।
এই ক্যামেরাগুলো সড়কে চলমান প্রতিটি গাড়ির নম্বর প্লেট শনাক্ত করতে সক্ষম। কোনো যানবাহন লাল সিগন্যাল অমান্য করলে, উল্টো পথে চললে বা নির্ধারিত নিয়ম ভাঙলে মুহূর্তেই তা রেকর্ড হয়ে যায়।
আরও পড়ুন
এরপর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-র ডাটাবেজ থেকে মালিকের তথ্য সংগ্রহ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিজিটাল মামলা প্রস্তুত করা হয়।
ডিএমপি সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে ২ হাজারের বেশি ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে এবং ৪০০-এর বেশি মামলার প্রক্রিয়া চলছে। নতুন এই ব্যবস্থাকে অনেক চালক ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও কেউ কেউ শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন।
মোটরসাইকেল চালক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এখন ক্যামেরার ভয়ে হলেও মানুষ নিয়ম মানবে, এটা ভালো উদ্যোগ।’
অন্যদিকে প্রাইভেটকার চালক রাকিবুল হাসান বলেন, ‘ডাটাবেজে ভুল থাকলে নির্দোষ মানুষও জরিমানার মুখে পড়তে পারে- এটাই বড় ভয়।’
বাসচালক জাহিদ হোসেন জানান, ‘অনেক সময় রাস্তায় জ্যামের কারণে বাধ্য হয়ে নিয়ম ভাঙতে হয়। এখন ডিজিটাল জরিমানা হলে আমাদের আরও চাপ বাড়বে।’
ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা বলছেন, এআই ক্যামেরার কারণে তাদের কাজ কিছুটা সহজ হয়েছে। গুলশান-২ এলাকায় দায়িত্বরত এক ট্রাফিক সার্জেন্ট জানান, এখন অনেক চালক আগের তুলনায় বেশি সচেতনভাবে সিগন্যাল মানছেন।
তবে এখনো পুরোপুরি শৃঙ্খলা ফিরতে সময় লাগবে বলে মনে করছেন তারা। প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশংসা করলেও এর সীমাবদ্ধতা নিয়ে সতর্ক করেছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ঢাকার অব্যবস্থাপিত ট্রাফিক কাঠামোতে শুধু এআই ক্যামেরা দিয়ে সমস্যা সমাধান কঠিন। বিআরটিএর ডাটাবেজ দুর্বলতা ও নীতিগত ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
অন্যদিকে অধ্যাপক ড. শামসুল হক মনে করেন, সঠিক প্রচার ও সমন্বয় ছাড়া এই প্রযুক্তি পুরোপুরি কার্যকর হবে না। তিনি বলেন, ‘উন্নত দেশে এই প্রযুক্তি সফল হলেও সেখানে সিস্টেম আগে থেকেই শক্তিশালী ছিল।’
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, নতুন প্রযুক্তি চালুর শুরুতে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও ধীরে ধীরে এটি ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনবে।
তার ভাষায়, ‘আমাদের লক্ষ্য একটি আধুনিক ও শৃঙ্খলাপূর্ণ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।’
এএডি/