এআই পরিবর্তন আনলেও রয়েছে কাঠামোগত সংকট

অলিউল ইসলাম

জাতীয়

রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে এআই ক্যামেরা ও ডিমেরিট পয়েন্ট ব্যবস্থা চালুর পর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কিছুটা উন্নতি দেখা গেছে। তবে লেন

2026-05-15T00:59:59+00:00
2026-05-15T00:59:59+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
এআই পরিবর্তন আনলেও রয়েছে কাঠামোগত সংকট
অলিউল ইসলাম
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ১২:৫৯ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে এআই ক্যামেরা ও ডিমেরিট পয়েন্ট ব্যবস্থা চালুর পর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কিছুটা উন্নতি দেখা গেছে। তবে লেন ভাঙা, সিগন্যাল অমান্য ও যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামার প্রবণতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সরেজমিন এমন চিত্রই মিলেছে। 

এআই প্রযুক্তি যাবতীয় অনিয়ম শনাক্ত করে ডিজিটাল মামলার বন্দোবস্তে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও ট্রাফিক আইন অমান্য করার এই প্রবণতা বন্ধ হয়নি। বিশেষজ্ঞরা এ জন্য পরিবহন ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের তাগিদ দিয়েছেন। 

সোমবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, বাংলামোটরসহ একাধিক এলাকায় সরেজমিন দেখা যায়, ব্যক্তিগত গাড়ির চালকরা তুলনামূলকভাবে নিয়ম মানলেও গণপরিবহন ও ছোট যানবাহনের একটি অংশ নিয়ম ভঙ্গ করছে। যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা, উল্টো পথে চলাচল এবং সিগন্যাল অমান্য করার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।

দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে বাংলামোটর ক্রসিংয়ে এআই ক্যামেরা সক্রিয় থাকা সত্ত্বেও কয়েকটি মোটরসাইকেল নির্ধারিত ইউলুপ ব্যবহার না করে সরাসরি ক্রসিং অতিক্রম করে হাতিরপুলের দিকে চলে যায়। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে আরও কয়েকটি বাইক একইভাবে নিয়ম ভঙ্গ করে। ট্রাফিক সদস্যরা নিরাপত্তাজনিত কারণে সরাসরি বাধা না দিলেও ঘটনাটি পথচারীদের নজরে আসে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, এআই ক্যামেরা লালবাতি অমান্য, জেব্রা ক্রসিংয়ে গাড়ি থামানো, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, উল্টো পথে চলা, সিটবেল্ট না পরা এবং কাগজপত্রে অনিয়ম শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিজিটাল মামলা তৈরি করছে। তবু কিছু চালকের আচরণে পরিবর্তন পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি।

বাংলামোটর ক্রসিংয়ে দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক সদস্য বিভাষ সময়ের আলোকে বলেন, ক্যামেরার কারণে যান চলাচলে শৃঙ্খলা বেড়েছে। আগে যেখানে যানবাহন একাধিক দিক দিয়ে প্রবেশ করত, এখন সেই প্রবণতা কিছুটা কমেছে। তবে বাস, মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার একটি অংশ এখনও নিয়ম মানছে না।

দুপুর ১টার দিকে কারওয়ান বাজার সোনারগাঁও ক্রসিংয়ের সামনে দেখা যায়, সিগন্যাল ব্যবস্থা সক্রিয় থাকলেও যানবাহনের চাপ ছিল বেশি। ক্রসিংটিতে বাস, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের পাশাপাশি বিভিন্ন দিক থেকে আসা যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। এআই ক্যামেরা স্থাপনের পরও সেখানে ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি ছিল নিয়মিত।

দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যরা হাতের সংকেতের মাধ্যমে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। একই সঙ্গে দেখা যায়, নির্ধারিত লেন না মেনে কিছু বাস হঠাৎ থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করছে এবং কয়েকটি মোটরসাইকেল সিগন্যাল পরিবর্তনের আগেই ক্রসিং অতিক্রম করছে। ফলে সামগ্রিকভাবে যান চলাচলে কিছুটা গতি থাকলেও শৃঙ্খলার ঘাটতি স্পষ্ট ছিল।

কারওয়ান বাজার-সোনারগাঁও ক্রসিংয়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট মো. সারোয়ার সময়ের আলোকে জানান, ক্যামেরা বসানো হলেও মাঠ পর্যায়ের দায়িত্ব একইভাবে চলছে। কনস্টেবলরা এখনও সংকেত দিয়ে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছেন। 

তিনি বলেন, যানবাহন থামার প্রবণতা বেড়েছে, এটিই ইতিবাচক পরিবর্তন। তবে কিছু চালক এখনও অসচেতন। পথচারী ওয়ালিউল সাকিব বলেন, আগের তুলনায় পরিস্থিতি ভালো হয়েছে। বিশেষ করে সিগন্যাল মানার প্রবণতা বেড়েছে এবং রাতের বেলাতেও অনেকে নিয়ম অনুসরণ করছেন। তবে অটোরিকশা নিয়ে এখনও কিছু সমস্যা রয়েছে।

দুপুর ১২টার দিকে মোহাম্মদপুর আসাদগেট-সংসদ ভবন সড়কে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও একাধিক অটোরিকশা চলাচল করতে দেখা যায়। চালকদের কেউ কেউ দাবি করেন, জরুরি প্রয়োজন বা অন্য পরিস্থিতিতে তারা সড়কে প্রবেশ করেন। তবে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, এ ধরনের যানবাহনের বেপরোয়া চলাচলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ট্রাফিক সদস্য সময়ের আলোকে বলেন, আমরা অটোরিকশা প্রধান সড়কে উঠতে দিচ্ছি না। 

তবে কিছু চালক দ্রুতগতিতে প্রবেশ করলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। সে কারণে অনেক সময় পরিস্থিতি বিবেচনায় নমনীয় থাকতে হয়।

দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সড়ক পরিবহন আইন থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাণহানি বেড়েছে। একাধিক পরিসংখ্যান মতে, ২০২৪ সালে ৮ হাজার ৫৪৩ জন এবং ২০২৫ সালে ৯ হাজার ১০১ জন নিহত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন থাকলেও প্রয়োগ দুর্বল হলে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায় না।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক সময়ের আলোকে বলেন, কঠোর শাস্তির কথা বলা হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। আইন পর্যালোচনা ও প্রয়োগ জোরদার করা প্রয়োজন। একইভাবে কাঠামোগত সংস্কারের তাগিদ দিয়েছেন বুয়েট আইআরআইয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইফুন নেওয়াজও। তিনি মনে করছেন, প্রযুক্তির পাশাপাশি পরিবহন ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার দরকার। চালক প্রশিক্ষণ, ফ্লিট ব্যবস্থাপনা ও ইঞ্জিনিয়ারিং উন্নয়ন সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

এদিকে সড়কে বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ডিমেরিট পয়েন্ট পদ্ধতি চালু করেছে সরকার। বিআরটিএ জানিয়েছে, প্রতিটি লাইসেন্সে ১২ পয়েন্ট থাকবে। ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলে পয়েন্ট কাটা হবে। ১২ পয়েন্ট শেষ হলে লাইসেন্স স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে। 

পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। বিআরটিএর পরিচালক মীর আহামেদ তরিকুল ওমর সময়ের আলোকে বলেন, লাইসেন্স বাতিলের বিষয়টি চালকদের মধ্যে মানসিক সচেতনতা তৈরি করবে। এতে আইন মানার প্রবণতা বাড়তে পারে।

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে চালকদের আইনি কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। প্রযুক্তির সহায়তায় পয়েন্ট ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, রাজধানীতে প্রতিদিন গড়ে ৫০ জনের বেশি চালকের পয়েন্ট কাটা হচ্ছে। 

মোট ১৩ ধরনের অপরাধে পয়েন্ট কর্তন করা হয়। এর মধ্যে সিগন্যাল অমান্য, উল্টো পথে চলা, অতিরিক্ত গতি ও অবৈধ পার্কিং উল্লেখযোগ্য। নিয়ম মেনে চলার ক্ষেত্রে চালকদের জন্য পুনরুদ্ধারের সুযোগও রাখা হয়েছে। ছয় মাস কোনো অনিয়ম না করলে দুই পয়েন্ট ফেরত পাওয়া যায়। ধারাবাহিক ভালো আচরণে আরও পয়েন্ট পুনরুদ্ধারের সুযোগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে নিশ্চিত করা গেলে রাজধানীর সড়কে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। অন্যথায় আংশিক উন্নতি থাকলেও সমস্যার মূল জায়গা থেকেই যাবে।

/কেএইচও


  বিষয়:   এআই  কাঠামোগত সংকট  এআই ক্যামেরা  ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা  যানবাহন 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: