ফাঁকা সড়ক, নেই পুলিশ সিগন্যাল মানছে যানবাহন

এম মামুন হোসেন

জাতীয়

সকাল ৬টা। যাত্রাপথ ঢাকার ওয়ারী থেকে বনানী। উবার এক্সে করে শাহবাগে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে যখন পৌঁছালাম, তখনও শহর পুরোপুরি জেগে

2026-05-15T01:12:16+00:00
2026-05-15T01:12:16+00:00
 
  শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
ফাঁকা সড়ক, নেই পুলিশ সিগন্যাল মানছে যানবাহন
এম মামুন হোসেন
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ১:১২ এএম 
নতুন প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইভিত্তিক স্মার্ট ট্রাফিক নজরদারি ব্যবস্থা। ছবি: সংগৃহীত
সকাল ৬টা। যাত্রাপথ ঢাকার ওয়ারী থেকে বনানী। উবার এক্সে করে শাহবাগে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে যখন পৌঁছালাম, তখনও শহর পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, মোড়ে কোনো ট্রাফিক পুলিশ নেই, নেই কোনো হাঁকডাক। অথচ সিগন্যালে লাল বাতি জ্বলে উঠতেই চালক নিজে থেকেই ব্রেক কষলেন। বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকাতেই উবার ড্রাইভার হেসে বললেন, এখন আর ঝুঁকি নিই না ভাই। 

সিগন্যাল ভাঙলেই ক্যামেরায় ধরা পড়ে মামলা হয়ে যায়। কথা শেষ হতে না হতেই চোখে পড়ল, শুধু এই গাড়ি নয় পাশের আরও কয়েকটি গাড়িও একইভাবে নিয়ম মেনে দাঁড়িয়ে আছে। ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, জাহাঙ্গীর গেট পুরো পথেই একই দৃশ্য। ঢাকার রাস্তায় এমন শৃঙ্খলাপূর্ণ চলাচল কিছু দিন আগেও ছিল প্রায় অকল্পনীয়।

রাজধানীর সড়কে এই আচরণগত পরিবর্তনের পেছনে কাজ করছে নতুন প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইভিত্তিক স্মার্ট ট্রাফিক নজরদারি ব্যবস্থা। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে বসিয়েছে এআই প্রযুক্তিসম্পন্ন স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা ও সিগন্যাল ব্যবস্থা। এই ক্যামেরা ট্রাফিক আইন ভঙ্গের প্রতিটি ঘটনা শনাক্ত করে তাৎক্ষণিকভাবে ডিজিটাল মামলার প্রক্রিয়া শুরু করছে।

এদিকে ঢাকা শহরের যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন নিয়ে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সভা হয়েছে। সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জনপ্রশাসন সভাকক্ষে এ সভা হয়। সেখানে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) চালু করেছে আধুনিক এআই প্রযুক্তিসম্পন্ন স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ও স্মার্ট ক্যামেরা। এই প্রযুক্তির প্রভাবে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খল রাস্তায় এখন ফিরতে শুরু করেছে স্বস্তি ও শৃঙ্খলা। ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারা নয়, বরং ক্যামেরার ‘চোখ’ এখন নিয়ন্ত্রক। 

সাধারণ মানুষের মনেও ধীরে ধীরে এই বিশ্বাস জন্মাচ্ছে যে, নিয়ম ভাঙলে রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই। জরিমানার ভয়েই হোক কিংবা সচেতনতা থেকে রাজধানীর রাস্তায় শৃঙ্খলা ফিরলে তার সুফল পাবে কোটি নগরবাসী। তবে এই প্রযুক্তি কতটুকু টেকসই হবে এবং শহরের সব প্রান্তে সফলভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যাবে কি না, তা সময়ের বিবর্তনেই স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আপাতত ঢাকার রাস্তায় লাল বাতির সেই নীরব শাসনই বলে দিচ্ছে পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে।

ক্যামেরার চোখ এড়িয়ে আর উপায় নেই : ঢাকার সড়কে দীর্ঘদিন ধরে নিয়ম ভাঙা যেন ছিল স্বাভাবিক সংস্কৃতি। লাল বাতি অমান্য, উল্টোপথে চলাচল, স্টপ লাইন ভেঙে এগিয়ে যাওয়া, যেখানে-সেখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো- সবই ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। ট্রাফিক পুলিশকে উপেক্ষা করে দ্রুত চলে যাওয়াও ছিল অনেক চালকের অভ্যাস। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। 

শাহবাগ, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, এয়ারপোর্ট সড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বসানো ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ির নম্বরপ্লেট শনাক্ত করছে, ভিডিও ও স্থিরচিত্র সংগ্রহ করছে এবং সফটওয়্যারের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে অটো জেনারেটেড মামলা। 

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ক্যামেরা কোনো আইন ভঙ্গ শনাক্ত করলেই তা সঙ্গে সঙ্গে সার্ভারে জমা হয়। পরে বিআরটিএর নিবন্ধন তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে গাড়ির মালিকের ঠিকানায় নোটিস পাঠানো হয়। নির্ধারিত সময়ে জরিমানা পরিশোধ না করলে সমন কিংবা গ্রেফতারি পরোয়ানার মতো আইনি প্রক্রিয়াও শুরু হতে পারে।

কারওয়ান বাজার মোড়ে দায়িত্ব পালনরত এক ট্রাফিক সদস্য বলেন, আগে সিগন্যাল দিলেও অনেক গাড়ি থামত না। লাঠি নিয়ে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়াতে হতো। এখন ক্যামেরার কারণে মানুষ নিজেরাই থেমে যাচ্ছে।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানান বনানীগামী আরেক রাইডশেয়ার চালক। তার ভাষায়, আগে ভাবতাম পুলিশ না থাকলে একটু এগিয়ে গেলেই সমস্যা নেই। এখন বুঝি ক্যামেরা সব দেখছে। মামলা বাড়িতে চলে যায়। ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, এআই ক্যামেরা চালুর প্রথম চার দিনেই প্রায় ৩০০টি মামলা রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে লাল বাতি অমান্য, স্টপ লাইন অতিক্রম, উল্টোপথে চলাচল ও অবৈধ পার্কিংয়ের ঘটনাই বেশি।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আনিছুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে পাঁচ ধরনের অপরাধকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- লাল বাতি অমান্য, স্টপ লাইন ভাঙা, উল্টোপথে চলাচল, অবৈধ পার্কিং এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো-নামানো। তিনি বলেন, আইন অমান্যকারীদের তথ্য অটোমেটিকভাবে সার্ভারে জমা হচ্ছে। ফলে কোনো ঘটনা অস্বীকারের সুযোগ কমে যাচ্ছে।

ঢাকার নাগরিকদের বড় অভিযোগ ছিল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা। সড়কে বের হলেই তৈরি হতো অনিশ্চয়তা। কিন্তু নতুন প্রযুক্তিভিত্তিক নজরদারি চালুর পর ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে সেই চিত্র। শাহবাগ এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত করা এক বেসরকারি চাকরিজীবী মমীন আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, কিছুদিন আগেও সিগন্যাল মানা ছিল বিরল ঘটনা। এখন অন্তত বোঝা যাচ্ছে নিয়ম না মানলে শাস্তি নিশ্চিত। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জরিমানা নয়, ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়, মানুষের আচরণ বদলে দিতে শুরু করেছে। এআই প্রযুক্তি সেই মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করতে পেরেছে। তবে সচেতনতার ঘাটতি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও অনেক চালক এখন নিয়ম মানছেন, তবু অনেকে এখনও পুরো বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখেন না। কেউ কেউ না বুঝেই পুরোনো অভ্যাসে নিয়ম ভাঙছেন এবং পরে নোটিস পেয়ে বিস্মিত হচ্ছেন।

ডিএমপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোনো নোটিস পেলে সেটি অবহেলা করা যাবে না। নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে। অন্যথায় আইনি জটিলতা বাড়তে পারে। পুলিশ আরও সতর্ক করেছে, সিসি ক্যামেরার মামলার নাম ব্যবহার করে প্রতারণার চেষ্টাও হতে পারে। তাই কোনো ব্যক্তি বা চক্র মোবাইলে টাকা দাবি করলে সরাসরি ট্রাফিক বিভাগ বা নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

জরিমানা এড়াতে করণীয় এআই প্রযুক্তির নজরদারি থেকে বাঁচতে এবং অহেতুক মামলার ঝামেলা এড়াতে চালক ও মালিকদের জন্য ডিএমপি কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। লাল বাতি জ্বলা মাত্রই গাড়ি থামাতে হবে এবং কোনোভাবেই স্টপ লাইন অতিক্রম করা যাবে না। সঠিক লেন ব্যবহার করে নির্দিষ্ট লেন ধরে গাড়ি চালানো এবং ব্যস্ত মোড়গুলোতে উল্টোপথে চলা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। 

পার্কিং ও যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো-নামানো এবং অবৈধভাবে রাস্তা দখল করে পার্কিং করা যাবে না, কারণ ক্যামেরা এগুলোও শনাক্ত করছে। ফিটনেস ও রেজিস্ট্রেশনবিহীন যানবাহন রাস্তায় নামালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। মামলার নোটিস পাওয়ামাত্রই তা অবহেলা না করে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
  বিষয়:   ফাঁকা সড়ক  পুলিশ  সিগন্যাল  যানবাহন 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: