সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই সরকারে আসার আগেই সমাজের দরিদ্রদের জন্য বেশ কিছু সহায়তা করার কথা বলেছিল বিএনপি। সেই প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ক্ষমতার প্রথম বাজেটেই ‘বিশেষ প্রয়োজনে সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা’ খাতে ১৭ হাজার কোটি টাকার বিশাল বরাদ্দ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের সম্মানী কর্মসূচির জন্য মোটা অঙ্কের এই টাকা ব্যয় করা হবে। বিষয়টি বেশ প্রশংসার হলেও অর্থনীতিবিদদের মতে কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেছে। দেশের অর্থনীতির এই ক্রান্তিলগ্নে কার্ডের মাধ্যমে অল্প পরিসরে টাকা দেওয়ার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদিভাবে কর্মসংস্থান বেশি সুফল আনবে বলে মত তাদের।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপির সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা খাতের আওতায় বরাদ্দের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ অর্থাৎ ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় কৃষক কার্ডের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ে দায়িত্ব পালনকারীদের সম্মানী বাবদ রাখা হয়েছে আরও এক হাজার ১০০ কোটি টাকা।
সরকারি সূত্র বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় পাওয়ার পেছনে বিএনপির অন্যতম বড় নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি। বিএনপি চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সীমিত পরিসরে এই কর্মসূচির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করেন।
এখন আগামী অর্থবছর থেকেই এটি সারা দেশে বড় পরিসরে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে নিম্ন আয়ের পরিবার, প্রান্তিক কৃষক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষের জন্য সরাসরি আর্থিক সহায়তা বাড়ানো হবে।
নির্বাচনি ইশতেহারের পাঁচটি মূল স্তম্ভ- রাষ্ট্রীয় সংস্কার, সামাজিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, আঞ্চলিক ভারসাম্য ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নতুন উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করেই আগামী অর্থবছরের উন্নয়ন অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে বলে এডিপি সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে সব মিলিয়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ এডিপি এবার বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। যা গত অর্থবছরের মূল এডিপির তুলনায় নতুন এডিপির আকার প্রায় ৩০.৪৩ শতাংশ বেড়েছে।
জানা যায়, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় প্রথম ধাপে প্রায় ৫০ লাখ পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। প্রতিটি পরিবারকে মাসে আড়াই হাজার টাকা সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল নির্বাচনি ইশতেহারে। প্রস্তাবিত ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বরাদ্দের মাধ্যমে প্রায় ৪৮ লাখ ৩০ হাজার পরিবার এই সুবিধা পাবে বলে হিসাব করা হয়েছে।
গড়ে প্রতি পরিবারে ৪.২৬ জন সদস্য ধরে দেখা যাচ্ছে, প্রায় দুই কোটি ৫৯ লাখ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। অন্যদিকে সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পাইলট কর্মসূচির আওতায় এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৩৭ হাজার ৫৬৭টি পরিবারের নারী প্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করা হয়েছে। এসব পরিবার প্রতি মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা পাচ্ছে। একই সঙ্গে স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এবং বিভিন্ন সরকারি সুবিধাও পাচ্ছেন তারা।
এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ফ্যামিলি কার্ড বর্তমান সরকারের অন্যতম ফ্ল্যাগশিপ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সব অর্থ আগামী বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া হবে এবং বিদ্যমান ত্রুটি-বিচ্যুতি দ্রুত শনাক্ত করে সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার ভাষায়, এ ধরনের বড় পরিসরের কর্মসূচির শুরুতে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকা স্বাভাবিক। তবে প্রকল্পটিকে শতভাগ কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করাই সরকারের লক্ষ্য।
তিনি আরও বলেন, কোথাও প্রকৃত সুবিধাভোগী বাদ পড়েছেন কি না বা অনিয়মের মাধ্যমে কেউ অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন কি না- এসব বিষয় গুরুত্ব সহকারে যাচাই করা হচ্ছে। তথ্য যাচাই, তালিকা হালনাগাদ এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বয় বাড়ানোর কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
তবে সামাজিক সহায়তার এই বিষয়টি বেশ প্রশংসনীয় হলেও তা কপালে ভাঁজ ফেলেছে অর্থনীতিবিদদের। কার্ডের মাধ্যমে এই অর্থ প্রণোদনা সুদূরপ্রসারী চিন্তা নয়, সেই সঙ্গে বিকল্পভাবে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তায় এই অর্থ কাজে লাগাতে পারলে বেশি আউটপুট পাওয়া যেত বলে মত তাদের।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী সময়ের আলোকে বলেন, সমাজের হতদরিদ্র মানুষের জন্য এই কর্মসূচির দরকার আছে।
তবে শুধু সহায়তা করলেই হবে না, তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রোগ্রামসহ নানা কাজ করতে হবে। এ ছাড়া তাদের ঋণসুবিধা দেওয়াসহ বিভিন্ন সুবিধার মাধ্যমে কর্মসংস্থান করে দিতে হবে। তাদের স্বনির্ভর করে তুলতে পারলেই দেশ বেশি উপকৃত হবে।
তিনি আরও বলেন, এসব কার্ডের টাকা সঠিক জায়গায় পৌঁছাচ্ছে কি না সেটাও মনিটরিং করতে হবে। এখানে যেন দুর্নীতি না হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে।