কারও নামের বানান ভুল, কিংবা কারও বাবা মায়ের নামের বানান ভুল, আবার কারও এনআইডিতে বয়স কমবেশির জটিলতা। এরকম অসংখ্য ভুলে আটকে আছে পাসপোর্ট তৈরি, সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারা, চাকরির পেনশন ও বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ। একটি সংশোধনের জন্য থানা অফিস থেকে আগারগাঁও প্রধান কার্যালয় পর্যন্ত প্রতিদিন ধরনা দিচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। বছরের পর বছর ঘুরেও মিলছে সমস্যার সমাধান।
ইসির তথ্য অনুযায়ী সারা দেশে ১ লাখ ১৭ হাজার মানুষের আবেদন পেন্ডিং আছে। যারা প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ইসি ভবনে সরেজমিন এ প্রতিবেদকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় সেতারা বেগমের (৬০)।
তিনি বলেন, আমার নাম সেতারা বেগম। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) নাম এসেছে নুর জাহান বেগম। এনআইডি অনুযায়ী সন্তানদের এনআইডিতেও রয়েছে নুরজাহান বেগম। এ পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। কিন্তু বিপত্তি বাধে পৈতৃক সম্পত্তি ও জমিজমা ভাগাভাগির সময়। দলিলে কোথাও নুরজাহান বেগমের উপস্থিতি নেই সেখানে রয়েছে সেতারা বেগম। কিন্তু এনআইডিতে সেতারা নয় রয়েছে নুর জাহান বেগম।
একই ব্যক্তির দুই নাম। কাগজে-কলমে দুই ধরনের উপস্থিতি। তাই এবার নুর জাহান থেকে সেতারা হতে নির্বাচন কমিশনে নাম সংশোধনের আবেদন করেন তিনি। কিন্তু সেখানেও বাধে আরেক বিপত্তি। নুরজাহানকে সেতারা প্রমাণ করতে লাগবে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র।
নিয়ম অনুযায়ী, দলিলের ফটোকপি, (যেখানে সেতারা বেগম উল্লেখ আছে) ও অনলাইন জন্মনিবন্ধন কপি ও কোর্টের এভিডেভিড দিয়ে আবেদন করেন তিনি। কিন্তু এ এভিডেন্সও যথেষ্ট সন্তোষজনক মনে না হওয়ায় ‘গ’ ক্যাটাগরি থেকে আবেদনটি বাতিল করে দেয় নির্বাচন কমিশন। এরপর আবারও আবেদন করেন ভুক্তভোগী সেতারা বেগম।
তিনি বলেন, আমি অনেক আগের স্বশিক্ষিত একজন গৃহিণী। লেখাপড়ার কোনো একাডেমিক সার্টিফিকেট নেই। ১৯৯৬ সালের ১ আগস্ট নির্বাচন কমিশন থেকে একটি ভোটার পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছিল। সেখানে আমার নাম সেতারা বেগমই ছিল। এরপর নতুন করে যখন ডিজিটাল জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়া শুরু হলো সে সময় আমার শ্বশুর আমার নাম সেতারা বেগম না দিয়ে নুর জাহান বেগম দিয়ে দেন।
আর এত দিন এভাবেই চলছিল। ছেলেমেয়েদের এনআইডিতেও মায়ের নামের জায়গায় নুর জাহান বেগমই লেখা হয়। এতদিন কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু সম্প্রতি পারিবারিক সম্পত্তি বণ্টনের সময় নতুন এই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি। ইসি বলছে, আরও প্রমাণ দিতে হবে, কিন্তু এখন তো আমার কাছে এর বেশি কোনো প্রমাণ নেই। কী করব বুঝতে পারছি না। তারা চাইলে আমার বাড়িতে এসে তদন্ত করে দেখতে পারে যে নুর জাহান ও সেতারা বেগম একই ব্যক্তি কি না।
নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র শাখায় কথা বললে তারা জানান, পর্যাপ্ত তথ্য প্রমাণাদি না থাকায় আবেদনটি ‘গ’ ক্যাটাগরি থেকে একবার বাতিল করা হয়েছে। নতুন করে আবারও তিনি আবেদন করেছেন। কিন্তু সেখানে গ্রহণযোগ্য কোনো তথ্য প্রমাণ দিতে পারেননি।
একটি জন্মনিবন্ধন দিয়েছেন ২০২৩ সালের, অথচ তিনি ভোটার হয়েছেন ২০০৮ সালে। সুতরাং এটি এতটা গুরুত্ব বহন করে না। এ ছাড়া একটি দলিল দিয়েছে সেখানে সেতারা বেগম উল্লেখ আছে ঠিকই কিন্তু এই সেতারা বেগমই যে তিনি তা কীভাবে বোঝা যাবে- অন্য কারও দলিলও তো হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, এর বাইরেও কিছু এভিডেভিট কাগজ দিয়েছেন কিন্তু তা আমাদের কাছে যথেষ্ট নয়। তাই ঊর্ধ্বতনদের অনুমতি নিয়ে বিষয়টি আমরা মাঠ পর্যায়ে তদন্ত করব। তদন্ত ইতিবাচক হলে ডিজি মহোদয় সিদ্ধান্ত দেবেন।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের প্রধান ফটকের সামনে দেখা যায় এক তরুণ উত্তেজিত অবস্থায় চিল্লাপাল্লা করছেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এনআইডিতে আমার নামের একটা ছোট্ট সংশোধনী আছে। আবেদনও করেছি কিন্তু নিচ থেকে ফাইল তোলা হচ্ছে না। আমার বাড়ি ফরিদপুর জেলায়। ফাইলটি ফরিদপুর বিভাগীয় কর্মকর্তার দফতরে আটকে আছে। তিন বছর ধরে আমি ঘুরছি। আর কত ঘুরব?
তিনি আরও বলেন, ফরিদপুর থানা অফিস আমার কাছে ৩০ হাজার টাকা চেয়েছিল। সে সময় দিলে হয়তো আমার কাজটা হয়ে যেত- এত ঘুরতে হতো না। আমি তাদের বিরুদ্ধে মামলা করব।
বুধবার ইটিআই ভবনে দেখা যায়, এনআইডি সংশোধনের জন্য দীর্ঘলাইন। কারও নাম আবার কারও বয়সের তারিখ সংশোধন করতে হবে। প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সংশোধনের জন্য কর্মকর্তাদের রুমের সামনে অপেক্ষা করছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এনআইডি ভুলের জন্য অনেকে পাসপোর্ট করতে পারছেন না। আবার কেউ চাকরির ক্ষেত্রে জটিলতায় পড়েছেন।
কেউ পড়েছেন জমি নিয়ে ঝামেলায়। অন্যদিকে এনআইডি সংশোধনের জন্য কেউ দালালেরও শরণাপন্ন হচ্ছেন। ইসি ও ইটিআই ভবনের আশপাশে বেশকিছু ছোট ছোট কম্পিউটারের দোকান রয়েছে যেখানে এনআইডি সংশোধনের আবেদন করা হয়। অনেক ভুক্তভোগীকে আবার তাদের সঙ্গে সংশোধনের জন্য যোগাযোগ করতেও দেখা গেছে।
খুশি কানন নামে এক নারী বলেন, আমার নাম খুশি কানন, কিন্তু এনআইডিতে নাম এসেছে খোশনেহার। জন্মনিবন্ধনসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র দিয়েছি কিন্তু এখনও কোনো আপডেট পাইনি। এই ছোট্ট একটি ভুলের জন্য আমি পাসপোর্ট করতে পারছি না। আমি অসুস্থ , দেশের বাইরে চিকিৎসা করতে যাবÑ তাও পারছি না।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের (এনআইডি) পরিচালক (অপারেশন) মো. সাইফুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, চার ক্যাটাগরিতে সারা দেশে ১ লাখ ১৭ হাজার আবেদন পেন্ডিং আছে। এসব আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য কাজ চলছে।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন বিভাগের (এনআইডি) মহাপরিচালক (ডিজি) আবুল হাসনাত মুহম্মদ আনোয়ার পাশা সময়ের আলোকে বলেন, এনআইডি নিয়ে অবশ্যই ভোগান্তি আছে। এটা আমি বিশ্বাস করি। আমি নিজেও একজন ভুক্তভোগী।
তিনি বলেন, আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। আশা করি, সব ঠিক হয়ে যাবে। এর বেশি কিছু বলতে পারব না।