বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দল গঠনের পর তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করেছিলেন। শুধু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ নয়, নেতাকর্মীদের দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা ও গুণগত রাজনৈতিক চর্চায় দীক্ষিত করতে তিনি এক ধরনের প্রশিক্ষণভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলেন। বিএনপি নেতাদের মতে, তার ছেলে বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সেই পথেই হাঁটছেন।
দলটির একাধিক নেতা জানান, লন্ডনে অবস্থানকালেও তারেক রহমান অনলাইনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং নানা কর্মশালা ও মতবিনিময় সভায় দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দিতেন। দেশে ফেরার পরও তিনি দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্ত নেতাদের নিয়ে প্রশিক্ষণধর্মী কর্মসূচিতে অংশ নেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন সামনে রেখে বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জন্য আয়োজিত প্রশিক্ষণ কর্মশালাতেও তিনি দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন।
সর্বশেষ চলতি সপ্তাহের শনিবার রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় এবং তৃণমূল পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তারেক রহমান। নেতাদের মতে, মতবিনিময়ের আদলে এ আয়োজন ছিল মূলত একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালার মতো। বছরে এ ধরনের কয়েকটি কর্মসূচি আয়োজনের ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।
দলের শীর্ষ নেতারা বলছেন, দীর্ঘ সময় বিদেশে থাকলেও তারেক রহমান অনলাইনের মাধ্যমে সারা দেশের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। নিয়মিত দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য ও রাজনৈতিক পরামর্শের মাধ্যমে তিনি নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখেন এবং দলকে সংগঠিত রাখতে সক্ষম হন। তাদের মতে, এ কারণেই নানা সংকটের মধ্যেও বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে।
বিএনপি নেতাদের ভাষ্য, জিয়াউর রহমান রাজনীতিতে এসে তার ‘একুশ দফা’ কর্মসূচির পাশাপাশি দেশপ্রেম ও জাতীয় উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে নেতাকর্মীদের রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করতেন। তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রেও তিনি প্রশিক্ষণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। ‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে গ্রামপর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছিল। তার লক্ষ্য ছিল মানুষকে স্বাবলম্বী করে তোলা।
শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচিই নয়, ‘খাল খনন কর্মসূচি’র মতো উন্নয়ন উদ্যোগেও তিনি স্বেচ্ছাশ্রম ও জনসম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দিতেন। কীভাবে সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হয়, সে বিষয়েও নেতাকর্মীদের উদ্বুদ্ধ করতেন।
প্রশিক্ষক হিসেবে জিয়াউর রহমানের কঠোর শৃঙ্খলাবোধ ও পেশাদারিত্বের বিষয়টি তার সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকাকালে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তাদেরই সাধারণত এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হতো। পরবর্তীকালে সেনাপ্রধান হিসেবে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একটি আধুনিক ও সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তার সময়েই সামরিক একাডেমি ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি ও সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘জিয়াউর রহমান যেমন নেতাকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতেন, তারেক রহমানও অসংখ্য কর্মশালায় দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তার নেতৃত্বে বিএনপি এখন সবচেয়ে বেশি সুসংগঠিত। দলকে সংগঠিত করতে তার বক্তব্য অনেকটা জিয়াউর রহমানের প্রশিক্ষণের মতোই ভূমিকা রেখেছে।’
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর জিয়াউর রহমান প্রচলিত রাজনৈতিক ধারা থেকে বেরিয়ে নেতাকর্মীদের প্রশিক্ষণ ক্লাস নিতেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সেই ধারাবাহিকতায় সাংগঠনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেছেন। তিনি নিজেই অঙ্গীকার করেছেন, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করবেন। বাবার পথেই হাঁটছেন তারেক রহমান। এটিকে একটি শুভ সূচনা বলা যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘লন্ডনে থাকাকালেও তারেক রহমান সারা দেশের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন এবং দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যের মাধ্যমে তাদের প্রশিক্ষিত করেছেন। এ কারণেই তার নেতৃত্বে বিএনপি আজ এত সংগঠিত এবং নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে।’
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন দক্ষ প্রশিক্ষক। সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি তিনি দলীয় নেতাকর্মীদেরও প্রশিক্ষণ দিতেন। তার ছেলে, দলের বর্তমান চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বিদেশে থেকেই নেতাকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। দেশে ফিরেও তিনি সেই কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। এর মাধ্যমে নেতাকর্মীরা আরও দক্ষ ও সংগঠিত হয়ে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারবেন।’
সময়ের আলো/জেডআই