দেশের ১০ হাজার ৭৪০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব খেলার মাঠ না থাকায় শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মাঠের অভাবে শৈশবের স্বাভাবিক চঞ্চলতা হারিয়ে শিশুরা ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী মোবাইল আসক্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
শুক্রবার (১৫ মে) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে ‘শিশুর নিরাপদ জীবন: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এই উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরেন। শিশু-কিশোর সংগঠন ‘খেলাঘর আসর’ তাদের ৭৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মাসব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই আলোচনার আয়োজন করে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনের প্রেসিডিয়াম সদস্য লেনিন চৌধুরী। তিনি জানান, দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ শিশু হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য একটি নিরাপদ ও সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। খেলাধুলার সুযোগ কমে যাওয়ায় শিশুরা যেমন মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি সমাজজুড়ে শিশু নির্যাতন ও শোষণের হারও বাড়ছে।
মূল প্রবন্ধে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে ৪০৩ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তবে সামাজিক লজ্জা ও পরিবারের ভয়ের কারণে অনেক ঘটনাই আড়ালে থেকে যায়। বিশেষ করে ছেলেশিশু নির্যাতনের অধিকাংশ ঘটনা কখনোই জনসমক্ষে আসে না বা রিপোর্ট করা হয় না।
আলোচনায় আরও উঠে আসে, বর্তমানে প্রতি ১০টি শিশুর মধ্যে ৯টি শিশু কোনো না কোনোভাবে মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৯ দশমিক ২ শতাংশ শিশুশ্রমের সঙ্গে জড়িত এবং ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ১৮ শতাংশ চরম অপুষ্টিজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা সেমিনারে আক্ষেপ করে বলেন, বর্তমান শিক্ষাক্রমে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সৃজনশীল দক্ষতা উন্নয়নের পর্যাপ্ত সুযোগ রাখা হয়নি। তিনি বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতিকে শিশুদের বিকাশের অন্তরায় হিসেবে অভিহিত করেন এবং দ্রুত এর সংস্কার দাবি করেন।
সেমিনারে আমন্ত্রিত অতিথিরা শিশুদের জন্য একটি সৃজনশীল ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সুকোমল বড়ুয়া বলেন, শিশুর জন্য শুধু শারীরিক পুষ্টিই যথেষ্ট নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ বর্তমান শিক্ষাক্রমকে বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বর্ণনা করেন এবং এটি পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানান। খেলাঘর আসরের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল কবীরসহ অন্যান্য বক্তারা পাচার, অপুষ্টি ও শিশুশ্রমের হাত থেকে শিশুদের রক্ষা করতে রাষ্ট্র ও সমাজকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।
সময়ের আলো/টিএইচ