তিস্তায় রাজনীতির ঢেউ

এমএকে জিলানী

জাতীয়

তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি এক যুগের বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকলেও নদীকেন্দ্রিক বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা থেকে সরে আসেনি বাংলাদেশ। বরং ভারতের

2026-05-16T00:07:23+00:00
2026-05-16T00:07:23+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
তিস্তায় রাজনীতির ঢেউ
এমএকে জিলানী
প্রকাশ: শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬, ১২:০৭ এএম 
তিস্তা। ছবি : সংগৃহীত
তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি এক যুগের বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকলেও নদীকেন্দ্রিক বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা থেকে সরে আসেনি বাংলাদেশ। বরং ভারতের অনীহার প্রেক্ষাপটে চীনের সহায়তায় ‘তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ (টিআরসিএমআরপি) বাস্তবায়নের উদ্যোগ নতুন করে গতি পেয়েছে। তবে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প এখন শুধু উন্নয়ন পরিকল্পনা নয়, দক্ষিণ এশিয়ার জটিল ভূ-রাজনীতি, ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং তিস্তার পানিপ্রবাহের অনিশ্চয়তাকে ঘিরে বড় এক কূটনৈতিক সমীকরণে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও নদী পুনরুদ্ধারের জন্য প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও ভারতের অংশগ্রহণ ও পানিবণ্টন চুক্তি ছাড়া এর বাস্তব সুফল পাওয়া নিয়ে রয়েছে বড় ধরনের প্রশ্ন।

তিস্তা নদীর পানি বণ্টনে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত সবকিছু চূড়ান্ত করেও বিগত ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে চুক্তি সই করেনি। দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের কথা চিন্তা করে টিআরসিএমআরপি বাস্তবায়নে ২০১৬ সালে চীনের প্রতিষ্ঠান চায়না পাওয়ারের সঙ্গে সমাঝোতা স্মারক সই করে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ওই সমঝোতা নবায়ন করে। এ অনুযায়ী চলতি বছরের মধ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।

অন্যদিকে চলতি মাসে চীন সফরের সময়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান চীনের কাছে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা চেয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা খুবই জটিল এবং স্পর্শকাতর। তিস্তা মূলত ভূ-রাজনীতির জালে বন্দি।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, তিস্তা নদী বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশ দিয়ে প্রবাহিত এবং যা ভারতের নিরাপত্তা ইস্যু শিলিগুড়ি করিডোরের কাছাকাছি। ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি চূড়ান্ত করলেও ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে চুক্তি সই করেনি। সে কারণে বাংলাদেশ টিআরসিএমআরপি বাস্তবায়নে ২০১৬ সালে চীনের দ্বারস্থ হয়। এ বিষয়ে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ‘চায়না পাওয়ার’ নামে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করে। সম্ভাব্যতা যাচাই করে চায়না পাওয়ার প্রতিবেদন জমা দিলে ২০১৯ অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে সরকার টিআরসিএমআরপি অনুমোদন করে। সে অনুযায়ী প্রকল্পটি ২০২৫ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করার কথা ছিল। কিন্তু তিস্তা ইস্যুতে বাংলাদেশ চীনের দিকে ঝুঁকছে দেখে তখন দিল্লি আবার চুক্তি বাস্তবায়নে আগ্রহ প্রকাশ করলে প্রকল্পটি ধীরগতিতে চলতে থাকে। টিআরসিএমআরপির মতো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর প্রকল্প প্রয়োজনে বাংলাদেশ-ভারত-চীন একসঙ্গে বাস্তবায়ন করবে এমন ধুয়া তুলে সেটি হিমাগারে পাঠানো হয়।

এ প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের সাবেক রাষ্ট্রদূত লি জিমিং ২০২২ সালের ১৩ অক্টোবর ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেন, আমি খোলামেলাভাবে বলতে চাই যে, এ প্রকল্প উন্নয়নের সঙ্গে চীনের কিছুটা অনীহা আছে। কারণ এ প্রকল্প উন্নয়নের পেছনে কিছু স্পর্শকাতর বিষয় আছে, যা এরই মধ্যে আমরা টের পেয়েছি। প্রকল্পটি নিয়ে আমার ব্যক্তিগত অভিমত এবং উদ্বেগ হচ্ছে, যদি এ প্রকল্প উন্নয়নের বিষয়ে বাইরের কেউ এসে বলে বসে- এটা চীনের আরেকটি ঋণের ফাঁদ হবে, অথবা এখানে যদি সুনির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে বাংলাদেশ শেষ মুহূর্তে এসে বলে বসে যে, দুঃখিত চীন, আমরা আর সামনে এগিয়ে যেতে পারছি না, শেষে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে আমাকে বেকায়দায় ফেলবে এবং আমি বিব্রত হব। তবে একটা বিষয় আমি নিশ্চিত করতে চাই যে, স্থানীয় জনগণ তিস্তা প্রকল্প চায় এবং সবশেষ প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে তাদের অভিমত দেখে এ প্রকল্প উন্নয়নের বিষয়ে আমি খুবই আশাবাদী, যা আমি বেইজিংকে জানাব। তিস্তা প্রকল্প উন্নয়ন স্পর্শকাতর, কিন্তু এটি খুবই ইতিবাচক একটি প্রকল্প, যা ওই অঞ্চলের মানুষের জীবন-মান উন্নয়নে প্রভাব ফেলবে।
আরও পড়ুন

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এলে টিআরসিএমআরপি প্রকল্প আবার হালে পানি পায়। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে ২০১৬ সালে চীনের প্রতিষ্ঠান চায়না পাওয়ারের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা চুক্তিটি ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি নবায়ন করা হয়। নবায়ন করা সমঝোতা অনুযায়ী, চায়না পাওয়ার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটির ধারণাপত্র জমা দেয়। চায়না পাওয়ার প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন এ বছরই প্রস্তুত করবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চায়না পাওয়ারকে মোট দুই বছরের জন্য সময় দেওয়া হয়। প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ করবে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এর তত্ত্বাবধান করবে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গৃহীত টিআরসিএমআরপি প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে বেইজিং সফরে গিয়ে তিনি টিআরসিএমআরপি প্রকল্প বাস্তবায়নে আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের সম্পৃক্ততা ও সহায়তা কামনা করেছেন। চীন বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটের (বিআরআই) আওতায় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ওই সফরের যৌথ বিবরণীর ৫ নম্বর প্যারায় বলা হয়, পঞ্চদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার একটি ভালো সূচনা অর্জন করায় বাংলাদেশ চীনকে অভিনন্দন জানিয়েছে। চীন বাংলাদেশের নতুন সরকারের রাজনৈতিক কর্মসূচি এগিয়ে নিতে সমর্থন জানায়। উভয় পক্ষ উচ্চমানের বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতাকে এগিয়ে নিতে এবং অর্থনীতি ও বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, পানি সম্পদ, স্বাস্থ্য ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিময় ও সহযোগিতা জোরদার করতে সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশ তার উন্নয়নে চীনের দীর্ঘদিনের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) চীনের সম্পৃক্ততা ও সমর্থনও কামনা করেছে বাংলাদেশ।

ঢাকার একজন কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, এ প্রকল্পের অর্থায়ন এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে এটি বাস্তবায়নে আনুমানিক প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে। এর মধ্যে মূল অর্থের জোগান চীন ঋণ হিসেবে দেবে বাংলাদেশকে। প্রকল্পটি এখনও প্ল্যানিং ও ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা যাচাই) পর্যায়ে আছে। বাস্তবায়ন শুরুর আগে এ কাজ শেষ করতে হবে। অর্থায়নের বিষয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সরাসরি চায়না পাওয়ার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে। প্রকল্প খরচ ও অর্থায়ন বিষয়ে ইআরডি এরই মধ্যে তাদের একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন চায়না পাওয়ারকে দিয়েছে। চায়না পাওয়ার হয়তো শিগগির তাদের মতামত জানাবে।

প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী, টিআরসিএমআরপি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের আওতায় ১৪০ মিলিয়ন ঘনমিটার সেডিমেন্ট (পলি) অপসরণ করা হবে। পুনরুদ্ধার করা হবে ১৭১ বর্গকিলোমিটার জমি। ১১০ কিলোমিটার পুরোনো বাঁধ মেরামতের পাশাপাশি ১২৪ কিলোমিটার নতুন বাঁধ নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের আওতায় ২২৪ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করা হবে। মসৃণ যোগাযোগের জন্য ৮২টি লোকেশনে জেটি ও পরিবহন সুবিধা থাকবে। এ ছাড়া এ প্রকল্পের আওতায় তীর সংরক্ষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ, ইকোসিস্টেম রেস্টোরেশন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন করা হবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফায়েজ দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, টিআরসিএমআরপি প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিষয়টা সহজ ও সরল না। এর সঙ্গে ভূ-রাজনীতি জড়িত, বিশেষ করে এটি ভারতের নিরাপত্তা ইস্যু শিলিগুড়ি করিডোরের কাছাকাছি। টিআরসিএমআরপি প্রকল্প বাস্তবায়ন বাংলাদেশ চাইলেই বাস্তায়ন করতে পারে, কিন্তু এ প্রকল্পের পানিপ্রবাহ আসবে ওপার থেকে, এখন পানি যদি ওপার থেকে না আসে তবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে কি ফল পাওয়া যাবে? এ জন্য এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারলে তা অনেক সহজ হয়ে যাবে। ভারতকে অন্য কোনো সুবিধা দিয়ে রাজি করাতে হবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, টিআরসিএমআরপি প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে অনেক দিন ধরে আলোচনা চলছে, এ বিষয়ে অনেক কিছু আমরা মিডিয়ায় দেখি। এখন কারিগরি পর্যায়ে এ ইস্যুতে আলোচনা চলছে। আলোচনায় ইআরডির সঙ্গে সব পক্ষ শতভাগ ঐকমত্যে পৌঁছতে পারছে না। এ প্রকল্পে বিনিয়োগ প্রচুর, প্রকল্প বাস্তবায়নের পর বেনিফিট কীভাবে পাওয়া যাবে সে বিষয়ে সব পক্ষ একমত নয়। কেননা পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি ভারতের হাতে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তি হলে পানি প্রবাহের সঠিক ধারণা পাওয়া যেত। পানিবণ্টন চুক্তির পর প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বেনিফিট পাওয়া যাবে। তাই আরও কারিগরি বিষয় যাচাই-বাছাই করে এগোনো উচিত। এর বাইরে প্রকল্প এলাকার কৌশলগত গুরুত্ব এখন আগের চেয়ে আরও বেড়েছে। ভারত ও চীন এশিয়ার এই দুই শক্তি একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। আবার দুই দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের সম্পর্ক রয়েছে। সমগ্র অঞ্চল নিয়ে দুই দেশেরই কৌশলগত পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি ভারতের নিরাপত্তা ইস্যু শিলিগুড়ি করিডোরের কাছাকাছি, ভারত যেখানে চীনকে শত্রু মনে করে। বিষয়টি এমন যে, বড় ভাইদের ঝগড়ার মধ্যে নিজেকে তখনই জড়ানো যায় যখন বেনিফিট পাওয়ার পূর্ণ নিশ্চয়তা থাকে। তাই আগে পানিবণ্টন চুক্তি হওয়া প্রয়োজন। ধারণার ওপর ভর করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে শেষে হিতে বিপরীত হতে পারে। যেমনটি হয়েছে কর্নফুলী টানেল নির্মাণের ক্ষেত্রে, যেটার বেনিফিট সক্ষমতা নিয়ে এখনই প্রশ্ন উঠেছে।

এএডি/


  বিষয়:   তিস্তা  রাজনীতি  ঢেউ 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: