রাজধানীসহ ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) আওতাধীন এলাকায় পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ‘পথচারী নিরাপত্তা প্রবিধানমালা, ২০২৫’-এর খসড়া প্রকাশ করেছে ডিটিসিএ।
খসড়ায় ফুটপাত দখল করে হকারি, ফুটপাত দিয়ে মোটরসাইকেল চালানো এবং নির্মাণসামগ্রী রেখে পথচারীদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করলে জেল-জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ফুটপাত নির্মাণ, রাস্তা পারাপার, আন্ডারপাস ও ফুটওভার ব্রিজ ব্যবস্থাপনা, স্মার্ট সিগন্যালিংসহ পথচারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ডিটিসিএ গত ১৪ মে তাদের ওয়েবসাইটে ‘পথচারী নিরাপত্তা প্রবিধানমালা, ২০২৫’ এর খসড়া প্রকাশ করে জনমত আহ্বান করেছে। আগামী ৩০ মে পর্যন্ত এ বিষয়ে মতামত দেওয়া যাবে।
ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মশিউর রহমান বলেন, ২০২১ সালেও পথচারী নিরাপত্তা নিয়ে একটি খসড়া ছিল। তবে সেটি চূড়ান্ত না হওয়ায় বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় এনে নতুনভাবে এটি হালনাগাদ করা হয়েছে। জনমত গ্রহণ শেষে খসড়াটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। পরবর্তী আইনি যাচাই-বাছাই শেষে এটি গেজেট আকারে জারি হতে পারে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রবিধানটি বাস্তবায়িত হলে পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা সহজ হবে।
খসড়া অনুযায়ী, ডিটিসিএর আওতাধীন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ ও মানিকগঞ্জ জেলায় এ প্রবিধান কার্যকর হবে। প্রয়োজনে এটি সারা দেশেও বাস্তবায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে।
প্রবিধানমালায় ‘পেডেস্ট্রিয়ান ফার্স্ট পলিসি’ বা পথচারী অগ্রাধিকার নীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, রাস্তা পারাপারের ক্ষেত্রে সমতলে জেব্রা ক্রসিংকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সিগন্যাল নিয়ন্ত্রিত সংযোগস্থলে সাধারণত ফুটওভার ব্রিজ বা আন্ডারপাস নির্মাণ নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তবে বিশেষ প্রয়োজন হলে এসব অবকাঠামো নির্মাণ করা গেলেও সমতলে পারাপারের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক রাখতে হবে।
খসড়ায় ফুটপাতকে তিনটি জোনে ভাগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুলো হলো— ভবন সম্মুখ জোন, পথচারী জোন এবং রোড ফার্নিচার জোন। পথচারীদের নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য ফুটপাতে র্যাম্প, ট্যাকটাইল টাইলস, পর্যাপ্ত আলো, সাইন-সিগন্যাল, বসার ব্যবস্থা, ছাউনি, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা ও গণশৌচাগারের মতো সুবিধা রাখার কথা বলা হয়েছে। শিশু, নারী, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রবিধানমালার খসড়ায় বলা হয়েছে, ফুটপাত বা আন্ডারপাস দখল করে হকারি করলে পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড হতে পারে। একইভাবে ফুটপাত দিয়ে মোটরসাইকেল চালালে এক হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ভবন নির্মাণকাজের সময় ফুটপাত দখল করে নির্মাণসামগ্রী রাখলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কাজের পরিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা ও বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সামনে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা রাখতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব ট্রাফিক পরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে স্কুলের সামনে ‘ট্রাফিক ওয়ার্ডেন’ নিয়োগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
খসড়ায় স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংযোগস্থলে স্মার্ট সিগন্যাল সিস্টেম, ব্রেইল সিগন্যাল স্থাপন এবং অনলাইনভিত্তিক মনিটরিং প্ল্যাটফর্ম চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এছাড়া ফুটপাত, ফুটওভার ব্রিজ ও আন্ডারপাস নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টার মধ্যে শেষ করার নির্দেশনাও রয়েছে। একই সঙ্গে পথচারী নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গার্মেন্টস, কলকারখানা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সামনে ভিডিওচিত্র প্রদর্শন এবং বিলবোর্ড স্থাপনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিটিসিএ সূত্র জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামত নিয়ে খসড়াটি চূড়ান্ত করে সরকারি গেজেট আকারে জারি করতে এটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান এ উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি বলেন, রাজধানীতে পথচারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত ছিল। তবে কেবল খসড়া তৈরি বা নীতিমালা ঘোষণা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; এর কার্যকর বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
/কেআই