১৯৪৭, ১৯৭১ ও ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক চেতনাকে ধারণ করেই জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক। তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং গণআন্দোলনের এই তিনটি মাইলফলককে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি সঠিক গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না।
শনিবার (১৬ মে) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় জাতীয় উলামা কাউন্সিল বাংলাদেশ-এর উদ্যোগে আয়োজিত ‘সমকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম, লেখক, সাংবাদিক, তরুণ চিন্তক ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্টদের উপস্থিতিতে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।
জাতীয় উলামা কাউন্সিল বাংলাদেশের সভাপতি মাওলানা মাহফুজুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় রাজনৈতিক সহাবস্থানের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। মাওলানা মাহফুজুল হক তার স্বাগত বক্তব্যে বলেন, অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে জাতীয় উলামা কাউন্সিলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশের এই সংকটাপন্ন সময়ে যারা অংশ নিয়েছেন, তাদের সবাইকে আন্তরিক অভিনন্দন।
তিনি মনে করেন, দেশের বিদ্যমান তীব্র রাজনৈতিক বিভক্তি ও মতপার্থক্যের মধ্যেও এ ধরনের উলামা সমাবেশ ও মতবিনিময় জাতীয় সংকট নিরসনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সহনশীলতা ও শ্রদ্ধাবোধ বজায় রেখে ধারাবাহিকভাবে এমন আয়োজন বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহাবস্থান এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনেক বেশি সহজ হবে।
মতবিনিময় সভায় বর্তমান দেশের রাজনৈতিক জোট ও পতিত স্বৈরাচারী শক্তির পুনর্বাসন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিশিষ্ট লেখক, চিন্তক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাওলানা শরীফ মুহাম্মাদ। তিনি ওলামায়ে কেরাম ও রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘রাজনীতিতে চিরস্থায়ী শত্রু বা মিত্র বলে আসলে কিছু নেই এবং সময়ের প্রয়োজনেই অনেক সময় রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন ঘটাতে হয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, আগামী দিনে পতিত ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী শক্তির নতুন কৌশলে রাজনীতিতে ফিরে আসার এক বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই ধরনের আসন্ন বড় বড় রাজনৈতিক বিপদগুলোকে সামনে রেখেই আগামী দিনে আমাদের নতুন রাজনৈতিক জোটগত অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ আন্দোলনের গতিপথ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নির্ধারণ করতে হবে।’
সভায় আলেম সমাজের রাজনৈতিক স্বকীয়তা ও স্বতন্ত্র ধারার রাজনীতি নিয়ে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন জামিয়াতুল মানহাল উত্তরার মুহতামিম মুফতী কিফায়াতুল্লাহ আযহারী এবং জাতীয় সংসদ সদস্য মুফতী মুহাম্মাদুল্লাহ। মুফতী কিফায়াতুল্লাহ আযহারী বলেন, আগামী দিনের জাতীয় রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে দেওবন্দী আদর্শের যথাযথ অনুসরণ এবং ওলামায়ে কেরামের নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখেই সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগোতে হবে।
অন্যদিকে সংসদ সদস্য মুফতী মুহাম্মাদুল্লাহ আলেমদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘বিগত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগেই আমাদের পক্ষ থেকে এই নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, আলেম সমাজ জাতীয় রাজনীতিতে আর কোনো বড় দলের ভাড়াটিয়া বা সস্তা ভোট ব্যাংক হয়ে থাকতে চায় না। এখন থেকে নিজস্ব শক্তিশালী অবস্থান ও সম্পূর্ণ স্বকীয় ধারার রাজনীতিতে আলেমদের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।’
মতবিনিময় সভার সমাপনী বক্তব্যে এবং আখেরি মোনাজাতের পূর্বে সংগঠনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পরিষ্কার করেন জাতীয় উলামা কাউন্সিলের মহাসচিব মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, জাতীয় উলামা কাউন্সিল বাংলাদেশ সম্পূর্ণ একটি অরাজনৈতিক ও সেবামূলক সংগঠন। দেশের প্রচলিত কোনো রাজনৈতিক দল বা মতের সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে থেকে সামগ্রিকভাবে এ দেশের পুরো আলেম সমাজের জন্য একটি দায়িত্বশীল অভিভাবকত্বের ভূমিকা রাখাই এই সংগঠনের একমাত্র মূল উদ্দেশ্য।
কোনো নির্দিষ্ট দলের লেজুড়বৃত্তি না করে দেশের যেকোনো জাতীয় সংকটে আলেম ও সাধারণ জনগণের পাশে দাঁড়াতে ভবিষ্যতেও এমন নীতিগত ও আদর্শিক আয়োজন নিয়মতান্ত্রিকভাবে অব্যাহত থাকবে বলে তিনি দৃঢ় আশা প্রকাশ করেন।
সময়ের আলো/টিএইচ