কেটে গেল অনিশ্চয়তা, বাস্তবায়ন হচ্ছে পে-স্কেল

এসএম আলমগীর

জাতীয়

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতন কাঠামো (পে-স্কেল) নিয়ে কেটে গেল সব অনিশ্চয়তা। এটি এখন বাস্তবে রূপ নিতে

2026-05-18T01:00:23+00:00
2026-05-18T02:18:30+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
কেটে গেল অনিশ্চয়তা, বাস্তবায়ন হচ্ছে পে-স্কেল
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬, ১:০০ এএম  আপডেট: ১৮.০৫.২০২৬ ২:১৮ এএম
প্রতীকী ছবি
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতন কাঠামো (পে-স্কেল) নিয়ে কেটে গেল সব অনিশ্চয়তা। এটি এখন বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে এবং বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে। 

পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ১ জুলাই থেকেই নতুন এই বেতন কাঠামো কার্যকর করার নীতিগত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারের এ সিদ্ধান্তে বেজায় খুশি সরকারি চাকরিজীবীরা। 

অবশ্য অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা দরকার ছিল, কিন্তু সরকারের আর্থিক টানাপড়েনের মধ্যে অর্থের জোগান দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। 

যদিও সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে একবারে নয়, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে পে-স্কেল। এতে অর্থের জোগানে সমস্যা হবে না। তারপরও অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সামনে চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে সরকারকে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে হারে নতুন পে-স্কেল ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সে অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে হলে বাড়তি অনেক টাকার দরকার হবে। 

এতে সরকারের অনুন্নয়ন ব্যয় বেড়ে যাবে। আর অনুন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া মানে উন্নয়ন কাজের অর্থ কাটছাঁট করতে হবে। তা ছাড়া নতুন পে-স্কেলের অর্থ আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে। 

আমাদের মনে রাখা দরকার, আগামী বাজেট হবে ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্বিন্যাসের বাজেট। সুতরাং নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে গেলে আগামীতে এই ভঙ্গুর অর্থনীতি চাঙ্গা করার কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হবে।’

তিনি আরও বলেন, নতুন পে-স্কেল যেহেতু বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা করে গেছে এবং বিএনপি সরকারের ঘাড়ে পড়েছে এটি বাস্তবায়নের। এই সরকারের পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা থেকে সরে যাওয়ার কোনো সুযোগও ছিল না। তাতে সরকারি চাকরিজীবীরা বেজার হয়ে যেত। 

তবে পে-স্কেল বাস্তবায়ন করার সময় অতীতে সবসময়ই মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে দেখা গেছে। এবারও সেটি হতে পারে। তাই সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর বিষয়টিতেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার।’

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিগত অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে, যারা গত ২২ জানুয়ারি সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। 

এতে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা গ্রেডভেদে ১০০ শতাংশ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছিল। সে পথ ধরেই বর্তমান সরকার নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে। 

তার অংশ হিসেবেই আগামী বাজেট নিয়ে গত বুধ-বৃহস্পতিবার টানা দুদিন সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ধারাবাহিক বৈঠকের প্রথম দিন বুধবার প্রধানমন্ত্রী পে-স্কেল নিয়ে বাস্তবায়নে ইতিবাচক সিদ্ধান্তের কথা সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দেন। 

ওই বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামো কয়েক ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। নতুন বেতন কাঠামোর কত অংশ জুলাই থেকে দেওয়া হবে, তা এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, তিন বছরে পুরো বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হতে পারে। 

এর মধ্যে ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামোর বর্ধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ, পরের ২০২৭-২৮ অর্থবছরে বাকি ৫০ শতাংশ দেওয়া হতে পারে। আর ২০২৮-২৯ অর্থবছরে যুক্ত হতে পারে ভাতাগুলো। 

এতে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ যেমন কম হবে, তেমনি সরকারের অর্থায়নও সহজ হবে। তবে আগামী অর্থবছর থেকে মূল বেতনের অর্ধেক দিতে ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি সংস্থান রাখা হচ্ছে। 

চলতি অর্থবছর সরকারের প্রায় ১৫ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতায় প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা এবং পেনশনারদের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। 

সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন জমা দেয়। 

তখন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের বর্তমান ব্যয় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। 

কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়নে প্রয়োজন হতে পারে আরও ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। বেসামরিক কর্মচারীদের পাশাপাশি জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও বেতন কমিটির প্রতিবেদন প্রস্তুত হয়েছে। 

তিনটি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বাস্তবায়নের সুপারিশ তৈরির জন্য বিএনপি সরকার গত মাসে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। এই কমিটিই তিন ধাপে বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করবে। এতে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। 

প্রস্তাবিত কাঠামোয় ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ রয়েছে। তবে গ্রেড রাখা হয়েছে আগের মতো ২০টি। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:৮, যা আগে ছিল ১:৯ দশমিক ৪। সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা প্রস্তাব রাখা হয়েছে। 

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর ওই নির্দেশনা পাওয়ার পর নবম পে-স্কেলের বিষয়ে পুনর্গঠিত কমিটি তাদের সুপারিশ তৈরির কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে কাজ শুরু করেছে। এ সুপারিশ তৈরি হওয়ার পর তা সরকারের কাছে জমা দেওয়া হবে। 

এতে প্রথম বছর শেষে পরের দুই অর্থবছরে বাকি অর্ধেক মূল বেতন এবং বিভিন্ন ধরনের ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, আগামী ৭ জুন বেলা ৩টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় বা বাজেট অধিবেশন শুরু হবে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ইতিমধ্যে এ অধিবেশন আহ্বান করেছেন। 

ওই অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করবেন। বাজেট বক্তব্যের সময় নতুন পে-স্কেলের ঘোষণা এবং এর বাস্তবায়ন কাঠামো তুলে ধরা হতে পারে বলে আভাস মিলেছে।

নতুন পে-কমিশনের আওতায় প্রায় ১৫ লাখ কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনার বা অবসরভোগী আর্থিক সুবিধার আওতায় আসবেন বলে জানা গেছে। 

সরকারি চাকরিজীবীদের সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণার পর দীর্ঘ এক দশকে জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েকগুণ বেড়েছে। বাসাভাড়া, চিকিৎসা খরচ ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীরা চাপে রয়েছেন। তাই দ্রুত জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৬-এর চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তারা।

ভাতায়ও বড় পরিবর্তন হবে : এদিকে নতুন পে-স্কেলে বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশের সুপারিশ করা হয়েছে। 

চিকিৎসা-ভাতা ৪০ বছর বা তার কম বয়সিদের জন্য মাসে ৪ হাজার টাকা এবং চল্লিশোর্ধ্ব বয়সিদের জন্য ৫ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। ১১ থেকে ২০তম গ্র্রেডের কর্মচারীদের জন্য টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা সুপারিশ করা হয়েছে। 

শিক্ষা ভাতা প্রতি সন্তান ১৫০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা, সর্বোচ্চ ২ সন্তান। এসব প্রস্তাব এখনও প্রস্তাবিত তালিকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন বের হলে সেটাই চূড়ান্ত হবে।

উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে দেশে প্রথম জাতীয় বেতন স্কেল চালু হয়। এরপর ২০১৫ সাল পর্যন্ত মোট আটবার নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর পরপর নতুন বেতন কাঠামো হওয়ার কথা থাকলেও করোনা মহামারি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ও রাজস্ব চাপে সেই প্রক্রিয়া পিছিয়ে যায়।

খুশি সরকারি চাকরিজীবীরা : এদিকে পে-স্কেল নিয়ে শঙ্কা কেটে যাওয়ায় সরকারি চাকিরজীবীদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। সরকারের এ সিদ্ধান্তে তারা বেজায় খুশি। 

এ মনোভাব জানিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা সময়ের আলোকে বলেন, পে-স্কেল ১৫ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর প্রাণের দাবি। আমরা সর্বশেষ বেতন কাঠামো পেয়েছি ২০১৫ সালে, অর্থাৎ আজ থেকে ১১ বছর আগে। এই ১১ বছরে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে কোথায় গেছে তার হিসাব নেই। শিক্ষা ব্যয়, কিচিৎসা ব্যয়- সব কিছুতেই ব্যয় বেড়েছে। 

তাই বেতন বাড়ানো খুবই দরকার ছিল। যদিও ৫ বছর পরপর নতুন বেতন কাঠামো করার কথা, কিন্তু সেটি হয়নি। এখন হওয়ায় আমরা বেজায় খুশি।

/এসএকে


  বিষয়:   অনিশ্চয়তা  বাস্তবায়ন  পে-স্কেল  সরকার  সরকারি  প্রধানমন্ত্রী 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: