বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা দৈনিক সময়ের আলোর বিশেষ সাক্ষাৎকারে বিমানবন্দরগুলোতে স্বর্ণ চোরাচালান রোধ, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, থার্ড টার্মিনাল চালু, টিকেট সিন্ডিকেট ভাঙা, পর্যটন খাত শক্তিশালী করা ও বিদেশি পর্যটকদের জন্য বিশেষ জোন গঠনসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি রফিক রাফি।
সময়ের আলো : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ‘থার্ড টার্মিনাল’ নিয়ে আপনাদের বর্তমান পরিকল্পনা কী?
বিমানমন্ত্রী : থার্ড টার্মিনাল নিয়ে বাংলাদেশ সরকার ও জাপান সরকারের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং আমরা একটি সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। আমাদের ইচ্ছা আছে এই বছরের মধ্যেই এটি চালু করার। তবে শেষ মুহূর্তের কাজ পুরোপুরি সমাপ্ত হতে যদি কিছুটা বিলম্বও হয়, তা হলে আগামী বছরের শুরুতেই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করা হবে। এই চুক্তিতে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
এই টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তিটি কি এ বছরই সম্পন্ন হবে?
হ্যাঁ, চুক্তি এই বছরের মধ্যেই হয়ে যাবে। আমরা ইতিমধ্যে আরএফপি (জঋচ) পাঠিয়ে দিয়েছি। এবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি একটি জাপানি প্রতিষ্ঠানও এর ব্যবস্থাপনায় যুক্ত থাকবে। ফলে আশা করা যায়, বিমানবন্দরের সেবার মান আগের চেয়ে অনেক উন্নত হবে। এ ছাড়া অন্য টার্মিনালগুলোর সেবা উন্নত করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিগত সরকারগুলোর সময়ে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক স্বর্ণ চোরাচালানের বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হতো। এই চোরাচালান রোধে আপনার মন্ত্রণালয় ও বর্তমান সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে?
স্বর্ণ চোরাচালান রোধ করা আমাদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। আমরা ইতিমধ্যে কঠোর সতর্কতা জারি করেছি। চোরাচালান ও অবৈধ পণ্য শনাক্ত করার জন্য আধুনিক কারিগরি যন্ত্রপাতি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কাস্টমস এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা প্রতিটি সংস্থাকে সর্বোচ্চ সততা ও সতর্কতার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান সরকার যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনছে। এর পেছনের মূল চিন্তাভাবনা বা উদ্দেশ্য কী?
মূলত দেশের যাত্রীদের সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করতেই এই বোয়িং উড়োজাহাজগুলো কেনা হচ্ছে। আমাদের আরও উড়োজাহাজ লাগবে। আমাদের লাভজনক রুট রয়েছে, কিন্তু উড়োজাহাজের অভাবে ফ্লাইট পরিচালনা করা যাচ্ছে না।
এতে আমরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের বিমানের সংখ্যা খুবই কম, যা দিয়ে বর্তমান চাহিদা মেটানো ও ফ্লাইট চালানো বেশ কষ্টকর। অথচ আমাদের বাংলাদেশি যাত্রীদের বিমানের টিকেটের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
এই নতুন বিমানগুলো বহরে যুক্ত হলে আমরা যেমন যাত্রীদের চাহিদা পূরণ করতে পারব, তেমনি এতদিন ধরে বিমানের যে লোকসানের কথা বলা হচ্ছে, সেই লোকসান কাটিয়ে বিমানকে একটি লাভজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারব। আমাদের আরও উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
অতীতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে অনেক ভর্তুকি দেওয়া সত্ত্বেও বারবার লোকসানের কথাই সামনে এসেছে। বিমানকে লাভজনক করতে আপনাদের পরিকল্পনা কী?
আমরা দায়িত্বে এসেছি দুই মাসের কিছু বেশি সময় হলো। এই অল্প সময়ে আমি যতটুকু স্টাডি করেছি, তাতে স্পষ্ট যে বিমান কোনো লোকসানি প্রকল্প নয়; এটি আসলে একটি লাভজনক প্রকল্প। আমরা যদি সবাই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করি, তবে বিমানকে অনেক ভালো জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
বিগত সময়ে বিমানকে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা হয়নি, বরং দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেকের নজর ব্যক্তিগত স্বার্থের দিকেই বেশি ছিল। আমার মন্ত্রণালয় এমনভাবে কাজ করবে যেন আমরা বিমানের সেই হারিয়ে যাওয়া সুনাম ফিরিয়ে আনতে পারি।
অতীতে বিমান ও পর্যটন খাতে অনেক অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে এবং তদন্তও হয়েছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে আপনাদের মন্ত্রণালয় কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেবে কি?
অবশ্যই, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্ণ পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিগত ১৭ বছরে অনিয়মের শিকড় অনেক গভীরে চলে গেছে, তাই কাজগুলো আমাদের একটু গুছিয়ে এবং ধীরে ধীরে করতে হচ্ছে। আমরা প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেব।
রাজনৈতিক দল সমর্থন করাটা অপরাধ নয়, কিন্তু যারা প্রকৃতপক্ষে অ্যাভিয়েশন খাত, বিমান ও দেশের ক্ষতি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা অত্যন্ত কঠিন সিদ্ধান্ত নেব।
বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সম্ভাবনা প্রচুর। এই খাতের মূল চালিকাশক্তি ট্যুর অপারেটররা প্রায়ই প্রণোদনা বা কর ছাড়ের দাবি জানান। পর্যটন শিল্পের বিকাশে তাদের জন্য কোনো চিন্তাভাবনা আছে কি?
হ্যাঁ, ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে আমরা দ্রুতই একটি বৈঠকে বসব। আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে পর্যটন খাতকে গতিশীল করতে একে বেসরকারিকরণ ও পিপিপি মডেলে নিয়ে যাওয়া। কারণ এতগুলো বছর এই খাতে কার্যকর কোনো কাজই হয়নি; সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পর্যটন আজ বিমানের চেয়েও খারাপ অবস্থায় আছে।
অথচ বাংলাদেশের এমন কোনো জেলা নেই, যেখানে ঐতিহ্যবাহী বা দর্শনীয় স্থান নেই। আমাদের অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এই খাতে অত্যন্ত আগ্রহী। তাই পিপিপির মাধ্যমে আমরা ট্যুরিজমকে একটি চমৎকার অবস্থানে নিয়ে যেতে পারব।
কক্সবাজার আমাদের সবচেয়ে বড় পর্যটন স্পট হলেও সেখানে বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা কম। কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক করা এবং বিদেশিদের আকৃষ্ট করার বিষয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?
কক্সবাজার বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক হওয়াটা প্রথম এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। তবে এর চেয়েও বড় বিষয় হলো সৈকতের নিরাপত্তা ও পরিবেশ নিশ্চিত করা।
বিদেশি পর্যটকরা কোথাও ভ্রমণের আগে নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভাবেন। আমরা ইতিমধ্যে ট্যুরিজম ও ট্যুরিস্ট পুলিশের সঙ্গে বৈঠক করেছি, যেন সমুদ্রসৈকত এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করা যায়।
এ ছাড়া আমরা পুরো কক্সবাজার সৈকতকে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার আওতায় এনে বেসরকারিকরণ করতে চাচ্ছি। বিচে যত্রতত্র কোনো দোকানপাট থাকবে না; বিচ থাকবে উন্মুক্ত ও পরিচ্ছন্ন।
আর সৈকত থেকে সরিয়ে নেওয়া দোকানগুলোর পুনর্বাসনের জন্য আমরা একটি খাসজমি নির্ধারণ করেছি, যেখানে একটি সুসজ্জিত ‘ঝিনুক শপিং মল’ তৈরি করা হবে। আইনশৃঙ্খলা ও পরিবেশ ঠিক করলেই বিদেশিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসবে, কারণ আমাদের মতো চমৎকার সমুদ্রসৈকত পৃথিবীর কোথাও নেই।
বিদেশিদের জন্য আলাদা কোনো বিশেষ জোন করা হবে কি না?
এগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। আমাদের প্রথম লক্ষ্য হলো দেশীয় বা অভ্যন্তরীণ পর্যটন ব্যবস্থা এবং এর পরিবেশকে পুরোপুরি ঠিক করা। আমাদের নিজেদের দেশের ভেতরেই বিপুলসংখ্যক পর্যটক আছেন, আগে তাদের জন্য উপযুক্ত কমফোর্ট জোন তৈরি করতে হবে।
এরপর যখন আমরা খাতটিকে পিপিপিতে নিয়ে যাব, তখন পরিবেশের আমূল পরিবর্তন ঘটবে এবং বিদেশিরাও এখানে এসে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন।
বিদেশি পর্যটকদের সুবিধার্থে দ্রুততম সময়ে ‘অন অ্যারাইভাল ভিসা’ দেওয়ার বিষয়ে আপনাদের কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
হ্যাঁ, আমরা এই সিস্টেমে অবশ্যই যাব। আমাদের থার্ড টার্মিনালটি চালু হয়ে গেলে এবং বিমানবন্দরের সার্বিক সেবার মান বৃদ্ধি পেলে অন অ্যারাইভাল ভিসার প্রক্রিয়াটি অনেক সহজ ও দ্রুতগতির করা সম্ভব হবে। তখন বিদেশি পর্যটকদের আর কোনো ভোগান্তিতে পড়তে হবে না।
পাশাপাশি আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই- বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বন্ধ থাকা ম্যানচেস্টার ও জাপানের রুট পুনরায় চালু করা হয়েছে। আগামীতে নিউইয়র্ক রুটটি চালু করার জোরালো চিন্তাভাবনা আমাদের রয়েছে।
এ ছাড়া আল্লাহর রহমতে এবার হজ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। বর্তমান সরকার হজের খরচ কমিয়েছে এবং সাধারণ মানুষের জন্য হজে যাওয়া আরও সহজ করতে আগামীতে এই খরচ আরও কমানোর পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।
টিকেট সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আপনার মন্ত্রণালয়ের অবস্থান কী হবে?
বিগত সরকারের সময়ে গড়ে ওঠা টিকেট সিন্ডিকেট অকার্যকর করতে মন্ত্রণালয় কাজ করবে। যাত্রীরা যেন সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে না পড়ে এবং সুলভ মূল্যে টিকেট পায়, সেই লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় কাজ করবে।
/এসএকে