অসহনীয় পর্যায়ে উঠেছে ডিমের বাজার। তিন বছর আগের রেকর্ড দামে ফিরেছে ডিমের বাজার। ফলে মাছ-মাংসের বিকল্প হিসেবে পুষ্টির ঘাটতি পূরণে ডিমের ওপর নির্ভরশীল নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বাড়তি চাপে পড়েছে।
টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে ডিমের ঊর্ধ্বমুখী দামে যেন কোনোভাবেই লাগাম টানা যাচ্ছে না। খামারি, আড়তদার, ছোট ব্যবসায়ী, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা-একাধিক ধাপ পেরিয়ে বর্তমানে ডজনপ্রতি ডিম কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা।
ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে কার্যকর মনিটরিংয়ের অভাব ও অতিরিক্ত হাতবদলের কারণেই ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণে আসছে না। তবে বিক্রেতারা বলছেন, খামার বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং উৎপাদন কমে যাওয়াই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও মিরপুর-৬ নম্বর কাঁচাবাজারসহ কয়েকটি পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে পাইকারিতে ডজনপ্রতি ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায়।
খুচরা পর্যায়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকায়। অথচ গত মাসেও একই ডজন ডিম বিক্রি হয়েছে ১০০ থেকে ১১০ টাকায়। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে এমন মূল্য বৃদ্ধিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা।
মিরপুর-৬ নম্বর কাঁচাবাজারের পাইকারি ডিম বিক্রেতা মাসুম সময়ের আলোকে বলেন, বর্তমানে তারা আড়ত থেকে লাল ডিম কিনছেন ডজনপ্রতি ১৩৪ টাকা ৪ পয়সায় এবং পাইকারিতে বিক্রি করছেন ১৪০ টাকায়।
এ ছাড়া সাদা ডিম ১২৪ টাকায় কিনে ১৩০ টাকায় বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, ‘একসঙ্গে বেশি ডিম কিনলে কিছু পচা ও ভাঙা ডিম থাকে। পাশাপাশি পলিথিন ও পরিবহন খরচও যোগ হয়। সব মিলিয়ে খরচ বেড়ে যায়। আবার শীতকালে ডিমের উৎপাদন তুলনামূলক বেশি থাকে, এখন তা কম।’
কারওয়ান বাজারের আরেক পাইকারি বিক্রেতা রাসেল বলেন, ‘খামার থেকে সরাসরি ডিম আনতে পারলে দাম অনেকটাই কম থাকত। খামারি থেকে শুরু করে আড়তদার, ছোট ব্যবসায়ী, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা-এই দীর্ঘ সরবরাহ ব্যবস্থার কারণেই দাম বাড়ছে। এ ছাড়া অনেক খামার বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং সরবরাহ কমে যাওয়াও বড় কারণ।’
তিনি জানান, ডিম ভাঙা ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে প্রতি পিস ডিমে তাদের লাভ থাকে ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, বেশি দামে কিনতে হওয়ায় তারাও বেশি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
মিরপুর এলাকার খুচরা ব্যবসায়ী সাব্বির বলেন, ‘আমরা ডজনপ্রতি ১৫০ টাকায় ডিম বিক্রি করছি। বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলেই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। আমাদের আসলে কিছু করার নেই।’
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত দুই দশকে ডিমের দামে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ২০০৬ সালে প্রতি হালি ডিমের দাম ছিল মাত্র ১২ টাকা। ২০০৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৬ টাকা ৮০ পয়সায়। ২০১২ সালে ৩৭ টাকা ১২ পয়সা, ২০১৫ সালে ৩৩ টাকা এবং ২০১৮ সালে ৩৪ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
পরে ২০২১ সালে হালি ডিমের দাম হয় ৩৯ টাকা ৪০ পয়সা। ২০২৩ সালে তা বেড়ে ৫৫ টাকায় পৌঁছায়। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে হালি বিক্রি হয়েছে ৫০ টাকায় এবং ২০২৬ সালে এসে তা আবার ৫২ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
‘সুপারফুড’ হিসেবে পরিচিত ডিমের এই বাড়তি দামে বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। লিজা আক্তার নামে এক গৃহিণী বলেন, ‘যে ডিম একসময় ১০০ টাকায় কিনেছি, এখন সেটাই দেড়শ টাকায় কিনতে হচ্ছে।
কয়েক সপ্তাহ ধরেই একই অবস্থা। আমাদের পরিবারের খাবারে ডিমই বেশি থাকত, কারণ এটি তুলনামূলক সস্তা ছিল। এখন সবজির সঙ্গে ডিমের দামও বেড়ে গেছে। সবকিছুর এই ঊর্ধ্বগতি নিম্নবিত্ত মানুষের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।’
ইমন হোসেন নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘মেসে ডিমই বেশি খাওয়া হয়। মাছ-মাংস না থাকলে সহজেই ডিম দিয়ে ভাত খেয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু এখন ডিমের দামও বেড়ে গেছে। আমাদের মতো হিসাব করে চলা মানুষের জন্য এটা বাড়তি চাপ তৈরি করছে।’
এদিকে ডিমের দাম বাড়লেও কিছুটা কমেছে মুরগির দাম। কুরবানির ঈদ সামনে রেখে বাজারে বয়লার ও সোনালি মুরগির দাম কিছুটা কমেছে।
বর্তমানে রাজধানীর বাজারগুলোতে বয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৭০ টাকায় এবং সোনালি মুরগি ৩২০ থেকে ৩৩০ টাকায়। কিছুদিন আগেও এসব মুরগির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা বেশি ছিল।
তবে সবজির বাজারে এখনও স্বস্তি নেই। অধিকাংশ সবজির দামই প্রায় ১০০ টাকার ঘরে। সব মিলিয়ে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দামে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন নগরবাসী।
/এসএকে