বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ মারাত্মক রূপ নেওয়ার পাশাপাশি এখন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের কিছু এলাকায় বড়দের বা প্রাপ্তবয়স্কদেরও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। টিকোনো কোনো হাসপাতালে প্রাপ্তবয়স্ক হাম রোগীদের জন্য আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ডও চালু করা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম শিশুদের জন্য যতটা উদ্বেগের, বড়দের জন্য ততটা নয়।
বাংলাদেশে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে হাম ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। গত কয়েক বছরে শিশুদের ঠিকমতো হামের টিকা না দেওয়াকেই এই প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বড়রাও কি আক্রান্ত হচ্ছেন?
ঢাকার ডিএনসিসি হাসপাতাল ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালসহ রংপুরের মতো দেশের বিভিন্ন স্থানে ২০ বছরের বেশি বয়সীদের হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির খবর পাওয়া গেছে। তবে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানিয়েছেন, বড়দের অবস্থা গুরুতর নয় এবং যথাযথ চিকিৎসায় তারা সেরে উঠছেন। ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালে শিশুদের জন্য পৃথক ওয়ার্ডের পাশাপাশি বার বছরের বেশি বয়েসিদের জন্য 'ইনফেকশাস ব্লক' করা হয়েছে।
অন্যদিকে, স্বাস্থ্য বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে বড়দের হামে আক্রান্ত হওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো রিপোর্ট এখনো তাদের কাছে পৌঁছায়নি।
বড়রা কেন আক্রান্ত হচ্ছেন?
স্বাস্থ্য বিভাগের উপপরিচালক সৈয়দ আবু আহাম্মদ শফি জানান, সাধারণত বড়দের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকায় তাদের আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা কম থাকে। তবে নানা কারণে কারও শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে তিনিও শিশুদের মতো একইভাবে হামে আক্রান্ত হতে পারেন। বিশেষ করে অন্য রোগের কারণে যারা দুর্বল, যারা ক্যানসার বা যক্ষ্মার মতো জটিল রোগে আক্রান্ত কিংবা চিকিৎসার জন্য স্টেরয়েড নিতে হচ্ছে, তারা সহজে আক্রান্ত হন। এছাড়া ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে যে কেউ হামে আক্রান্ত হতে পারে। ব্যাপকভাবে হাম ছড়িয়ে পড়ার কারণে বর্তমানে এই হার্ড ইমিউনিটি আর কার্যকর নেই বলেই মনে করা হচ্ছে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেনের মতে, বড়দের মধ্যে যারা ক্যানসারের চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি বা কেমোথেরাপি নিচ্ছেন কিংবা কিডনি ডায়ালাইসিস করাচ্ছেন, হামের ক্ষেত্রে মূলত তাদের ঝুঁকিই সবচেয়ে বেশি থাকে। এর বাইরে সাধারণ প্রাপ্তবয়স্করা আক্রান্ত হলেও চিকিৎসায় দ্রুত সেরে ওঠেন। হামের মূল ঝুঁকি মূলত শিশুদের জন্যই, আর সে কারণেই শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেওয়া হয়।
বিশ্বব্যাপী হামের পুনরুত্থান
শুধু বাংলাদেশই নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশেও হামের প্রাদুর্ভাব নতুন করে ফিরে আসছে। চিকিৎসা বিষয়ক জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক হামের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড মহামারির সময়ে নিয়মিত টিকাদানে ব্যাঘাত এবং কিছু দেশে টিকা বিরোধী প্রচারণার কারণে বিশ্বজুড়ে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকার হামের টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করেছে। আগে শিশুদের ৯ মাসে এই টিকা দেওয়া হলেও এখন তা কমিয়ে ৬ মাসে আনা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, ৮০ শতাংশের বেশি শিশু টিকার আওতায় চলে এলে আবারও সমাজে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হবে এবং সংক্রমণ কমে আসবে।
সময়ের আলো/জেডি