বাংলাদেশ ক্রিকেটে অনেক দৃশ্যই এখন পরিচিত। কঠিন সময়ে দলের ধস নামছে, চাপ বাড়ছে, প্রতিপক্ষ আগ্রাসী হয়ে উঠছে, আর ঠিক তখনই ব্যাট হাতে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন একজন। মুশফিকুর রহিম। যেন বছরের পর বছর ধরে একই গল্পের নতুন সংস্করণ দেখছে বিশ্ব ক্রিকেট। তাই আর অবাক হওয়ারও কিছু নেই। কারণ দলের বিপদের দিনে ব্যাট হাতে লড়াই করা, ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া কিংবা নিজের নামের পাশে নতুন সব রেকর্ড যোগ করা মুশফিকের জন্য নতুন কিছু নয়ই।
কিছু কিছু বিষয় চোখের সামনেই থাকে, অথচ সেভাবে নজরে আসে না। মুশফিকুর রহিমের ক্যারিয়ার ঠিক তেমনই এক গল্প। ভারতের মাটিতে সেঞ্চুরি আছে, পাকিস্তানে আছে, শ্রীলঙ্কা, নিউজিল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজেও আছে টেস্ট সেঞ্চুরি। দেশের বাইরে খুব বেশি মানুষ হয়তো খেয়ালই করেন না, তিনি যে ইতিমধ্যেই খেলেছেন ১০১টি টেস্ট। নিজের শততম টেস্টে পৌঁছানোর সময়ও তার ব্যাটিং গড় ছিল প্রায় ৩৯। এত দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেকে টিকিয়ে রাখা, ধারাবাহিক থাকা এবং ক্রমাগত নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলা মোটেও সহজ কাজ নয়।
মুশফিকের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই। তিনি কখনো নিজের অর্জনে আটকে থাকেননি। সময়ের সঙ্গে নিজের ব্যাটিং বদলেছেন, মানসিকতা বদলেছেন, প্রস্তুতির ধরন বদলেছেন। আর তাই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে ধারাবাহিক ও প্রভাবশালী ব্যাটারদের একজন তিনি। অথচ দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক সময়ই সাকিব আল হাসান বা সেরা সময়ের তামিম ইকবালের আলোচনার ভিড়ে খানিকটা আড়ালেই থেকেছেন মুশফিক। কিন্তু বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ভিত শক্ত করার পেছনে তার অবদান অনস্বীকার্য। সিলেট টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে তার সবশেষ ইনিংসটিও (গতকাল) যেন পুরো ক্যারিয়ারের প্রতিচ্ছবি। শুধু একটি শতরান নয়, এটি ছিল অভিজ্ঞতা, ধৈর্য, মানসিক দৃঢ়তা আর প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলে দেওয়ার এক নিখুঁত উদাহরণ।
মোহাম্মদ আব্বাসকে বাউন্ডারি হাঁকিয়ে বলের দিকে এক ঝলক তাকিয়েই বুঝে গিয়েছিলেন সেঞ্চুরি হয়ে গেছে। বল বাউন্ডারি ছোঁয়ার আগেই শুরু হলো উদযাপন। দুই হাত ছড়িয়ে চিৎকার, তারপর মোহাম্মাদ আব্বাসের দিকে হুংকার। ব্যাট ছুড়ে ফেলা, হেলমেট উঁচিয়ে ধরা, আকাশের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। সব মিলিয়ে এক আবেগঘন, বিস্ফোরক উদযাপন। সাধারণত শান্ত স্বভাবের মুশফিকের এমন রূপ খুব বেশি দেখা যায় না। তবে এবার তার পেছনে ছিল জমে থাকা উত্তাপও।
সেঞ্চুরির আগে পাকিস্তান অধিনায়ক শান মাসুদের সঙ্গে কথাকাটাকাটি হয় তার। সেই উত্তেজনার রেশ ছড়িয়ে পড়ে তাইজুল ইসলাম ও সৌদ শাকিলের মধ্যেও। মাঠের সেই মানসিক লড়াই যেন আরও জ্বালানি জুগিয়েছিল মুশফিককে। তিনি জবাব দিলেন নিজের সবচেয়ে পরিচিত অস্ত্র দিয়ে, ব্যাট হাতে।
তৃতীয় দিনের সকালে যখন ক্রিজে যান, তখন ম্যাচের অবস্থা মোটেও সহজ ছিল না। মেঘলা আকাশ, পাকিস্তানি পেসাররা ছিলেন দারুণ ছন্দে। দ্রুতই আউট হন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। সেই মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল একজন অভিভাবকের। মুশফিক আবারও হয়ে উঠলেন সেই মানুষটি।
শুরুর কঠিন সময় পার করলেন ধৈর্য আর কৌশল দিয়ে। এরপর ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিলেন নিজের হাতে। লিটন দাসকে নিয়ে গড়ে তুললেন শতরানের জুটি। টেস্টে পঞ্চম বা এর নিচের উইকেটে এটি ছিল তাদের সপ্তম শতরানের জুটি। ইতিহাসে তাদের ওপরে আছে কেবল ইংল্যান্ডের জো রুট ও বেন স্টোকসের জুটি, যাদের আছে ৮টি শতরানের পার্টনারশিপ।
লিটন ফিরে যাওয়ার পরও থামেননি মুশফিক। তাইজুল ইসলামকে নিয়ে ইনিংসকে আরও এগিয়ে নিলেন। চা-বিরতিতে যান ৯০ রানে।
বিরতির আগে শান মাসুদদের সঙ্গে উত্তেজনার ঘটনাও তখন টগবগ করছে। বিরতির পর আব্বাসের একটি বল তার পায়ে লাগলে রিভিউ নেয় পাকিস্তান। বড় পর্দায় দেখা গেল বল স্টাম্পের ওপর দিয়ে চলে যেত। হতাশ পাকিস্তানি খেলোয়াড়রা কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকলেন মাঠেই। আর ঠিক তার কিছু পরেই ১৭৮ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করলেন মুশফিক।
সেঞ্চুরির পরও থামেননি। আবার নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে ইনিংসকে আরও বড় করেছেন। শেষ পর্যন্ত আউট হয়েছেন ১৩৭ রানে, যখন বাংলাদেশ এগিয়ে ৪৩৬ রানে। অর্থাৎ তার ইনিংসই পাকিস্তানকে কার্যত ম্যাচের বাইরে ছিটকে দিয়েছে।
এই শতক তাকে নিয়ে গেছে আরেকটি অনন্য উচ্চতায়ও। বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি টেস্ট সেঞ্চুরির রেকর্ডে এতদিন মুমিনুল হকের সঙ্গে যৌথভাবে ছিলেন তিনি। এখন ১৪ সেঞ্চুরি নিয়ে এককভাবে সবার ওপরে মুশফিক। একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটার হিসেবে পূর্ণ করেছেন ১৬ হাজার আন্তর্জাতিক রান।
তবে এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়। এর পেছনে আছে বছরের পর বছর ধরে চলা ত্যাগ, শৃঙ্খলা, পরিশ্রম আর নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এক নিরন্তর যুদ্ধ। ছুটি ভুলে অনুশীলন, সবার আগে মাঠে আসা, ক্লান্তিকে পাশ কাটিয়ে প্রস্তুতি, প্রত্যাশার চাপ সামলে নিজেকে উঁচুতে তুলে নেওয়া এই বিষয়গুলো সাক্ষ্য দেয় ক্যারিয়ারের শেষ বেলায়ও কতটা নির্ভরতা হয়ে উঠেছেন তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেটে। আর তাই সিলেটে পাকিস্তানের বিপক্ষে এই ইনিংস দেখে নতুন করে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ এমন ইনিংস খেলা তো আর নতুন নয় মুশফিকের!
আরবিএন