রাজধানীর মিরপুরের ঐতিহাসিক হযরত শাহ আলী (র.) মাজারে মানতের টাকা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে লুটপাট করার উদ্দেশ্যেই বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাতে একটি স্বার্থান্বেষী মহল বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছে বলে তীব্র অভিযোগ তুলেছেন দেশের বিশিষ্ট রাষ্ট্রচিন্তক ও কবি ফরহাদ মজহার।
হামলাকারী ও এর নেপথ্যের উস্কানিদাতাদের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘দেশে ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান হয়েছে এবং স্বৈরাচারী শেখ হাসিনাও এই দেশে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেননি। অতএব মাজারের টাকা লুটের অপচেষ্টা এবং নিরীহ ভক্তদের ওপর হামলা চালিয়ে আপনারাও এই দেশে কোনোভাবেই টিকে থাকতে পারবেন না।’
মঙ্গলবার (১৯ মে) বিকেলে মিরপুর শাহ আলী মাজার প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক বিশেষ গণঅবস্থান ও ঐতিহ্যবাহী ভাবগানের আসরে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন।
গত বৃহস্পতিবার রাতে মিরপুরের এই ঐতিহাসিক মাজারে সংঘটিত অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ ও দোষীদের শাস্তির দাবিতে ‘সাধু-গুরু-ভক্ত ও ওলি-আওলিয়া আশেকান পরিষদ’ এবং ‘ভাববৈঠকী’ যৌথভাবে এই বিশাল গণঅবস্থান কর্মসূচির আয়োজন করে। সমাবেশে ফরহাদ মজহার স্পষ্ট করে বলেন, এই পবিত্র মাজারে সাধারণ মানুষের দেওয়া মানতের যে টাকা ওঠে, সেটা মূলত এখানকার অসহায় ও আধ্যাত্মিক পাগলদের প্রধান হক।
এই টাকা জোরপূর্বক লুটে নেওয়ার হীন উদ্দেশ্যে কিছু লোক সেখানে গাঁজা খাওয়ার মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ তুলে এই ন্যাক্কারজনক হামলা চালিয়েছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা এই মাজারে শান্তিপূর্ণভাবে ঐতিহ্যবাহী ভাবগান করি। আমাদের এই আধ্যাত্মিক সংস্কৃতিতে যদি নতুন করে আঘাত করা হয়, তবে আমরা আর চুপচাপ বসে থাকবো না, বরং চুপে চুপে আসা যেকোনো আঘাতের বিরুদ্ধে সবাই মিলে শক্তভাবে রুখে দাঁড়াবো।
এর আগে মিরপুর শাহ আলী মাজারে হামলার এই ঘটনায় স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার বিষয়ে তীব্র অভিযোগ উঠলেও ফরহাদ মজহার এই হামলার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে কোনো দলকে সরাসরি দায়ী করেননি। তবে এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়টির স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেমের সঙ্গে তার ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে তিনি উপস্থিত সবাইকে অবহিত করেন।
মাজারের ভেতরের নানা অনিয়ম তুলে ধরে তিনি বলেন, এখানে দীর্ঘদিন ধরে ইজারাব্যবস্থার নামে মাজারের কোটি কোটি টাকা লুটপাট করা হচ্ছে। মাত্র ১০ হাজার টাকায় এক একটি দোকান সরকারি ইজারা নিয়ে পরবর্তীতে সাধারণ ব্যবসায়ীদের কাছে অবৈধভাবে ১ লাখ টাকায় বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে ইজারাদাররা আঙুল ফুলে কলাগাছ হলেও সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। তিনি ঘোষণা দেন, এই মাজার আমাদের সবার এবং এই মাজারকে আমরাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখবো, কিন্তু ইজারাদারদের নাম দিয়ে কোনোভাবেই পাগল ও ভক্তদের টাকা লুটে নিতে দেওয়া হবে না।
মাজারের শান্তিপ্রিয় পাগল ও ভক্তদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘আমি সকল পাগলদের বলবো- আমাদের অবশ্যই এই মাজারের চিরন্তন আদব ও পবিত্রতা রক্ষা করে চলতে হবে। যাতে করে কেউ বাইরে থেকে এসে আমাদের বিরুদ্ধে গাঁজাখোর বলে মিথ্যা অভিযোগ তোলার সুযোগ না পায় এবং এখানে কোনো ধরনের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করতে না পারে। আমাদের নিজেদের আচরণের মধ্যেও যেন কোনো উচ্ছৃঙ্খলতা প্রকাশ না পায়।
দেশের আপামর ছেলে, মেয়ে, বউ ও পরিবারসহ সকলকে মিলে আমাদের এই পবিত্র মাজারের সুন্দর ও ধর্মীয় পরিবেশ রক্ষা করে চলতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, আমাদের সবাইকে অত্যন্ত ঐক্যবদ্ধভাবে মাজারের অসহায় পাগলদের রক্ষা করতে হবে। এখানকার ত্রুটিপূর্ণ ইজারাব্যবস্থা চিরতরে বন্ধ করতে হবে এবং মাজারে ভক্তদের মাধ্যমে যা কিছু দান আসে, সেটা যেন এখানকার স্থানীয় গরিব মানুষেরাই পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতা জায়েদ বিন নাসেরের সভাপতিত্বে এবং ভাববৈঠকীর প্রধান সমন্বয়কারী মোহাম্মদ রোমেলের সার্বিক পরিচালনায় এই প্রতিবাদী গণঅবস্থানে দেশের আরও অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
এদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, বাসদের (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় নেতা জসীম উদ্দিন, এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তরের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী সাইফুল ইসলাম, সদস্য তাহমিনা শারমিন যুঁথি, শফিকুল ইসলাম রানা খান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শাহ আলী থানা শাখার সাবেক আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম মিঠু, বিশিষ্ট লেখক উদয় হাসান এবং সাংবাদিক নাহিদুল ইসলাম প্রমুখ।
মাজারে এই সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদের একই দিন দুপুরের পর থেকে বিপুল সংখ্যক সাধারণ ভক্ত, আশেকান ও সাধু-গুরু শাহ আলী মাজার প্রাঙ্গণে এক বিশাল মানববন্ধন ও প্রতিবাদী বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। প্রায় আধা ঘণ্টাব্যাপী স্থায়ী এই শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন শেষে একটি বড় বিক্ষোভ মিছিলটি শাহ আলী এলাকার বিভিন্ন প্রধান প্রধান সড়ক ও ওলি-গলি প্রদক্ষিণ করে।
এ সময় বিক্ষুব্ধ ভক্ত ও আশেকানরা ‘শাহ আলী মাজারে হামলা কেন, জবাব চাই জবাব চাই’, ‘ফকিরের গায়ে হামলা কেন, জবাব চাই জবাব চাই’, ‘জঙ্গিবাদের আস্তানা, ভেঙে দাও গুড়িয়ে দাও’ এবং ‘লেগেছে রে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে’ ইত্যাদি নানা স্লোগান দিয়ে গোটা মিরপুর এলাকা মুখরিত করে তোলেন।
সময়ের আলো/টিএইচ