সিলেট টেস্টের চতুর্থ দিনের শেষ বিকালে যখন সালমান আলি আগা ও মোহাম্মাদ রিজওয়ানের জুটি ক্রমেই লম্বা হচ্ছিল, তখন খানিকটা শঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলাদেশ শিবিরে। জয়ের গন্ধ পাওয়া ম্যাচ হঠাৎই যেন গড়াচ্ছিল অন্য দিকে।
তবে সেই চাপের মুহূর্তেই নতুন বলে আঘাত হানলেন তাইজুল ইসলাম। এক ওভারে ভাঙলেন বড় জুটি, পরের ওভারেই তুলে নিলেন আরও একটি উইকেট, মুহূর্তেই বদলে গেল ম্যাচের আবহ।
আর সেই কারণেই দিন শেষে বাংলাদেশের ড্রেসিং রুমে হতাশা নয়, ছিল স্বস্তি আর আত্মবিশ্বাসের হাসি। বোলিং কোচ শন টেইটও জানিয়ে দিলেন, কঠিন একটা দিন পার করেও দলের বিশ্বাসে কোনো চিড় ধরেনি।
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ৪৩৭ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে চতুর্থ দিন শেষে পাকিস্তানের সংগ্রহ ৭ উইকেটে ৩১৬ রান। জয়ের জন্য এখনও তাদের প্রয়োজন ১২১ রান, বাংলাদেশের দরকার আর ৩টি উইকেট। তাতেই নিশ্চিত হবে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ।
দিনের বড় একটা সময় ম্যাচে দাপট ছিল পাকিস্তানের ব্যাটারদের। বিশেষ করে সালমান আলি আগা ও মোহাম্মাদ রিজওয়ান টাইগার বোলারদের হতাশ করে গড়েন ১৩৪ রানের জুটি। উইকেট ছিল ব্যাটিংয়ের জন্য বেশ সহায়ক, আর গরম ও ক্লান্তিকর আবহাওয়ায় বোলারদের কাজও সহজ ছিল না।
নতুন বল নেওয়ার পর প্রথম ওভার শেষে পাকিস্তানের রান ছিল ৫ উইকেটে ২৯০। পরের ওভারে বল হাতে আসেন তাইজুল ইসলাম। প্রথম বলেই ফুলটস, আর সেটিকে গুলির গতিতে বাউন্ডারিতে পাঠান সালমান। তখন স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে।
কিন্তু অভিজ্ঞ তাইজুল খুব দ্রুতই ম্যাচ ঘুরিয়ে দেন। একই ওভারে দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে বোল্ড করেন সালমানকে।
এরপর নিজের পরের ওভারেই ফেরান হাসান আলিকে। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আবার শক্তভাবে বাংলাদেশের হাতে চলে আসে।
দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে শন টেইট বললেন, ‘ক্রিকেটের জন্য দিনটি শেষ পর্যন্ত বেশ ভালোই ছিল। দুই দলই ভালো ক্রিকেট খেলেছে। ওরা খুব ভালো ব্যাটিং করেছে। উইকেটও ব্যাটিংয়ের জন্য বেশ ভালো ছিল।
আমার মনে হয়, আমাদের ছেলেরা লড়াইয়ে টিকে ছিল, প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিল। ওরা কিছু সময়ের জন্য আমাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছিল বটে। শেষের দিকে ওই দুটো উইকেট নেওয়াটা জরুরি ছিল। শেষ পর্যন্ত আমরা বেশ খুশিমনেই ড্রেসিংরুমে ফিরছি।’
পুরো সিরিজেই বাংলাদেশের বোলাররা দুর্দান্ত পারফর্ম করেছেন। তবে চতুর্থ দিনে তাদের কিছুটা এলোমেলোও দেখিয়েছে। যদিও টেইট কঠোর সমালোচনার পথে হাঁটেননি।
বরং তিনি মনে করিয়ে দিলেন, প্রতিদিন একই রকম পারফরম্যান্স সম্ভব নয়, ‘আমার মনে হয় ওরা বেশ ভালো বোলিং করেছে। দেখুন, সাম্প্রতিক সময়ে বোলাররা আমাদের দারুণ কিছু সময় এনে দিয়েছে এবং এতে যা হয়, প্রতিদিন আপনারা একই রকম আশা করেন।
কিন্তু ক্রিকেটে সবসময় তা সেভাবে কাজ করে না। আমার মনে হয় ওরা যথেষ্ট ভালো বোলিং করেছে, যা আমাদের এখন একটি ভালো অবস্থানে নিয়ে এসেছে।’
শন টেইট আরও যোগ করেন, ‘কাজটা কঠিন ছিল, প্রচণ্ড গরম ছিল, আমার মনে হয়, আজই ছিল সবচেয়ে বেশি গরম। আমার কাছে তেমনই মনে হয়েছে। কঠিন পরিস্থিতি ছিল। উইকেটও আজকে সত্যিই ভালো হয়ে গিয়েছিল। যদিও এসব কোনো অজুহাত নয়। তবে যেটা বললাম, সবকিছুর পরও আমরা ভালো অবস্থানে আছি।’
সালমান-রিজওয়ানের জুটি যখন বাংলাদেশকে চাপে ফেলছিল, তখন ডাগআউটেও যে কিছুটা উত্তেজনা ছিল, সেটি স্বীকার করেছেন টেইট, ‘কিছুটা উত্তেজনা ছিল... ওই রান আউটটা খুব ‘ক্লোজ’ ছিল। ডাগআউটে কিছুটা উত্তেজনা ছিল, কারণ আমাদের মনে হচ্ছিল, ব্রেক থ্রু জরুরি। এরপর তাইজুলের মাধ্যমে তা এলো...।’
তবে ব্যক্তিগতভাবে খুব বেশি দুশ্চিন্তায় ছিলেন না বলেও দাবি করেন সাবেক অস্ট্রেলিয়ান পেসার, ‘কিছুটা উত্তেজনা ছিল, তবে টেনশন? আমি নিশ্চিত নই। আমি ব্যক্তিগতভাবে টেনশনে ছিলাম না, কিন্তু আমার আশপাশে হয়তো দুয়েকজন কিছুটা টেনশনে ছিল।’
টেইট মনে করিয়ে দিলেন, টেস্ট ক্রিকেটে এক সেশনেই ম্যাচের চিত্র বদলে যেতে পারে। তাই ধৈর্য ধরে লড়াই চালিয়ে যাওয়াটাই ছিল বাংলাদেশের পরিকল্পনা, ‘আমরা ড্রেসিংরুমে আলোচনা করছিলাম, যতটা সম্ভব লড়াইয়ে টিকে থাকার ব্যাপারে, কারণ কেউ জানে না, কখন কী ঘটে যেতে পারে।
আমরা জানতাম, যথেষ্ট ভালো বোলিং করলে এবং সারা দিন ধরে যথেষ্ট সময় লড়াইয়ে টিকে থাকলে শেষ সময়ে দুয়েকটা উইকেট তুলে নেওয়া যায়, যা আমরা পেরেছি।’
পাকিস্তানের ব্যাটারদেরও কৃতিত্ব দিতে ভুল করেননি তিনি, ‘আমি জানি, এমন অনেকেই আছেন যারা আজ এখানে এসেছেন এটা ভেবে যে খেলা শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু পাকিস্তান আজ সত্যিই খুব ভালো খেলেছে।’
তবে শেষ দিনের আগে আত্মবিশ্বাসী টেইট। পাকিস্তান বিশ্বরেকর্ড গড়ে জিতে যেতে পারে কি না, এমন প্রশ্নে তার উত্তর ছিল স্পষ্ট, ‘আমার মনে হয় আমরা ওদেরকে অল আউট করে দেব। ওদেরকে গুটিয়ে দেব, আশা করি...।’
/এসএকে