মাঠে গতি আর ড্রিবলিংয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের স্তব্ধ করে দেওয়া আর্সেনালের তারকা উইঙ্গার বুকায়ো সাকা আজ বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় নাম। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করে ইংল্যান্ডকে ঐতিহাসিক ব্রোঞ্জ পদক এনে দেওয়া এই তরুণের বর্তমান সাফল্যের পেছনের গল্পটি মোটেও সহজ ছিল না। চরম মানসিক বিপর্যয় ও বর্ণবাদের অন্ধকার কাটিয়ে সাকার এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প যেকোনো মানুষের জন্য এক দারুণ অনুপ্রেরণা।
সাকার জন্ম লন্ডনে হলেও তার বাবা-মা নাইজেরিয়া থেকে উন্নত জীবনের আশায় যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন। নাইজেরিয়ার ইয়োরুবা ভাষায় ‘বুকায়ো’ শব্দের অর্থ হলো ‘সুখ সংযোজন করা’। ছোটবেলা থেকেই সাকার বাবা ইয়োমি সাকা ছিলেন তার ফুটবলার হওয়ার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। সাকা সবসময় কৃতজ্ঞতা ভরে স্মরণ করেন যে, তার বাবা তাকে যেকোনো পরিস্থিতিতে বিনয়ী ও মাটিতে পা দিয়ে চলতে শিখিয়েছেন, যা আজ তাকে এত বড় তারকা হতে সাহায্য করেছে।
অনেকেই মনে করেন ফুটবলাররা পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকেন, কিন্তু সাকার ক্ষেত্রে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। লন্ডনের গ্রিনফোর্ড হাই স্কুলে পড়ার সময় তিনি পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। যুক্তরাজ্যের অত্যন্ত কঠিন মাধ্যমিক পরীক্ষায় দারুণ ফলাফল করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। ফুটবলার না হলে সাকা হয়তো আজ নামকরা অভিনেতা বা বাস্কেটবল খেলোয়াড় হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তেন।
সাকার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মানসিক পরীক্ষার মুহূর্তটি আসে ২০২১ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে। ইতালির বিপক্ষে টাইব্রেকারে ইংল্যান্ডের হয়ে শেষ পেনাল্টি শটটি মিস করেন তিনি। এর ফলে ইংল্যান্ড শিরোপা হারায় এবং সাকাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার হতে হয়। কিন্তু সাকা ভেঙে পড়েননি।
সাকার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় ও আনন্দের রাতটি আসে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে। ফ্রান্সের বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী (ব্রোঞ্জ মেডেল) ম্যাচে তিনি এক মহাকাব্যিক হ্যাটট্রিক করেন। ১০ গোলের সেই রোমাঞ্চকর ম্যাচে ইংল্যান্ড ৬-৪ ব্যবধানে জয় পায়। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ডের এটিই সেরা সাফল্য, যেখানে সাকা তার নাম ইতিহাসের পাতায় অমর করে নেন। শূন্য থেকে শিখরে পৌঁছানোর এই গল্প সাকাকে শুধু একজন ফুটবলার নয়, বরং একবিংশ শতাব্দীর এক সত্যিকারের নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ম্যাচ শেষে সাকা বলেন, ‘এটা অসাধারণ অনুভূতি। ম্যাচটি আমি দারুণ উপভোগ করেছি এবং এটি আমার জন্য বড় একটি অর্জন। একটু আগেই জানতে পারলাম, বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের হয়ে হ্যাটট্রিক করা খেলোয়াড় মাত্র চারজন। আর সেই তালিকায় যাদের নাম রয়েছে, তারা সবাই কিংবদন্তি। এমন একটি এলিট তালিকার অংশ হতে পেরে আমি সত্যিই গর্বিত।’
বিশ্বকাপ শেষ করার অনুভূতি জানাতে গিয়ে সাকা বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল টুর্নামেন্টটা ভালোভাবে শেষ করা। দলের সবাই মনে করত, আমাদের ফাইনালেই থাকা উচিত ছিল। আমাদের বিশ্বাস ছিল আমরা শিরোপার জন্য লড়তে পারতাম। কিন্তু বাস্তবতা ছিল, আজ আমাদের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলতে হয়েছে। তাই আমরা চেয়েছিলাম জয়ের মধ্য দিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করতে। সেটা করতে পেরে আমি খুব খুশি।’
ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমে কোচ টুখেলের বার্তাও তুলে ধরেন সাকা। তিনি বলেন, ‘কোচ আমাদের বলেছেন, তিনি আমাদের নিয়ে খুব গর্বিত এবং আমাদের খুব মিস করবেন। আমরাও তাকে এবং একে অপরকে মিস করব। গত ছয়-সাত সপ্তাহে আমরা দারুণ একটি বন্ধন তৈরি করেছি। আজকের (রোববার) পারফরম্যান্স নিয়ে আমরা গর্বিত। এবার লক্ষ্য থাকবে, পরেরবার শিরোপা জেতা।’
ইউরোর সেই কান্নাভেজা রাত থেকে ২০২৬ বিশ্বকাপের হ্যাটট্রিকের আনন্দ। বুকায়ো সাকার এই পথচলা কেবল একজন ফুটবলারের গল্প নয়। এটি হলো অন্যায়, বর্ণবাদ আর ভাগ্যের বিরুদ্ধে লড়ে জিতে যাওয়ার এক জীবন্ত রূপকথা। ফুটবল মাঠের এই ‘লড়াকু নায়ক’ প্রমাণ করেছেন যে, প্রবল ইচ্ছা আর সঠিক মূল্যবোধ থাকলে যেকোনো অন্ধকার টপকে আলোর শিখরে পৌঁছানো সম্ভব।
সময়ের আলো/এসএকে