টিকার ব্যাপারে ১০ বার সতর্ক, ৫ বার চিঠি ইউনিসেফের

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

ইউনিসেফ জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সম্ভাব্য টিকা সংকট নিয়ে অন্তত পাঁচ থেকে ছয়টি চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল।

2026-05-21T02:36:38+00:00
2026-05-21T02:36:38+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
টিকার ব্যাপারে ১০ বার সতর্ক, ৫ বার চিঠি ইউনিসেফের
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ২:৩৬ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
ইউনিসেফ জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সম্ভাব্য টিকা সংকট নিয়ে অন্তত পাঁচ থেকে ছয়টি চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। পাশাপাশি ১০টি বৈঠকেও সরকারের কর্মকর্তাদের একই বিষয়ে অবহিত করা হয়। সংস্থাটির মতে, টিকা ক্রয় প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার কারণেই দেশে সময়মতো টিকা পৌঁছায়নি।

বুধবার দুপুরে রাজধানীতে ইউনিসেফ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স। তিনি বলেন, ‘ভালো খবর হচ্ছে, ১ কোটি ৮০ লাখের বেশি শিশু হামের টিকা পেয়েছে। বর্তমানে হাম নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’

দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা সংবাদ সম্মেলনে টিকা সংকটের কারণ, সংকট মোকাবিলায় ইউনিসেফের ভূমিকা এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলেন তিনি। এ সময় তিনি বারবার উল্লেখ করেন, হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। টিকা সংকট ও হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনা তদন্তে সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ইউনিসেফ সবসময় সত্যের পক্ষে। তদন্তে সহায়তা করা হবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,  টিকার ব্যাপারে ১০ বার সতর্ক, ৫ বার চিঠি দেওয়া হয় ইউনিসেফ সবসময় সত্যের পক্ষে।’

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সরকার চাইলে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কিনতে পারে। তবে টিকার পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত রাখা জরুরি। কারণ উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ করতে প্রায় এক বছর সময় লাগে, অথচ ইউনিসেফের মাধ্যমে তুলনামূলক দ্রুত টিকা সংগ্রহ করা সম্ভব।

তিনি জানান, চলতি বছর দেশে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৬০ হাজারের বেশি মানুষ, যাদের বেশিরভাগই শিশু। ইতিমধ্যে এই ভাইরাসে মারা গেছে ৪৭৫ জন। বাংলাদেশে হামে এত মৃত্যুর ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। গত আড়াই দশকে দেশে হামের সংক্রমণ কখনো ৫০ হাজার ছাড়ায়নি।

তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, এর আগে দেশে হামের সর্বোচ্চ রোগী শনাক্ত হয়েছিল ২০০৫ সালে ২৫ হাজার ৯৩৪ জন। এরপর রোগীর সংখ্যা কমতে থাকে। ২০২৫ সালে দেশে মাত্র ১৩২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রোগীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২ হাজার ৪১০, ২০৩, ৩১১, ২৮১ ও ২৪৭। ওই সময়ে হামে মৃত্যুর ঘটনাও ছিল না। তবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে দেশে হামের প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামের টিকাদানে গাফিলতির কারণেই এবার বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ১ কোটি ৭৮ লাখ হামের টিকা আসে, যা মোট চাহিদার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। অথচ দেশে বছরে প্রায় ৭ কোটি হামের টিকার প্রয়োজন হয়। দীর্ঘ সময় পর্যাপ্ত রুটিন টিকা না থাকায় বহু শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়।

ইউনিসেফ জানায়, টিকার ঘাটতির বিষয়টি নিয়ে তারা ২০২৪ সাল থেকেই সরকারকে সতর্ক করে আসছিল। এ বিষয়ে অন্তত ১০টি বৈঠক করা হয় এবং পাঁচ থেকে ছয়টি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়। শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছিল।

রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ‘আমাদের কাছে এই মুহূর্তে সুনির্দিষ্ট দিন-তারিখ নেই। তবে তদন্তে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। আমরা ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ-ছয়টি চিঠি পাঠিয়েছি। এর মধ্যে শেষ চিঠিটি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক আগে পৌঁছেছিল। আমরা আশা করেছিলাম, যিনি নতুন দায়িত্ব নেবেন, তার ডেস্কে চিঠিটি থাকবে।’
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কেন টিকা সংগ্রহে বিলম্ব হলো- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্বের অন্যতম কারণ ছিল উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত।’

গত দুই বছরে বাংলাদেশে টিকা সংকট ছিল কি না- জানতে চাইলে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ‘আমরা ২০২৪ সালেই টিকা সংকটের পূর্বাভাস দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, এটি পরবর্তী দুই বছরে বিভিন্ন রোগের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আমরা আগেভাগেই সতর্ক করছিলাম এবং বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিলাম যে, দেশ সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে।’

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে হামের এই প্রাদুর্ভাব থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ‘আফটার অ্যাকশন রিভিউ’ বা পরবর্তী মূল্যায়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা খতিয়ে দেখব কেন বহু বছর ধরে প্রতি বছর প্রায় পাঁচ লাখ শিশু টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থেকে যাচ্ছে।’

এই সংখ্যাকে ‘মোটা দাগের অনুমান’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যকেন্দ্র, প্রাক-বিদ্যালয় ও প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো জায়গাগুলোতে শিশুদের একত্রিত করার সক্ষমতা ভবিষ্যতে আরও ভালোভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘এখন কাউকে দোষারোপ করার সময় নয়। এখন এমনভাবে টিকাদান প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এই দেশের কোনো শিশু প্রতিরোধযোগ্য রোগে মারা না যায়।’

টিকা কেনার প্রক্রিয়া নিয়ে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ‘সাধারণভাবে উন্মুক্ত দরপত্র সবচেয়ে স্বচ্ছ পদ্ধতি। তবে টিকার বিষয়টি ভিন্ন, কারণ এটি অত্যন্ত বিশেষায়িত পণ্য। এখানে শুধু ওষুধ কেনা নয়, বিপুলসংখ্যক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয় জড়িত।’

তিনি বলেন, ‘টিকা অবশ্যই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) অনুমোদিত হতে হবে। সবচেয়ে কম দাম নয়, কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখানে প্রধান বিষয়। ইউনিসেফ বহু বছর আগে থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জন্য টিকা সংগ্রহ ও বিনিয়োগ করে আসছে। টিকা প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে আমাদের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে এবং তাদের মান নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়।’

রানা ফ্লাওয়ার্স আরও বলেন, ‘আমরা বড় পরিসরে টিকা কিনি বলে কম দামে সংগ্রহ করতে পারি। ইউনিসেফ যে দামে টিকা সংগ্রহ করে, তার চেয়ে কম দামে দরপত্র পাওয়া সম্ভব নয়- আমরা তা জানি।’

সময়ের আলো/আআ



  বিষয়:   টিকা  হাম  ইউনিসেফ  বাংলাদেশ 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: