শিশু রামিসার সঙ্গে ঘটে যাওয়া নৃশংসতায় যেন থমকে আছে চারপাশ। পল্লবীর ৭ নম্বর রোডের বাসায় ঢুকলেই অদ্ভুত স্তব্ধতা চোখে পড়ে। রামিসার শোক যেন ছুঁয়ে গেছে সবকিছুকে। তার আদরের বিড়ালটাও গত দুইদিন ধরে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
বুধবার (২০ মে) মুন্সিগঞ্জে রামিসার দাফন হয়েছে। মেয়েকে চিরবিদায় দেওয়ার পর পল্লবীর বাসায় ফিরে ঘরজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রামিসার স্মৃতিগুলো শোক বাড়িয়ে দিচ্ছে সবার।
রামিসার ফুপু হাসনাহেনা বলেন, রামিসার বিড়ালটাও ওর শোকে গতকাল থেকে কিছুই খাচ্ছে না। বিড়ালাটাও ওর ভালোবাসা অনুভব করছে। বিড়ালটিকে দেখিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন হাসনাহেনা।
এই অবুঝ বিড়ালটিও বুঝেছিল, রামিসা ওকে কত ভালোবাসতো। এই রকম ফুলের মতো মেয়ের সাথে এমন নিষ্ঠুরভাবে নরপিশাচের মতো আচরণ করতে পারে, তাকে ফাঁসি দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। কিন্তু তা কি আদৌ হবে?
রামিসাদের বাসার সামনেই রফিক হাওলাদারের চায়ের দোকান। সেখানে প্রায়ই চা পান করতে যান রামিসার বাবা হান্নান মোল্লা। বাবার সঙ্গে মাঝে মধ্যে সেখানে যেত রামিসাও।
রফিক বলেন, ও (রামিসা) দোকানে আসলে সঙ্গে বিড়াল থাকতো। একবার বিড়ালটা হারিয়ে যায়। দুইদিন ধরে ও খুব কান্নাকাটি করে। বিড়ালটা আমাদের গ্যারেজেই ছিল। তখন আমরা জানতাম না যে, বিড়ালটা ওর। পরে বিড়ালটা পেয়ে আমি ওকে দিয়ে আসি।
কী ঘটেছিল রামিসার সঙ্গে : আদালত সূত্রে জানা গেছে, জবানবন্দিতে সোহেল জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা ঘর থেকে বের হলে সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে রুমের ভেতরে নিয়ে যায়। এরপর বাথরুমে নিয়ে শিশুটিকে নির্যাতন করে সোহেল। এতে জ্ঞান হারায় ছোট্ট রামিসা।
শিশুটির মা সোহেলের বাসার দরজায় কড়া নাড়তে থাকেন। এ সময় সোহেল তাকে গলাকেটে হত্যা করে। পরে মরদেহ গুম করার জন্য তার মাথা ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করে। দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ বাথরুম থেকে শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে রাখে। ঘটনার সময় তার স্ত্রী একই রুমে ছিল। একপর্যায়ে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় সোহেল।
ঘটনার আগে ইয়াবা সেবন করেছিল বলেও জবানবন্দিতে জানায় সে। ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে পূর্ব কোনো শত্রুতাও ছিল না বলে জানায়।
দৃষ্টান্তমূলক বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুতই শেষ করার ঘোষণা সরকারের : রামিসার এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড সারাদেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এই অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুতই শেষ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার কাজ সম্পন্ন করতে যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হবে।
এদিকে দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রামিসা হত্যাকাণ্ড ও সমসাময়িক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সেইসঙ্গে আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষে চার্জশিট দাখিল করা হবে। সংক্ষিপ্ত সময়ে বিচারিক প্রক্রিয়াও শেষ হবে।
বিচারহীনতার কথা সবসময় সঠিক নয় উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অনেক সময় বিলম্ব হয়, বিচার আদালতের বিষয়। তনু হত্যাসহ বিভিন্ন মামলায় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সংক্ষিপ্ত সময়ে দৃষ্টান্তমূলক বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হবে।
সময়ের আলো/আআ